বোমা উদ্ধারের ১০ ঘটনা, ৬টির তদন্তে অগ্রগতি নেই
ফাইল ফটো
রাসেল মাহমুদ
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৮ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হয়েছে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু। কোথাও পাওয়া গেছে ‘প্রেশার কুকার বোমা’, আবার কোথাও ছাতার ভেতর ‘পাইপবোমা’। পুলিশের দাবি, উদ্ধার এসব বোমা ছিল ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। এসব ঘটনায় থানায় করা মামলায় উগ্রবাদী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। একের পর এক বোমা জব্দের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানে করা ১০ মামলার মধ্যে ছয়টির তদন্তে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মামলার তদন্ত করছে থানা পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উগ্রবাদ-সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের দোদুল্যমানতা রয়েছে। এই সমস্যাকে নীতিনির্ধারকরা কীভাবে মোকাবিলা করতে চান, তা মাঠ পর্যায়ের অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সমকালকে বলেন, দেশে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা আগে ছিল; এখনও আছে। তবে অপরাধীরা বিভিন্ন সময় কৌশল বদলিয়েছে। আবার তারা আলোচনায় এসেছে। উগ্রবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই সব তথ্য আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
গত ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার ভাড়া বাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে সেখান থেকে প্রায় ৪০০ লিটার রাসায়নিক ও ৯টি বোমা উদ্ধার হলে উগ্রবাদী গ্রুপের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। এর পর গত আট মাসে দেশের আরও ৯ স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর ‘পাইপবোমা’, আশুলিয়ায় ‘প্রেশার কুকার বোমা’, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা ও বিস্ফোরণ, যশোরের গ্রেনেড, সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বিস্ফোরণ এবং সাভারের একটি মসজিদের মাঠ থেকে স্কচটেপে মোড়ানো বোমা উদ্ধার মামলার তদন্তের কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তবে বাকি চারটি ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছে।
বোমা বিস্ফোরণ ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় করা অন্তত চারটি মামলার তদন্ত করছে এটিইউ। মামলাগুলোর তদন্তের বিষয়ে এই ইউনিটের মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইংয়ের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল সমকালকে বলেন, প্রতিটি মামলার তদন্ত চলমান। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
যশোরে গ্রেনেড উদ্ধার
যশোরের বাঘারপাড়ায় চুন্নু মোল্লার বাড়িতে গত ৩১ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে ১০টি গ্রেনেড, তিনটি বিদেশি পিস্তল ও ১৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। এসব অস্ত্র বাসায় মজুত করেন চুন্নু মোল্লার ছেলে রায়হান মোল্লা। তবে অভিযানের আগেই রায়হান পালিয়ে যান। এ ঘটনায় করা মামলাটি প্রথমে বাঘারপাড়া থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে মামলাটি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। তবে ঘটনার ছয় মাস পার হলেও এখনও মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
বাঘারপাড়া থানার ওসি মো. শাহ জালাল আলম বলেন, এ ঘটনায় উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যার কারণে মামলাটি এটিইউ তদন্ত করছে।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলা
গত ২১ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পকেট গেটে তল্লাশি চৌকিতে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে কনস্টেবল মো. শাহ আলম আহত হন। পালানোর সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার তদন্ত করছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। ঘটনার ছয় মাসেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, পুলিশ কনস্টেবলের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গে উগ্রপন্থিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ঘটনার সঙ্গে নব্য জেএমবির নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ ও সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান জড়িত থাকতে পারে।
সিসিটিভিতে দেখা যায় ছয়জন
গত ২৫ মার্চ রাজধানীর সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি মেরুন রঙের ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি ব্যাগ থেকে পাইপবোমাসদৃশ বস্তু বের করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালায়। পরে ব্যাগ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে পলাতক দুজনসহ আরও চারজনকে দেখা যায়। তাদের সবার সঙ্গে ব্যাগ ছিল এবং তারা একই দলের সদস্য বলে ধারণা করছে পুলিশ।
মামলাটির তদন্ত করছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ছাতার ভেতর আইইডি
গত ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে ‘পাইপবোমা’ উদ্ধার করা হয়। পরিত্যক্ত ছাতার ভেতরে রাখা বোমাটি আইইডি বলে জানায় সিটিটিসি। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হলেও এখনও কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি। মামলাটি তদন্ত করছে মতিঝিল থানা পুলিশ।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা বিশ্লেষণ করে মামলার তদন্ত কাজ চলছে।
আশুলিয়ায় ‘প্রেশার কুকার বোমা’
গত ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদি দোকান থেকে ‘প্রেশার কুকার বোমা’ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে এটিইউ। তবে এখনও কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি।
সাভারে মসজিদের মাঠে বোমা
গত ১২ আগস্ট সাভারের সাদাপুরের একটি মসজিদের মাঠ থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো ‘প্রেশার কুকার বোমা’ উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে বোমাটি কারা ও কী উদ্দেশ্যে রেখেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণ
গত ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার ভাড়া বাড়িতে বিস্ফোরণে পরিচালক শেখ আল আমিনের স্ত্রী-সন্তানসহ চারজন আহত হন। পরে সেখান থেকে প্রায় ৪০০ লিটার রাসায়নিক ও ৯টি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিস্ফোরণের আগের রাতে আল আমিন বোমা তৈরি করে আলাদা কক্ষে রাখেন। পরে অসতর্ক মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে।
মন্দিরে হাতবোমা বিস্ফোরণ
গত ৭ মার্চ কুমিল্লার দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ায় বাগানবাড়ী কালী গাছতলা শিবমন্দির এবং ব্র্যাক অফিসের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে শিবমন্দিরের রঞ্জন চক্রবর্তীসহ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। পরে নাহিদ মিনা, আজহারুল ইসলাম শিহাবসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বিরঙ্গ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
সাভারে বোমাসহ আরিফ গ্রেপ্তার
গত ১১ আগস্ট সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির সদস্য সন্দেহে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে পাঁচটি নিষ্ক্রিয় পাইপবোমার ধ্বংসাবশেষ (আইইডি), বোমা তৈরির স্টিল পাইপ, চাপাতির বাঁট, ব্যাটারি, সিমবিহীন মোবাইল ফোন ও একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে আরিফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে তার ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সাভার থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামি আরিফ নিজেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়।
ডেমরায় বোমাসহ দুজন গ্রেপ্তার
সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় দুটি ‘ডেটো বোমা’সহ মো. জুয়েল ভুঞা ও মো. আরিফ চৌধুরী নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে এটিইউ। এজাহারে বলা হয়, নাশকতার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরক নিয়ে অবস্থান করা জুয়েল ও আরিফ দাওলাতুল ইসলামের সক্রিয় সদস্য। তাদের সহযোগী হিসেবে নাজমুল হাসান ওরফে বোমারু মামুনসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা বোমাটি একটি নন-ইলেকট্রিক ‘ডেটো বোমা’। জুয়েল বোমারু মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০২৪ সালে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ৯ জঙ্গির একজন ছিলেন তিনি। পরে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও একই বছরের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হন।
জড়িত সবার সঙ্গে থাকে ব্যাগ
বোমা-সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর জনপথ মোড়ে তল্লাশি চৌকিতে সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তি ব্যাগ রেখে পালিয়ে যায়। অপরজন ব্যাগ থেকে পাইপবোমাসদৃশ বস্তু বের করে বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে মেরুন রঙের ব্যাগ থেকে দুটি বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে পলাতক দুজনসহ আরও চারজনকে দেখা যায়, যাদের সবার সঙ্গে ব্যাগ ছিল। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তারা একই দলের সদস্য। এদিকে সাভারের বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তারের সময় পাঁচটি নিষ্ক্রিয় পাইপবোমার ধ্বংসাবশেষ, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ব্যাটারি, মোবাইল ফোন ও একটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক অতিরিক্ত উপকমিশনার সমকালকে বলেন, তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী অনেকেই ব্যাগ বহন করেন। এতে ছোট আকারের বোমা রাখে। পাশাপাশি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে বোমা তৈরির রাসায়নিক দ্রব্য ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সংরক্ষণ করার তথ্যও পাওয়া গেছে।
- বিষয় :
- বোমা উদ্ধার
- তদন্ত
- পুলিশ