বর্ষা শেষেও কাউয়াদীঘি ও গাজনার বিলের সৌন্দর্য উপভোগে উপচে পড়া ভিড়
পাবনার গাজনার বিলে নৌ ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ও পাবনা অফিস
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাদ্রে এসেও অনন্য রূপে পর্যটকদের বিমোহিত করছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা। এসব এলাকায় এখনও নিয়মিত পর্যটকের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি তেমনই চিত্র নজরে এসেছে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর ও পাবনার বিখ্যাত সুজা বিলে।
ডোবা গ্রামে মুগ্ধ সবাই
কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রাম অন্তেহরি। একটু দূর থেকে দেখলে গ্রামটিকে পানিতে ভাসমান সবুজেঘেরা দ্বীপ মনে হয়। বর্ষায় নৌকা কিংবা সাঁকো ছাড়া এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত করা দুঃসাধ্য। এমন ঝুঁকিপূর্ণ দুর্গম এলাকা হলেও এর সৌন্দর্য উপভোগে ছুটে আসেন পর্যটক। বৃষ্টির মৌসুম এলেই জলের গ্রামখ্যাত অন্তেহরি প্রকৃতির এক বিরল ভূমিতে পরিণত হয়।
চারদিকে থই থই জলরাশি। মাঝখানে কোথাও ইট বাঁধাই, কোথাও কাঁচা রাস্তা। রাস্তার পাশে লম্বাগলিতে অন্তেহরি বাজার। রাস্তাটি মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়ায় গ্রামটি ভাগ হয়ে গেছে। বর্ষায় এ বাজারটি যেন অন্তেহরি ও কাদিপুর গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলার একটুকরো স্থলভূমি। পাল তোলা ছোট-বড় নৌকাসহ জেলেদের হাওরের জলে নিরন্তর এদিক-ওদিক ছুটে চলার দৃশ্য।
সকাল থেকে গভীর রাত অবধি চা স্টলগুলোতে কেনাবেচা চলে। রবী ঠাকুরের আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। একটি-দুটি নয়, একশর বেশি নদী, বিল, খাল বিধৌত জলরাশির মিলিত প্রবহে কাউয়াদীঘি হাওরের বিশাল জলভান্ডার। এখানকার মাঝেরবান্ধ, শালকাটুয়াসহ বিভিন্ন হাওর, বিল, নালা, শীত-বর্ষায় দেশীয় প্রজাতির মৎস্যভান্ডার হিসেবে বহুল পরিচিতি রয়েছে। পর্যটকরা সেখান থেকে মাছও কেনেন। পর্যটন ও বিল ইজারায় প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়।
কাউয়াদীঘি হাওরপারের অন্তেহরি ও নিকটবর্তী কাদিপুর বর্ষায় জলে ডোবা গ্রাম। প্রতিটি বাড়ির বাইরে পা দিলেই পানি। ওই গ্রামের বাসিন্দা লিটন দাশ জানান, জলের গ্রাম নামে পরিচিত অন্তেহরি গ্রাম ও কাউয়াদীঘি হাওরের সৌন্দর্য অবলোকনে প্রতিদিন শত শত পর্যটক যাতায়াত করেন। প্রত্যন্ত হাওরপারের একটি গ্রাম পর্যটনের খ্যাতি অর্জন অবশ্যই সুনামের। এই সুখ্যাতি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন।
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান মিজান সমকালকে বলেন, এই অঞ্চলে পর্যটকের সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রকৃতি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।
নজরকাড়া বাইচের নৌকা
কাউয়াদীঘির মতো এত সুবিস্তৃত না হলেও ভ্রমণের অনন্য স্থান পাবনার সুজানগরের ঐতিহ্যবাহী গাজনার বিল। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের জেলার হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু পর্যটক গাজনার বিলে নৌ-ভ্রমণ করছেন।
বিলপারের খয়রান গ্রামের বাসিন্দা সোহেল রানা তালুকদার বাবু জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমে গাজনার বিল পানিতে থই থই করছে। আর বিলে পানি থাকবে পৌষ মাস পর্যন্ত। বর্ষার শুরু থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ এ সময় প্রায় অর্ধশত সবুজ শ্যামল গ্রাম-সংলগ্ন বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গাজনার বিল অবস্থিত। ঐতিহ্যবাহী এই বিলের অপরূপ সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে প্রবলভাবে।
এ সময় স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন গাজনার বিল ভ্রমণে। ভ্রমণপিপাসু বেশির ভাগ পর্যটক গাজনার বিলে নৌ-ভ্রমণ করে থাকেন। নৌ-ভ্রমণের জন্য বিলের খয়রান ব্রিজ, চরবোয়ালিয়া, বাদাই ব্রিজ এবং বোনকোলা ব্রিজ পয়েন্টে বাণিজ্যিকভাবে রাখা হয়েছে ইঞ্জিনচালিত বড় বড় নৌকা। তাছাড়া পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিলের শারীরভিটা পয়েন্টে থাকে বিশাল বাইচের নৌকা। স্থানীয় পর্যটকরা ওই বাইচের নৌকায়ও বিল ভ্রমণ করেন।
বিলপারের শারীরভিটা গ্রামের হেদায়েত আলী খান বলেন, প্রতিদিন কমবেশি পর্যটককে গাজনার বিলে নৌ-ভ্রমণ করতে দেখা যায়। তবে শুক্র এবং শনিবার পর্যটকের নৌ-ভ্রমণে গাজনার বিল মুখরিত হয়ে উঠে।
বিলে নৌ-ভ্রমণে আসা উপজেলার বোনকোলা গ্রামের রইচ উদ্দিন বলেন, বিলটি ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিলে সারাবছর পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দুই-চারটি পয়েন্টে পিকনিক স্পট এবং আবাসন সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ করে, সন্ধ্যা থেকে বিল এলাকায় পুলিশ প্রশাসনের টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
সুজানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেন বলেন, পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে গাজনার বিল ভ্রমণ করতে পারেন সেদিকে পুলিশের সজাগ দৃষ্টি আছে। সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ বলেন, গাজনার বিল নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে।
- বিষয় :
- ভ্রমণ