ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ওষুধের দাম নির্ধারণে রোগী ও শিল্পের স্বার্থ দেখার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা বাতিলের সমালোচনা

ওষুধের দাম নির্ধারণে রোগী ও শিল্পের স্বার্থ দেখার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
×

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৪৭ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৫০

রোগীর ব্যয় কমানো, অত্যাবশ্যক ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ওষুধশিল্পের টেকসই বিকাশ—এই তিনটি বিষয় সমন্বয় করে নতুন ওষুধ মূল্যনীতি প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ নিলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। আবার শিল্পের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তাই তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

শনিবার ঢাকায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ওষুধের মূল্য: বিতর্ক ও করণীয়’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই ওষুধ কিনতে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যবিমার সীমিত সুযোগের কারণে এই ব্যয়ের বড় বোঝা সরাসরি রোগীকেই বহন করতে হয়। ফলে ওষুধের দাম কেবল মূল্য নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় শিল্প এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই ওষুধ কিনতে ব্যয় হয়। স্বাস্থ্যবিমার সীমিত সুযোগের কারণে এই ব্যয়ের বড় বোঝা সরাসরি রোগীকেই বহন করতে হয়। ফলে ওষুধের দাম কেবল মূল্য নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় শিল্প এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।রোগীর আর্থিক সুরক্ষা, শিল্পের সুস্থ বিকাশ, বৈজ্ঞানিক প্রাইসিং ফর্মুলা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি স্বাস্থ্য সুরক্ষা—এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ওষুধের মূল্যনীতি তৈরি করতে হবে।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ১৯৯৪ সালে নির্ধারিত ১১৭টি অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম প্রায় তিন দশক ধরে নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়নি। এ সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কিছু কোম্পানি এসব ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করেছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য ওষুধ থেকে পাওয়া মুনাফা দিয়ে এসব ওষুধে ভর্তুকি দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও এআরকে ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. রুমানা হক বলেন, দেশে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ব্যবহার হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকাই মানুষ নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয় করে। তিনি বলেন, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ কেনা এবং অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করে ওষুধ সেবনের প্রবণতাও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয়, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মার্জিন—পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ দরকার। পাশাপাশি অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ, জেনেরিক নামে ওষুধ বিক্রি এবং সরকারি ওষুধ খোলা বাজারে বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’ 

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে। ক্যানসার, এইচআইভি ও যক্ষ্মাসহ প্রায় সব ধরনের ওষুধ এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।

তবে দীর্ঘদিন ১১৭টি অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় কিছু ওষুধে নেগেটিভ মার্জিন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, রোগীর স্বার্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উচ্চমানের কাঁচামাল ও মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত মূল্যনীতিও প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মূল্যসংক্রান্ত গেজেট বাতিলের সিদ্ধান্তকে সঠিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন নীতিমালা সরকার, বিশেষজ্ঞ ও শিল্পের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গেজেটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ এবং নতুন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বিতর্ক থাকলে সংশোধনের সুযোগ ছিল। কিন্তু পুরো গেজেট বাতিল করা জনস্বাস্থ্যের জন্য পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত। তিনি অত্যাবশ্যক ওষুধে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি বাড়ানো, সিএমএসডির মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়সার কবির বলেন, আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের ওষুধের দাম বিশ্বের অন্যতম কম। শক্তিশালী প্রতিযোগিতার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। তার মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ সরকার বড় পরিসরে কিনে রোগীদের বিনামূল্যে সরবরাহ করলে প্রকৃত সমাধান মিলতে পারে। কারণ সব ওষুধ রোগীর জন্য সমান আর্থিক বোঝা তৈরি করে না; উচ্চমূল্যের জীবনরক্ষাকারী ওষুধেই রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তিনি বলেন, দেশের ওষুধ বাজারে সিন্ডিকেট নয়, কার্যকর প্রতিযোগিতাই প্রধান ভূমিকা রাখছে। তবে ২০২৩ সালের পর নতুন পণ্যের মূল্য অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ছোট ও মাঝারি ওষুধ কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ বৃহত্তর স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সিস্টেম চ্যালেঞ্জ। শুধু দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরবরাহব্যবস্থা, ওষুধের গুণগত মান, অতিরিক্ত প্রেসক্রিপশন এবং নগর স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন

×