ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সোয়া ৪ হাজার সদস্য বেপরোয়া

দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সোয়া ৪ হাজার সদস্য বেপরোয়া
×

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

২২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনের সড়ক। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মো. হানিফ নামে এক যুবক। হঠাৎ এক তরুণ তাঁর পথরোধ করে। এরপর চিপাগলিতে নেওয়ার জন্য তাঁকে চাপাচাপি করে। হানিফ যাননি। এক পর্যায়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে গেলে হানিফকে ‘পকেটমার’ বলে শোরগোল তোলে ওই তরুণ।

স্থানীয় লোকজন তরুণের অভিযোগ শোনেননি। কারণ, এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে হানিফের পরিচিতি আছে। এরই মধ্যে হানিফ ঘটনাস্থলের পাশের ব্যবসায়ী ও বন্ধু ওমর ফারুককে ফোনে ডেকে আনেন। তরুণকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তরুণ পালিয়ে যায়। তবে প্রায় ১০ মিনিট পর চারজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে। কারও হাতে ছিল চাপাতি, কারও হাতে সামুরাই। ফারুক ও হানিফকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। আতঙ্কে ফারুক একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। আর হানিফ ছুটে যান পাশের রায়েরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে। স্থানীয়রা সমকালকে জানান, মোহাম্মদপুরে দিনদুপুরে প্রায়ই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের এমন তৎপরতা দেখা যায়। 

সারাদেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাং নিয়ে সম্প্রতি তালিকা করেছে পুলিশ সদরদপ্তর। সে তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এসব গ্রুপের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে আছে ৯৮টি। এ ছাড়া খুলনা মহানগরে ৭, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্রুপ রয়েছে। অন্য মহানগর ও বিভিন্ন জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি রয়েছে নোয়াখালীতে– ২৫টি। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৯টি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য রয়েছেন ১ হাজার ৮১২। ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুরে সর্বোচ্চ ২৭টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা অন্তত সাড়ে ৩০০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি পল্লবী থানা এলাকায়। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা অন্তত ১৬০। অবশ্য সমকালের অনুসন্ধানে পুলিশের তালিকার বাইরেও বেশ কিছু কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য উঠে এসেছে। 

রায়েরবাজার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. হানিফ সমকালকে বলেন, নিজেকে ‘সুমন গ্রুপের সদস্য’ পরিচয় দিয়ে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাঁকে চিপাগলিতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল ওই তরুণ। ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ আসে। এলাকায় দিনে-রাতে মাঝেমধ্যেই এভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বয়সে তরুণ হলেও তারা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, হামলা, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কাউকে গুলি কিংবা কোপ মারতে দ্বিধা করে না তারা। আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও একাধিক এমপি কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। 

পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো– অভিভাবকদের উদাসীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের অভাব, অসৎ সঙ্গ, কিশোরদের মধ্যে বাহাদুরি দেখানোর প্রবণতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং মানসিক হতাশা।

পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এই সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে।

পুলিশের তালিকায় মতিঝিল বিভাগে ১৬টি গ্রুপের কথা বলা আছে। এর মধ্যে খিলগাঁও থানায় সাতটি, মুগদায় তিনটি, মতিঝিল ও সবুজবাগে দুটি করে চারটি এবং রামপুরা ও শাহজাহানপুর থানা এলাকায় একটি করে দুটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। খিলগাঁও থানা এলাকার গ্রুপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ, তারেক গ্রুপ।

গত সোমবার খিলগাঁওয়ে সরেজমিন করে আরও দুটি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো তসলিম গ্রুপ ও রেড লাইন গ্রুপ। এসব গ্রুপের বেশির ভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তাদের আধিপত্য সি ব্লক এলাকায়। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে চাপাতি নিয়ে মাঝেমধ্যে মহল্লার সড়কে মহড়া দেয়। পাকা রাস্তায় চাপাতি ঘষে আগুনের ফুলকি তোলে এবং উল্লাস প্রকাশ করে। ইনস্টাগ্রামে গ্রুপ খুলে অস্ত্রের মহড়ার ছবি ও ভিডিও আপলোডও করে তারা। সাধারণত এই গ্রুপের সদস্যরা ছিনতাই-চুরির মতো অপরাধে জড়িত না। তবে কেউ কেউ মাদক সেবন ও ব্যবসায় জড়িত। 

সরেজমিন জানা যায়, গত ২৮ জুন সন্ধ্যায় সি ব্লকে রেড লাইন এবং ৯৯৯ গ্রুপের সদস্যরা চাপাতি নিয়ে মহড়া দিচ্ছিল। এ সময় একই এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্র সৌরভ মাহমুদকে মারধর করে তারা। এ ঘটনায় সৌরভের বাবা বাদী হয়ে দুই গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় মামলা করেন। ৯৯৯ গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে আরাফাত ও আফসার এবং রেড লাইনের নেতৃত্বে সাগর। 

মামলাটি তদন্ত করছেন খিলগাঁও থানার এসআই সুমন মিয়া। ২৪ আগস্ট তাঁর সঙ্গে সমকালের কথা হয়। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়, যারা সবাই কিশোর। আদালতের মাধ্যমে তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। পরে তারা জামিনে ছাড়া পায়। 

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন ছয়টি থানার মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় ২৭টি, আদাবরে ৬, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ৩, তেজগাঁও ও শেরেবাংলা নগরে একটি করে মোট দুটি এবং হাতিরঝিল থানা এলাকায় দুটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের আধিপত্য বিস্তার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম মাধ্যম হলো দেয়ালে চিকা মারা বা নিজেদের গ্রুপের নাম লিখে রাখা। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ছিনতাই করে তারা। এলাকায় এসব দলের বিচিত্র নাম রয়েছে। এর মধ্যে ডাইল্লা গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু, কিং শাওন উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি গ্রুপে কমপক্ষে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। তাদের আয়ের উৎস মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল, অপরাধের কাজে ভাড়া খাটা ইত্যাদি।

গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে অ্যালেক্স গ্রুপের দলনেতা মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর রেশ না কাটতেই কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ১৫ এপ্রিল রাতে আসাদুল নামে আরেক যুবক খুন হয়।

সোমবার সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো ও কদমতলা এলাকায় অন্তত ২০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য, ওই এলাকায় কিশোর গ্যাং নামকরণ হলেও এ দলে ২৮-৩০ বছর বয়সের সদস্যও রয়েছে। এদের বেশির ভাগ মাদক ব্যবসায় জড়িত। কদমতলা কালভার্ট সড়ক এলাকায় শুভ ওরফে চীনা শুভর (২৮) গ্রুপে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছে, যারা সবাই ইয়াবা বিক্রেতা। কিশোর বয়স থেকে শুভ গ্রুপটি পরিচালনা করে আসছে। 

সরেজমিন উঠে আসে, সবুজবাগের দক্ষিণগাঁও এলাকার মোহাম্মদ আলী নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর তিন ছেলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তারা বাবার ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা দেন।

পুলিশের হিসাবে ডেমরা থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা তিনটি। তুহিন গ্যাং, শিমু বাহিনী ও অন্য একটি গ্রুপের নাম নেই। তবে সরেজমিন আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম পাওয়া গেছে। রসুলনগর-আমতলা এলাকায় রেম্বো সাগর ওরফে ইমন গ্রুপ, বক্সনগর এলাকায় নাহিদ গ্রুপ এবং হোসেন গ্রুপ উল্লেখযোগ্য। তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব গ্রুপের সদস্যরা সন্ধ্যার পর এলাকার বিভিন্ন সড়কে আড্ডা দেয়। সুযোগ বুঝে রাতে পথচারীর মোবাইল ও টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়। হামলা আতঙ্কে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ করার সাহস পায় না। 

ডিএমপির তথ্য বলছে, মিরপুর বিভাগের সাত থানা এলাকায় ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় ১৬টি গ্রুপ আছে। এ ছাড়া দারুসসালামে ছয়, শাহআলীতে চার, মিরপুরে তিন এবং কাফরুল, ভাসানটেক ও রূপনগর থানা এলাকায় দুটি করে মোট ছয়টি গ্রুপ রয়েছে। 

পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকের মতো বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা কাজ করে। এর সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় তারা সহজেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। 

খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে অভিযান চালিয়ে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, মামলা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতার কারণে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে কেউ যেন এসব কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ কিংবা কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা না করেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে কিশোররা বিপথে না যায়। কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত কিশোররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে নানা ধরনের অপরাধ করে। এ ছাড়া কর্মহীন কিশোর, সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রতি অনাগ্রহ, কোনো পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’র রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য পূরণ, আধিপত্য বিস্তার, মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ কিছু স্বতন্ত্র কারণের সূত্র ধরেও কিশোর অপরাধ বাড়ছে। কিশোর অপরাধের অর্থনীতির পরিমাণ ও ভয়াবহতা এক ধরনের মহামারী আকার ধারণ করেছে। আইনের মাধ্যমে সংশোধনের ব্যবস্থা রেখে কিশোর অপরাধের পেছনে সুবিধাভোগী পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপক সচেতনতার মধ্য দিয়ে এই সামাজিক মহামারী থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। 

আরও পড়ুন

×