ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের জোট

‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে: রয়টার্স

‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে: রয়টার্স
×

৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সৌদি প্রেস এজেন্সি/হ্যান্ডআউট (রয়টার্স)

রয়টার্স

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০১

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। 

বিশ্লেষকদের বরাতে রয়টার্স দাবি করেছে, এই জোটে যোগ দিলে বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। 

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের (প্রত্যর্পণের) দাবি জানানোর পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক লোকজনকে পুশইন করার অভিযোগ তোলায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তবে আমাদের সেখানে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। এটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে। 

সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তারা বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেখানে গিয়ে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব ঢাকাকে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা বলেননি তিনি। গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই সূত্রটি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কথা জানান।

সুন্নি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এই তিনটি দেশ চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় ন্যাটোর যৌথ-প্রতিরক্ষা নীতির আদলে এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে আঞ্চলিক সংঘাতে উত্তেজনার পারদ বৃদ্ধির মধ্যেই চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।

তুরস্কের মতো বাংলাদেশও একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র, যদিও এর জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ নিজেদের সুন্নি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয়।

মন্ত্রীর মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্ক জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান এবং শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের সাথে হওয়া এই চুক্তিটি সম্প্রসারণের জন্য উন্মুক্ত।

দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোনো সামরিক জোটে যোগদানের বিষয়টি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী পরাশক্তিগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ভূ-রাজনৈতিক বলয় এড়িয়ে চলার যে দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের রয়েছে, তার একটি পরীক্ষা নেবে।

দেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, যার বেশির ভাগই ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে যায়; অন্যদিকে বিদেশে, প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া বলেন, আনুষ্ঠানিক জোটের সদস্যপদ শুধু ভারতের সাথেই নয়, বরং চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে।

কিবরিয়া বলেন, ‘এই সম্পর্কগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না। তবে বাংলাদেশ একবার কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে, বাংলাদেশ কোন পক্ষে রয়েছে সেই প্রশ্নটি এড়ানো অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।’ 

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের দাবি এবং সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইনের অভিযোগ নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। ঢাকা যখন হাসিনাকে ফেরতের বিষয়ে নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, ঠিক সেই নাজুক মুহূর্তে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার এই আমন্ত্রণ সামনে এলো।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, কট্টর শত্রু পাকিস্তান রয়েছে এমন একটি নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের সদস্যপদকে নয়াদিল্লির স্বাগত জানানোর সম্ভাবনা কম, যদিও ঢাকাকে শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিণতিগুলো বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, জোটবদ্ধ হওয়ার ধারণাটি বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা বিস্তৃত অংশীদারদের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।

শাহান আরও বলেন, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে সেটি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।

আরও পড়ুন

×