ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলোচনা সভায় রাষ্ট্রপতি

গুমে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে

গুমে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে
×

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বাসস

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫২

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের, সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল রোববার বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটা পবিত্র দায়িত্ব, গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। আমি বিশ্বাস করি, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালার (আয়নাঘর) দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য যখন আন্দোলন করেছেন, তখনই তাদের স্তব্ধ করে দিতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম-খুন করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না। কেড়ে নেয় প্রিয়জনের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বস্তি। এ এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সব কটিকেই একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।

দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, সেটিকে রাষ্ট্রপতি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অপমানজনক অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন– একদিন এই গুম, খুন, অত্যাচার, নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

এ সময় তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের কথা স্মরণ করেন। এ সময় তিনি গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ।

এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু ঢাকায়, দাফন দিল্লিতে’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত দিনে আমরা যারা গুম ছিলাম, প্রতি মুহূর্তে আমাদের মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময়ে তাদের স্বজনরা কীভাবে সময় কাটিয়েছে, সেটি তারা ছাড়া কেউ বুঝবেন না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকার দুই হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। বহু লাশ গায়েব করেছে। আমরা মনে করি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, আর দাফন হয়েছে দিল্লিতে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে ৭০৯ জন গুমের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ফিরে এসেছেন ১৫৫ জন। আর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমের বিষয়ে ১৮৫০টি আবেদন পড়েছিল।

গুম প্রতিরোধ আইন উত্থাপনের সময় ওয়াকআউট সুস্থ ধারার রাজনীতি কিনা– প্রশ্ন আইনমন্ত্রীর
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদে গুম প্রতিরোধ আইন উত্থাপনের সময় ওয়াকআউটের প্রসঙ্গ তোলেন আইনমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন করেন, আইন উত্থাপনের সময় ওয়াকআউট করা সুস্থ ধারার রাজনীতি কিনা।

আইনমন্ত্রী দাবি করেন, গত ছয় মাসে দেশে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় গুমের কোনো অভিযোগ নেই। বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের গুমের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে সরকার। আমরা চাই না, আর কেউ গুমের শিকার হোক।

‘ফ্যাসিবাদী আমলে কেউ প্রতিবাদ করলেই গুম করা হতো’
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন হানাদার বাহিনী মানুষকে হত্যা, নির্যাতন করেছে; বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারও একই পথ অনুসরণ করেছিল। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হতো। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করেই তারা এমনটি করেছে।
 

আরও পড়ুন

×