ডিজিটাল সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডিজিটাল সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে আছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাদের অনেকে ডিজিটাল সেবার কথা জানেও না। ভুক্তভোগীরা কোথায় অভিযোগ জানাবেন সেটিও বুঝতে পারেন না। ডিজিটাল সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রচারণারও অভাব রয়েছে। আবার সেবা পাওয়ার জন্য অনেক দূর যেতে হয়। অনলাইন সেবা নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে কেউ কেউ এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সেবা নিতে আগ্রহী।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘যুবসমাজ, নারী-পুরুষ (লিঙ্গ) ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে সিপিডি এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ ও রিসার্চ অ্যাডভোকেট সাবিহা শারমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন।
গবেষণায় ২ হাজার ৬১১ জনের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৮২ জন যুব, ৯৫৭ জন নারী এবং আদিবাসী, চর, হাওর, বস্তিবাসী, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের ২৯৭টি সরকারি সেবা অফিসকে এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অনলাইন হলেও যেতে হয় সশরীরে
জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর পুরো সেবা প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশের ক্ষেত্রে অনলাইনে অধিকাংশ ধাপ সম্পন্ন হলেও কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়েছে। ২০ দশমিক ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে শুধু ফরম জমা দেওয়ার পর বাকি কাজ অফলাইনে করতে হয়েছে। এমনকি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারী এমন সেবা নিয়েছেন, যা ই-সেবা হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও পুরোপুরি অফলাইনেই নিতে হয়েছে। অর্থাৎ অনলাইনে সেবা চালুর পরও বাস্তবে নাগরিকের সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন পুরোপুরি দূর হয়নি।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব
জরিপে উঠে এসেছে, ই-সেবা ব্যবহারে নারীর সবচেয়ে বড় বাধা ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি। জরিপে ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ডিজিটাল দক্ষতার অভাবকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং একই সংখ্যক উত্তরদাতা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অভাব।
অভিযোগ জানানোর জায়গা জানেন না অনেকে
জরিপে বলা হয়েছে, সেবাগ্রহীতাদের ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী কোনো ই-সেবা নিয়ে কখনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। ৮ দশমিক ৮ শতাংশ অভিযোগ করতে চাইলেও কীভাবে অভিযোগ করতে হয় তা জানেন না। যুবদের ক্ষেত্রে ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ কখনও ই-সেবা নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। ১২ দশমিক ৭ শতাংশ অভিযোগ করতে চাইলেও কীভাবে অভিযোগ করতে হবে তা জানেন না।
ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ই-সেবা নিয়ে বিপাকে
ই-সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় আশঙ্কা, তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া। এ কারণে আস্থারও সংকট আছে। ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয় প্রকাশ করেছেন। ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের আশঙ্কার কথা বলেছেন। পাশাপাশি ৬১ শতাংশ নারী ই-সেবা ব্যবহারের পর অপ্রত্যাশিত ব্যক্তির যোগাযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ কম
জরিপে আরও বলা হয়, ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা কখনও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন মাত্র ১১ শতাংশ। ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ যুব কখনও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেননি। নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন মাত্র ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
ই-সেবা কেন্দ্রেও সমস্যা
ইউনিয়ন কৃষি অফিসের মাত্র ২৭ শতাংশে ই-ডেটাবেজ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে এ হার ৪০ শতাংশ এবং ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসে ২০ শতাংশ। ইউনিয়ন কৃষি অফিসে গড়ে ০ দশমিক ২৭টি কম্পিউটার থাকলেও কাজ করছে মাত্র ০ দশমিক ১৫টি; অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ কম্পিউটার অচল।
সিপিডির সুপারিশ
সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, ডিজিটালভাবে পিছিয়ে থাকা বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো, প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন ‘ডিজিটাল সদস্য’ তৈরির উদ্যোগ, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং নারীদের জন্য বিশেষ ডিজিটাল প্রশিক্ষণের আয়োজন।
গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ অনন্য রায়হান, বজলুল জাহেদ পাভেল, আইসিটি বিশেষজ্ঞ আলমাস কবির, উন্নয়নকর্মী অনিরুদ্ধ রায়, নাসিমুল শবনম, সাভার উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা খালেদা আক্তার প্রমুখ।
- বিষয় :
- সিপিডি