গ্যাস সংকট
আবাসিক ও শিল্পে চাপ কম, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
অসহনীয় মাত্রায় লোডশেডিং
তীব্র গরমের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে দেশ। পরীক্ষা চলছে, তাই অনেক শিক্ষার্থী মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছে। ছবি: এআই
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যাসের সংকট কিছুতেই কাটছে না। এর তীব্র প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে অসহনীয় মাত্রায় লোডশেডিং। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে ভোগান্তি মাত্রা ছাড়িয়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস মিলছে না, আবার কোথাও দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
গতকাল সোমবার জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৮৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে ১২ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াট। এদিন দুপুর ১২টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াট, দুপুর ২টায় ২ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট এবং বিকেল ৪টায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০১ মেগাওয়াটে।
আগের দিন পরিস্থিতিও ছিল প্রায় অভিন্ন। ওই দিন বিকেল ৪টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৭ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ হয় ১২ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট। সে সময় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৬টায়ও ২ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট ঘাটতি রেকর্ড করা হয়।
গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহের নানা জটিলতা। ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি গ্যাসের অভাবজনিত কারণে কয়েক ডজন বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একদিকে তাপমাত্রা ও চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে উৎপাদন। এর সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক।
গ্যাস সরবরাহের সামগ্রিক চিত্র এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তোলে। চলতি আগস্টে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ গড়ে প্রায় ২২৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে আগস্টের জন্য সর্বনিম্ন। বিপরীতে চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে গেছে।
চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
গ্যাস সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সব খাতে। আবাসিক ও শিল্প এলাকাগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনক কমে গেছে। বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা সিলিন্ডার ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা রান্নার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোর পরিস্থিতি আরও করুণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে যানবাহন নিয়ে দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের।
গ্যাসের এই তীব্র সংকট শুধু নগরজীবনেই সীমাবদ্ধ নেই; স্থবির করে দিয়েছে বড় শিল্প খাতকেও। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা গ্যাসের অভাবে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। ১ হাজার ১৫০ টন দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতার এই কারখানাটিতে গত বছরের ১ মার্চ থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খোকসায় ৪৮ ঘণ্টায় মিলল মাত্র ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ
কুষ্টিয়ার খোকসায় লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, ৪৮ ঘণ্টায় তারা গড়ে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেয়েছেন। কোনো কোনো এলাকায় এই সরবরাহ ছিল আরও কম, অর্থাৎ দিনের অধিকাংশ সময়ই এলাকাগুলো বিদ্যুৎহীন থাকছে।
খোকসা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাব-জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। আগে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে সাড়ে তিন মেগাওয়াটের কাছাকাছি নেমে এসেছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাড়াতে হচ্ছে লোডশেডিং।
উপজেলার একটি সাব-স্টেশন থেকে সাতটি ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ‘গোপগ্রাম ফিডার’-এ রয়েছেন প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক। কৃষি সেচ, তাঁতশিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এই ফিডারে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। তবে সরবরাহ মিলছে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন মেগাওয়াট। ফলে দিনের বড় একটি সময় ফিডারটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ী, কারিগর ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানচালকরা। স্থানীয় এক করাতকল কর্মী জানান, সোমবার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত (সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা) তাঁরা মাত্র ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ পেয়েছেন। আগের দিনও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ছিল না। কাজ বন্ধ থাকায় তাদের দৈনিক আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অসহনীয় লোডশেডিংয়ের পরও বিদ্যুৎ বিল কমেনি; বরং অনেকের বিল দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। খোকসা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সাব-জোনাল অফিসের এজিএম আবুল কাদের জিলানী জানান, গত দুদিনে সরবরাহ তিন থেকে সাড়ে তিন মেগাওয়াটে স্থির রয়েছে। সরকারি হিসাবে ৩০ শতাংশ লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও গ্রাহক পর্যায়ে এর প্রভাব অনেক বেশি।
বাড়ছে জনক্ষোভ
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দ্বিমুখী সংকটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আর ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। অনিয়মিত লোডশেডিং, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসের চাপ না থাকা এবং সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি– সব মিলিয়ে জেরবার হয়ে পড়েছে জনজীবন। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। এর আগেও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি ও লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে গ্যাসের এই হাহাকার অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর চাপ আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।
- বিষয় :
- গ্যাস সংকট