ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাগরিক ফোরামের সভায় বক্তারা

ছয় মাসে জুলাই সনদের এক অক্ষরও বাস্তবায়ন করেনি বিএনপি

ছয় মাসে জুলাই সনদের এক অক্ষরও বাস্তবায়ন করেনি বিএনপি
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:১৪ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:১৪

বিএনপি সরকার ছয় মাসে গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদের এক অক্ষরও বাস্তবায়ন করেনি। দলটি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে নায়ক হতে পারত। কিন্তু জনমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিএনপি আশাহত করেছে।

আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’-এর সংলাপে এসব কথা বলেছেন বক্তারা। ‘গণভোট ও জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা: উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে গণভোটের নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি’ শীর্ষক এ সংলাপে সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী।

ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন, অল্টারনেটিভের সংগঠক তাজনুভা জাবিন, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা আরিফ সোহেল, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন প্রমুখ।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপিকে নিয়ে অনেক আশা করেছিলাম। চব্বিশের পর বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের নেতৃত্বে গড়ে তোলার সুযোগ বিএনপির ছিল। কিন্তু তাদের কে বোঝাল গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে—তা বোধগম্য নয়।

দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, ‘জুলাই সনদ ও জুলাইয়ের ঐক্য হারিয়ে গেছে বা হারিয়ে যাচ্ছে, এমন একটি সন্দেহ তৈরি হয়েছে। গণভোট নিয়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একটি রাজনৈতিক প্রশ্নকে বিচার বিভাগের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তাতে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তারা যথেষ্ট শিক্ষা নেয়নি বলে মনে হচ্ছে।’ 

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথা তুলে ধরে এই অধ্যাপক বলেন, জুলাই সনদ মেনে নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার মধ্য দিয়েই বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। জনগণ বিপ্লব করে আপনাদের ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। সুতরাং জনগণকে ভুলে যাবেন না। আমাদের সামনে কঠিন সময় আসছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিতর্কিত করার বয়ানকে ‘আওয়ামী বয়ান’ বলে আখ্যা দেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, গণভোট নিয়ে তাদের ধারণা অত্যন্ত প্রখর।’ 

শফিকুল আলম আরও বলেন, বাংলাদেশে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভিন্নমতের প্রায় ৪০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাসায় ডেকে জবাই করা হয়েছে, খানকায় জবাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। বাউলদের ধরে ধরে চুল কেটে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ এখনো সত্যিকার অর্থে সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ একটি দেশে পরিণত হতে পারেনি। অতীতেও সেই জায়গায় পৌঁছানো যায়নি, বর্তমানেও নয়। অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে কটাক্ষ করে মজা পান।

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণ না করায় বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস অতিবাহিত হলেও দলটি জুলাই সনদের একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন করেনি। বিএনপি বারবার বলেছে, জুলাই সনদ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কিন্তু ছয় মাসে একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন করেনি। বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফার সঙ্গে বেইমানি করে জাতীয় আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়াচ্ছে।

সংসদে বিরোধী দলও তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে মন্তব্য করে সাবেক এ চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আমরা এই সরকারের বিরুদ্ধে নই। দেশের স্বার্থে দরকার হলে আবারও বিএনপিকে নির্বাচিত করব, তবে আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন।

অহংকার ও জেদের কারণে বিএনপি জুলাই সনদ গণভোট অনুযায়ী বাস্তবায়ন করছে না বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, একটি দল বা ব্যক্তির ইগো ও অহংকারের কাছে জাতিকে হারিয়ে যেতে দেওয়া ঠিক নয়।

বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে শিশির মনির বলেন, ‘৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী অস্বস্তিতে ভোগে। কারণ, গণ-অভ্যুত্থানের ওই সময়ে আন্দোলনের যে বার্তা বা বক্তব্য তৈরি হয়েছিল, তা তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া ছিল না।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে শিশির মনির বলেন, বর্তমান সরকারপ্রধানের সামনে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অনন্য সুযোগ এসেছে। তিনি প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হবেন, নাকি সাধারণ রাজনীতিকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকবেন—সেই সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে।

ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশের মানুষ একটি বড় পরিবর্তনের আশায় জুলাই মাসে রক্ত দিয়েছে। উচ্চ আদালতের নানা রায় এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাষ্ট্রের আমূল সংস্কারে জনগণের সরাসরি মতামত বা গণভোটের কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন

×