ডেঙ্গুতে রেকর্ড ১০ মৃত্যু
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:১৭ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৫
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। গত সোমবার একদিনে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১।
মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে এই মুহূর্তে ডেঙ্গুর টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৮ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৯৬ জন। আর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার দুজন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার একজন, বরিশাল বিভাগের দুজন, খুলনা বিভাগের তিনজন, রাজশাহী বিভাগের একজন এবং ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন রয়েছেন।
নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে (ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে), ৪৮০ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৩০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪২, বরিশাল বিভাগে ২০৩, রাজশাহী বিভাগে ১৯৯, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৪, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৮৭, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৬, রংপুর বিভাগে ৭৫ এবং সিলেট বিভাগে ১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে দীর্ঘমেয়াদে টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তবে এখনই দেশে ডেঙ্গুর টিকা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি। রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটরিয়ামে মঙ্গলবার ‘ডেঙ্গু সংকট মোকাবিলায় করণীয়’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বে বর্তমানে কয়েকটি ক্যান্ডিডেট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে। বাংলাদেশেও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা চলছে। তবে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও কাজ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি জাপান সফরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাপানেও একটি ক্যান্ডিডেট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দাবি, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সব ধরনের ভ্যারিয়েন্টই দেখা যাচ্ছে। তিনি এটিকে ‘ইউনিক সায়েন্টিফিক ফাইন্ডিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ডা. এম এ মুহিত বলেন, মৃত্যুর হার ও আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে হলে প্রথমেই প্রতিরোধের জন্য কাজ করতে হবে। শুধু সরকার বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুরো দেশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মশার লার্ভা ধ্বংস ও মশা নিধনে কাজ করছে।
এ বছর ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, অতীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর সংবাদ প্রকাশ হলে সরকারের পক্ষ থেকে তৎপরতা শুরু হতো। এবার পরিস্থিতি তৈরির প্রায় তিন মাস আগে থেকেই পরিকল্পনা ও কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর উন্নত ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় একটি ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন প্রচার করা হচ্ছে। গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ২ হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হালনাগাদ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ নির্ণয়, দ্রুত রেফারেল এবং হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জনগণ ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
সেমিনারে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান তার উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগীর অতিরিক্ত চাপ, সীমিত জনবল ও হাসপাতাল সুবিধা, বিলম্বিত রোগ শনাক্তকরণ এবং গুরুতর রোগীর দ্রুত অবনতি।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীকে নিয়মিত ও ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সময়মতো সিবিসি ও হেমাটোক্রিট পরীক্ষা এবং সতর্কতার সঙ্গে ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে রোগীর সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড ও অতিরিক্ত ফ্লুইড দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
ডেঙ্গু চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড, পর্যাপ্ত আইসিইউ ও এইচডিইউ, দক্ষ জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধন যথেষ্ট নয়; এর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ মশা, ভাইরাস, মানুষের আচরণ, পরিবেশ, জলবায়ু ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, ফগিংয়ের মাধ্যমে সাময়িকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা যায় না। তাই পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকেও মশার কামড় থেকে নিরাপদ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তঃখাত সমন্বয়, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বলেন, প্রতি সপ্তাহে অন্তত পাঁচ মিনিট বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আগাম সতর্কতা এবং টিকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ। ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংগঠনটির নেতারা বক্তব্য দেন।