ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিগ-বি সম্প্রসারণে বঙ্গোপসাগর ঘিরে নতুন প্রত্যাশা

বিগ-বি সম্প্রসারণে বঙ্গোপসাগর ঘিরে নতুন প্রত্যাশা
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৪:১৭

বঙ্গোপসাগর ঘিরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নানা পরিকল্পনা নিচ্ছে চীন, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগ নতুন কাঠামোয় সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। এরই অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা কথা জানিয়েছে জাপান। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের এক লাখ কোটি ইয়েন (৬৩০ কোটি ডলার) বিনিয়োগের প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও আশা করছে দুই দেশ।

গত মঙ্গলবার টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বিগ-বির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়– ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’। নতুন কাঠামোর লক্ষ্য, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।

এতে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে শুরু, এবার নতুন রূপ

বিগ-বি উদ্যোগের সূচনা ২০১৪ সালে। ওই বছরের মে মাসে টোকিওতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বৈঠকে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প ও যোগাযোগ উন্নয়নের এ পরিকল্পনা সামনে আসে। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো।

শুরুতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ঘিরে যোগাযোগ ও শিল্প উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিগ-বি কোনো একক অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের বৃহত্তর উদ্যোগ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প এ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০২৩ সালে জাপান বঙ্গোপসাগর ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে শিল্পভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আনে। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানো।

বিগ-বিকে নতুন কাঠামোয় সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

মাতারবাড়ী নিয়ে আগ্রহ

বিগ-বির সম্প্রসারণে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কক্সবাজারের মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, শিল্প ও পণ্য পরিবহনের সমন্বিত কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরটির সক্ষমতা বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের পাশাপাশি আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনেরও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শুরুর আগে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ আমদানি-রপ্তানির চাহিদা পূরণে মাতারবাড়ী বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে তা অন্য কাজে ব্যবহারের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

মাতারবাড়ীকে ঘিরে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব জাপানকে দেওয়ার বিষয়ে যৌথ বিবৃতিতে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিগ-বির নতুন কাঠামোয় ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার ঘোষণা যৌথ বিবৃতিতে নেই।

আঞ্চলিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ

বঙ্গোপসাগর ঘিরে চীন, জাপান ও ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে, জাপান বিগ-বির মাধ্যমে বাংলাদেশে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করতে চায়। ভারতের আগ্রহের অন্যতম দিক হলো, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক বাজারের যোগাযোগ বাড়ানো।

এই তিন দেশের উদ্যোগের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে চীন ও জাপান পৃথক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে জাপান বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে শিল্পভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আনে। এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।              

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো একটি দেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ সীমাবদ্ধ না রেখে সবার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা সব ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রকল্পের অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা চীনের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়। একইভাবে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কও জাপানের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্বের বাধা হওয়া উচিত নয়।

আরও পড়ুন

×