যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৮
রাজাকারের গুলির চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন হাছান আলী
আবু সালেহ রনি
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৩২ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:৫২
একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিলেও তাদের বড় বাধা ছিল এ দেশীয় রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে শুধু পথঘাট ও মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিয়েই সহযোগিতা করেনি, কখনও সাধারণ বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তুলে নিয়েছে অস্ত্র; চালিয়েছে নৃশংস গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন।
এমনই এক লড়াইয়ে একাত্তরে রাজাকার বাহিনীর গুলিতে বিদ্ধ হন রংপুরের মুক্তিযোদ্ধা মো. হাছান আলী। যিনি স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেলেও ঢাকামুখী না হওয়ার কারণে এখনও পাননি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সনদ। এ প্রসঙ্গে সমকালকে তিনি বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিয়মিত পাচ্ছি। কিন্তু যুদ্ধাহত ভাতা এখনও চালু হয়নি। কয়েক বছর আগে একবার যুদ্ধাহত ভাতার জন্য আবেদন করেছিলাম। তার কী হয়েছে জানা নেই। ঢাকা যাওয়া হয় না। খরচও আছে।'
একাত্তরে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দরদী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন মো. হাছান আলী। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ৩ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার রাজবল্লভ গ্রামে। বাবা প্রয়াত মনির উদ্দিন পেশায় কৃষক এবং মা প্রয়াত নুরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। চার বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট হাছান আলী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৪ অক্টোবর তিনি পিঠের বাঁ দিকে মেরুদণ্ডে রাজাকার বাহিনীর গুলিতে আহত হন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে যুদ্ধাহত হাছান আলী সমকালকে বলেন, 'পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করছিল, তখন পড়াশোনার জন্য কাগজ বেশি দামে কিনতে হতো। অথচ সেই কাগজ আমাদের চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে উৎপাদনের পর তা পাঞ্জাব হয়ে পূর্ব বাংলায় আসত। রাস্তাঘাট-কলকারখানা সবকিছুই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এসব বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে তখনকার ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে যেতাম। পরে একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে শোনার পর মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার তাগিদ পাই। সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম।'
একাত্তরের ২৫ মার্চ রংপুরের রাজবল্লভের বাড়িতেই ছিলেন হাসান আলী। রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের খবর রাখতেন। পাকিস্তানিদের নৃশংসতার খবর ছড়িয়ে পড়লে এপ্রিলের মাঝামাঝি গ্রামের বন্ধু আবদুল হাদি, দুলাল মিয়া, মোবারক হোসেন, মজিবরসহ আরও অনেকের সঙ্গে লালমনিরহাটের চাপারহাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের সীতাইবন্দরে গিয়ে আশ্রয় নেন। তখনও মুক্তিযুদ্ধে যাবেন এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। পরদিন রংপুরের আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এ প্রসঙ্গে হাছান আলী বলেন, তখন আওয়ামী লীগের এক এমএনএ (এমপি) মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণের জন্য একটি স্লিপ দিয়েছিলেন। সেই স্লিপ নিয়ে চলে যাই কোচবিহার শহরের মহারাজার বাসায় স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পে। আরও অনেকে সেখানে উপস্থিত ছিল। সেখান থেকে দু-তিন দিন পর আমাদের কাশিয়াবাড়ি ক্যাম্পে নেওয়া হয়। পরে মেডিকেল ফিটনেস পরীক্ষার পর বাছাই করা শতাধিক ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণের জন্য শহর থেকে জলপাইগুড়ির মধ্যে মজিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া হয়। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ চলে। ভারতীয় বাহিনীর ক্যাপ্টেনরা প্রশিক্ষণ দেন। মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জলপাইগুড়ির চাউলাহাটিতে পাঠানো হয়। সেখানে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পরে ১২ জুলাই আমাদের ২৫ জনকে বর্তমান পঞ্চগড় সদরের মধ্যে টোকাপাড়া ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তখনও তেঁতুলিয়া থেকে ভোজনপুর পর্যন্ত এলাকাটি পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত ছিল। প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন পিন্টু মিয়া। তিনি দু-তিন দিন পর আমাদের ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধা মালেক নামে একজনকে পঞ্চগড় শহর থেকে দেড় মাইল পশ্চিমে একটি ব্রিজ রেকি করতে পাঠান। দুপুরের দিকে সে এসে জানায়, ওখানে রাজাকাররা থাকে। স্থানীয়রাও আমাদের খবর জানে। দু-একদিনের মধ্যে টোকাপাড়ায় আমাদের ক্যাম্পে পাকিস্তানিরা আসতে পারে। তখন প্লাটুন কমান্ডার পিন্টু মিয়া বলেন, 'মালেক তুমি গোসল করে কিছু খাও। পরে দেখছি।' আমরা তখন প্রায় সবাই বিশ্রামে। কিছু সময় পর হঠাৎ স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর এলো পাকিস্তানিরা ক্যাম্পের দিকে আসছে। একজন জানাল, প্রায় ২০-২৫ জন আর্মি রয়েছে। তখন আমরাও ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। এতে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, পাকিস্তানিদের প্রতিহত করব। আমাদের কাছে অস্ত্র বলতে ছিল এলএমজি, রাইফেল ও হ্যান্ড গ্রেনেড। কোনো ভারী অস্ত্র ছিল না। এ নিয়েই আমাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। কিন্তু পাকিস্তানিরা পেছন থেকে আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করে। এতে গোলাম গউছ নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তাৎক্ষণিক শহীদ হন। প্রায় ঘণ্টাখানেক যুদ্ধের পর আমরা ক্যাম্প ছেড়ে গোলাম গউছের মরদেহসহ আত্মগোপন করে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের জলপাইগুড়িতে চলে যাই। পরে ভারতের সীমান্ত এলাকায় গোলাম গউছকে দাফন করা হয়।'
একাত্তরে ৬ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন হাছান আলী। তার গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন শহীদুল ইসলাম বাবলু। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মাহাবুব আলম। এই গ্রুপটি পঞ্চগড়ের ভেতড়গড়, মারেয়া, সাকোয়া, নয়াদীঘি, পেয়াদাপাড়া, বোদা থানার করতোয়া নদী এলাকায় যুদ্ধ করেন। ৬ নম্বর সেক্টরই একমাত্র সেক্টর যার হেডকোয়ার্টার ছিল দেশের অভ্যন্তরে বুড়িমারীতে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর আর ঠাকুরগাঁও নিয়ে ছিল এই সেক্টর। এই সেক্টরের সাধারণ মানুষ ২৮ মার্চ দেশি অস্ত্র নিয়ে রংপুরে পাকিস্তানি ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে। পরিণামে নির্বিচারে জীবন দিতে হয় তাদের। অবশ্য ৬ নম্বর সেক্টর গঠিত হয় একাত্তরের জুলাই মাসে। যার কমান্ডার ছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট খাদেমুল বাশার। পাঁচটি সাব সেক্টরে বিভক্ত হয়ে এই সেক্টর যুদ্ধ পরিচালনা করে। সেক্টরটির উল্লেখযোগ্য অপারেশন ছিল রেল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা তিস্তা নদীতে চালানো অভিযান। এই সেক্টরে অংশগ্রহণকারী ১১ হাজার মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৬ হাজারই ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা।
তাদেরই একজন হাছান আলী একাত্তরের ১৪ অক্টোবর গেরিলাযুদ্ধ করতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আহত হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা গেরিলা কায়দায় আক্রমণ করতাম। যে কারণে কয়েকদিন পর পর এলাকা পরিবর্তন করতে হতো। পঞ্চগড়ের বোদা থানায় তখন ক্যাম্প স্থাপন করেছিল পাকিস্তানিরা। সেখানে যাতায়াতের জন্য মারেয়া এলাকায় ব্রিজ ব্যবহার করত তারা। তখন আমরা ওই রাস্তায় মাইন পোতার জন্য সকালে কয়েকটি পুরি খেয়ে রওনা হই। খবর এলো, কালিয়াগঞ্জে বাজারের বিপরীতে করতোয়ার উল্টোদিকে রাজাকাররা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে। তখন আমাদের ক্যাম্প ও পার্শ্ববর্তী ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা মাইন পোতা বাদ দিয়ে ১১টার দিকে রাজাকারদের ওখানে নদীর ধারে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি বাঙালিদের কেউ কেউ আমাদের ডাকছে- 'বলছে, নিয়ে যান।' আবার কাউকে দেখছি অস্ত্র তাক করে আছে। আমরা তখন নৌকা নিয়ে সেখানে যাব এমন ভাবছি। এমন সময় আমাদের দিকে গুলি আসে। পরে আমরাও গুলি ছুড়তে থাকি। ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলার পর রাজাকাররা পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তখন জানায়, পশ্চিম দিকে ওয়াপদা অফিসের দিকে গেছে। তখন শহীদুল ইসলাম বাবলু ভাই, কুড়িগ্রামের মুসা, আমিসহ ছয়-সাতজন ওয়াপদা অফিসের দিকে যাই। আমরা সরাসরি না গিয়ে ঝোপঝাড় দিয়ে গিয়েছিলাম। তখন সেখানে গিয়ে দেখি ওয়াপদার ওপরে এলএমজি নিয়ে রাজাকাররা টহল দিচ্ছে। তখন বাবলু ভাইকে বললাম, 'ওই যে খান সেনা।' তিনি আমার কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গুলি ছোড়েন। সেখানে পাল্টাপাল্টি গুলিবিনিময় হয়। এমন সময় বাঁ দিক থেকে একটি গুলি এসে আমার মেরুদণ্ডে বিদ্ধ হয়। তখন মনে হলো, আমাদের কারও ছোড়া গ্রেনেড লেগেছে। আবার মনে হলো, গ্রেনেড ছুড়লে তো ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথা। পরে বুঝলাম, গুলি লেগেছে। ওরাও বলল, রক্ত বেরোচ্ছে। কিন্তু তারা সবাই পাল্টা গুলি ছুড়তে ব্যস্ত। এমন ১৫-২০ মিনিট চলার পর বাবলু ভাই বললেন, 'গুলি লেগেছে।' এ সময় সবাই আমাকে নিয়ে পিছু হটে ক্যাম্পে ফিরে আসে। ওরা তাড়া করতে থাকলে আমরা দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড রাজাকারদের দিকে ছুড়ে দিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হই। এভাবেই সেদিন আমাকে তালিয়াগঞ্জ ক্যাম্পে নিয়ে আসে।'
যুদ্ধাহত হাছান আলীকে চিকিৎসার জন্য পরে তিনটি হাসপাতাল ঘুরে নেওয়া হয় ভারতীয় সেনাদের বাধডোকরা সেনা হাসপাতালে। সেখানেই তার অপারেশন হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসেন এবং চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নেন ও খাবার দেন। পরে হাছান আলীকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মুক্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে কিছুদিন পর চাউলহাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফিরে আসেন। এরপর সেই ক্যাম্পেই বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন তিনি।
দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক হাছান আলী তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা বলতে গিয়ে বলেন, 'তোমাদের বাংলাদেশ নামে একটা মানচিত্র দিয়েছি। একটিই চাওয়া- তোমরা যেন এটা ভালোভাবে ধরে রাখতে পারো।'
কর্মজীবনে হাছান আলী ২৮ বছর রংপুর চিড়িয়াখানায় নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। গত ৩ অক্টোবর তিনি অবসরে যান। বর্তমানে রংপুর শহর থেকে আট কিলোমিটার উত্তরের বুড়িরহাট কৃষিফার্মের পাশেই গোয়ালু নতুনপাড়ার বাসিন্দা। স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা বলতে গিয়ে হাছান আলী বলেন, 'এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে, কষ্টে আছে। আমরা থাকব না। আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন ভালো থাকে। সরকার সে ব্যবস্থা করবে- এটাই আমার চাওয়া।'
- বিষয় :
- যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা
- রাজাকার
- মুক্তিযুদ্ধ
