ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের শোক

ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের শোক
×

স্যার ফজলে হাসান আবেদ-ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৩৯

কিংবদন্তি সমাজসেবক স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এক শোকবার্তায় বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদের জীবন মানবতার জন্য এক বিরাট উপহার। ব্র্যাকে ৫০ বছরের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ এবং তার বাইরে কোটি কোটি মানুষের জীবন আমূল বদলে দিয়েছেন।

শনিবার ব্র্যাকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মেলিন্ডা গেটস বলেন, মহৎ মানবতাবাদী ছিলেন তিনি। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রয়োজনকে বিস্মৃত না হয়ে কীভাবে বৃহৎ ও কার্যকর সংগঠন গড়ে তুলতে হয়। তার কাজ আমাদের চিরকালীন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, তার কর্মের বিপুল বিস্তৃতি ও প্রভাব এবং যেভাবে পরিপূর্ণ বিনয় সহকারে তিনি সেগুলো সম্পন্ন করেছেন, তা আমাদের শিক্ষার নিবিড় পাথেয় হয়ে থাকবে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত ব্যানার্জি এবং এস্তার দুফলো বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদের মতো মানুষ কয়জন হয়! তার প্রয়াণে আমরা সবাই ছোট হয়ে গেলাম।

উইমেন ফর উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক জয়নব সালবি টুইটে লিখেছেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। তিনি ছিলেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। সবচেয়ে উদ্ভাবনী ও সাহসী পন্থায় দারিদ্র্য দূর করার জন্য তিনি ৪৭ বছর বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, তিনি আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। আমরা, ইউনিসেফের সবাই তার উন্নয়ন ভাবনাগুলোর অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করব।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা: স্যার ফজলে হাসান আবেদ একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমার একমাত্র মনোকষ্ট হলো আরও দ্রুত চলা উচিত ছিল আমার। বিদেশে হয়তো আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল আমার (ব্র্যাকের)। বাংলাদেশ থেকে বের হতে আমাদের ৩০ বছর লেগে গেছে।’ ২০১৪ সালে থম্পসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি। শুক্রবার রাতে তার মৃত্যু নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়। রয়টার্সের মতোই আরও বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয়েছে। রয়টার্স জানায়, স্যার আবেদ প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক এখন এশিয়া ও আফ্রিকার ১১টি দেশের ১৩ কোটি মানুষকে সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত আছেন লক্ষাধিক মানুষ। ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসেও অফিস রয়েছে ব্র্যাকের।

নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ১৯৭২ সালে ৩৬ বছর বয়সে স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্র্যাক। সময়ের পরিক্রমায় সেটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়ন সংস্থা। শিক্ষা থেকে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক স্টার্টআপ থেকে বৃহৎ পরিসরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্র্যাক। তিনি পেয়েছেন বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। ব্রিটেনের রানী তাকে দিয়েছেন নাইটহুড খেতাব।

ডেইলি মেইলের খবরে বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হলে লন্ডনে শেল কোম্পানিতে উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দাতব্য কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ভারত থেকে ফেরত আসা লাখ লাখ শরণার্থীকে সহায়তা দেয় তার প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক। এরপর স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি ও শিক্ষা খাতে কাজ শুরু করে সংস্থাটি।

২০১০ সালে এক এক সাক্ষাৎকারে স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেছিলেন, ব্র্যাক দারিদ্র্যকে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটা শুধু আয়ের দিক থেকে দারিদ্র্য নয়; স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো বিষয়গুলোও দরিদ্রদের দরিদ্র বানিয়ে রাখে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মনে করা হয় যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৮০ ভাগ থেকে ৪০ ভাগে নেমে আসার একটি কারণ ছিল এনজিওদের তৎপরতা। ব্র্যাকের মডেল এতটাই সফল হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিরা এর প্রশংসা করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাক কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য শিবির ও প্রসব কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পর স্যার ফজলে হাসান আবেদ এএফপিকে বলেছিলেন, আফগানিস্তান ও অন্যান উন্নয়নশীল দেশে ব্র্যাকের সফলতার অন্যতম কারণ আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে (কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে) গিয়েছি। আমরা দারিদ্র্যকে বুঝতে পারি।

হওয়াশিংটন পোস্টের খবরে ব্র্যাকের ইন্টারন্যাশনাল বোর্ডের প্রধান আমিরা হককে উদ্ধৃত করে বলা হয়, "তার (স্যার ফজলে হাসান আবেদ) ত্যাগ, অধ্যবসায় এবং দৃঢ় নৈতিক অবস্থান তাকে ব্র্যাকের প্রতিটি সদস্যের কাছে 'আবেদ ভাই'-এ পরিণত করেছে।"

রয়টার্সকে স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেছিলেন, দেশে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর আমার মনে হয়েছিল শেল কোম্পানিতে নির্বাহী পদে চাকরি অর্থহীন। এরপর থেকেই আমি (মানুষের) জীবন পরিবর্তনে সহায়তায় অঙ্গীকারবদ্ধ হই

মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে বলেছে, স্যার ফজলে হাসান আবেদ এমন একজন মানবহিতৈষী ছিলেন, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন উন্নয়ন কাজ কীভাবে করতে হয়। তিনি একটি দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও ভুলে যাননি, কাদের জন্য এটি কাজ করছে। আমরা তার মৃত্যুর সংবাদে মর্মাহত এবং তার কাজ সারা বিশ্বের মতোই আমাদেরও চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস।

আরও পড়ুন

×