ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সমকাল-সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ-কনসার্ন গোলটেবিল বৈঠক

সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে নগরের দরিদ্রদের

সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে নগরের দরিদ্রদের
×

বৃহস্পতিবার সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১:০৬ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১:১৩

কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে নগর দরিদ্ররা সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আসছে না। ফলে প্রতিনিয়ত বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে শহরের বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে। নগরের এই দারিদ্র্য দূর করতে চাইলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। পাশাপাশি থামাতে হবে শহরমুখী জনস্রোত।

বৃহস্পতিবার দৈনিক সমকাল কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। নগর দরিদ্রের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গৃহীত 'আরবান কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট' কার্যক্রমের বাস্তবায়নবিষয়ক এ বৈঠক সম্মিলিতভাবে আয়োজন করে সমকাল, সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি) এবং কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশ।

বৈঠকে বক্তারা বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানির কারণে অতিদরিদ্রদের নেওয়া প্রকল্পের বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয় না। ফলে হতদরিদ্রের সংখ্যা গ্রামে কমলেও নগরে বাড়ছে। নগরে এখনও অনেকে খোলা আকাশের নিচে বাস করেন। এভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য কখনোই অর্জন করা যাবে না।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রথমে নগরমুখী জনস্রোত থামাতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের মতো নগরেও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী- তাদেরও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শামিল করার আহ্বান জানান তিনি।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, নগর দরিদ্রদের পরিস্থিতি বদলাতে চাইলে পরিকল্পিত উন্নয়ন দরকার। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। তারপর বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যম, উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। সমকাল বিশ্বাস করে, শুধু খবর প্রকাশের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেশের উন্নয়নেও নানাভাবে ভূমিকা রাখতে হবে।

ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, নগরায়ণের ক্যাটাগরি ঠিক করতে হবে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি 'গ্রাম হবে শহর' বাস্তবায়ন হলে সমস্যাগুলো থাকবে না। কিন্তু তার আগে এটাও ভাবতে হবে, মানুষ কেন শহরমুখী হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধা নিশ্চিত হলে উৎপাদন বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। তিনি বলেন, গত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ যথেষ্ট ছিল না। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য বদরুদ্দোজা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নগর দরিদ্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্রামে সঠিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে শহরমুখী জনস্রোত কমবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০১ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ নগরে বাস করেন। এক দশকের মাথায় সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৩৭ শতাংশে। ২০১১ সালের জরিপে দেখা গেছে, নগরে বসবাসকারীদের ৪৪ শতাংশই থাকেন ঢাকায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণের রাশ টেনে ধরতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শহরে আয় বেশি হলেও জীবনযাত্রার মান খারাপ। ব্যয়বৃদ্ধিও দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ।

পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির বলেন, গ্রামাঞ্চলে দরিদ্রদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত কার্যক্রমগুলো শহরে হয় না। এসব কার্যক্রম শহরে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, সে বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এ বিষয়ে আরও আলোচনা এবং জনমত তৈরি করা উচিত। নগরে দরিদ্র কমানোর জন্য শহরের ভাসমান মানুষের ডাটাবেস তৈরি করার ওপর জোর দেন তিনি।

সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য শামীমা আক্তার খানম বলেন, আগে চিহ্নিত করতে হবে গ্রামের মানুষ শহরে আসার কারণ। বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেকে শহরে অভিবাসিত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখছে। তাই কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

সরকারের নানা উন্নয়ন পরিকল্পনার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেসব পরিকল্পনা নিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে 'একটি বাড়ি একটি খামার' ও 'গ্রাম হবে শহর'- এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগর দারিদ্র্য কমে আসবে। তবে গ্রামীণ উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। হাওরাঞ্চলের মানুষের সংগ্রামী জীবনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) সাব্বির ইমাম বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যাপক কাজ করছে। ৪৪ লাখ নগর দরিদ্রকে বয়স্ক-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। কোনো কাগজপত্র ছাড়াই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। শতভাগ প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আসছে। এতিমখানাসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার কাজ করছে। বাস্তবভিত্তিক অনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য অনেক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এসবের ফলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেবে।

এপিপিজির সাধারণ সম্পাদক শিশির শীল বলেন, পল্লী দরিদ্র ও হতদরিদ্রসহ অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার বাজেট বরাদ্দ দেয় ঠিকই, কিন্তু এগুলো খরচ হয় না। কোন মন্ত্রণালয় তা খরচ করবে, এ সিদ্ধান্ত নিতেই অর্থবছর শেষ হয়ে যায়। চা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও হাওর অঞ্চলের জন্য সরকার একাধিকবার বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সেই অর্থের ব্যয় হয়নি। অনেক ইনোভেটিভ প্রকল্প নিলেও তা নিয়ে চিন্তা করতেই চলে যায় অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস।

তিনি বলেন, আরবান কমিউনিটি উন্নয়ন ছাড়াও সরকার নগরের দরিদ্র মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। এরপরও অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী নগরের হতদরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে এবং গ্রামে এর সংখ্যা কমছে। এই সংখ্যা কমাতে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া ইউসিডি কার্যক্রমের আপডেট তথ্য থাকতে হবে। সমাজকল্যাণ কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করতে হবে।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশের আরবান প্রোগ্রাম প্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, শহর ও গ্রামে যারা ভাসমানভাবে এবং পথে বসবাস করছে, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে গোনা যাবে। সরকারি বরাদ্দের খুব সামান্যই এ কর্মসূচির জন্য ব্যয় করা হয়। আরবান কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (ইউসিডি) প্রকল্পে দুই দফায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও প্রায়োগিক অর্থে তার ব্যবহার পরিকল্পনাও দৃশ্যমান নয়। তাই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইউসিডি কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, ভাসমান মানুষের মৌলিক অধিকার নেই, স্থায়ী কোনো ঠিকানা না থাকায় জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই, তাদের সন্তানদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয় না। অথচ যাদের ভাসমান বলা হচ্ছে, তারা বছরের পর বছর একই স্থানে বসবাস করছে।

কাপের নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৪৫টি কর্মসূচির মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন হয় নগরে। শহরে দরিদ্রদের উন্নয়নে কীভাবে আরও পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা দেখতে হবে। নীতিমালায় ত্রুটি রয়েছে, যা সংশোধন করতে হবে। তিনি বলেন, বারবার দাবি করার পরও 'আরবান কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট' নামটি এখনও পরিবর্তন করা হয়নি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক জানান, সরকার শতভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ভাতার আওতায় আনতে চায়। ভাতার জন্য তার ওয়ার্ডে কাউকে হয়রানির শিকার হতে হয় না। তারা বরং প্রতিবন্ধীদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সরকারের ভিশন-২০৪১ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুবিধাবঞ্চিত এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়া শিশুরা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মাফিয়ারা এই শিশুদেরই টার্গেট করে থাকে।

স্বনির্ভর মহিলা সংস্থার সভাপতি সালমা কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হতদরিদ্রদের জন্য অনেক কিছু করলেও দরিদ্ররা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ করছে না। তাদের সহায়তা তারা বিক্রি করে দেয়। ঢাকায় বসবাসের জন্য সরকার বস্তিবাসীর যে বাসা তৈরি করে দিয়েছে, তারা তা বিক্রি করে আগের মতো বস্তিতে বসবাস করছে। এ মানসিকতার পরিবর্তন না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বস্তিবাসীর অধিকার সুরক্ষা কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজা বলেন, ঢাকা শহরে বর্তমানে অন্তত ৪০ লাখ বস্তিবাসী আছেন। তারাই এই শহরের চালিকাশক্তি। এই পথবাসী বস্তিবাসী না থাকলে শহর নোংরা হয়ে থাকত। অথচ তাদের জন্য সরকারের নানা পরিকল্পনা এবং প্রকল্প থাকলেও সেই সুবিধা তারা ভোগ করতে পারেন না।

বয়স্ক ও বিধবা-ভাতার আওতায় আসার ক্ষেত্রে হয়রানির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা সবাই এক ছাতার নিচে কাজ করি। আমাদের অধিকার যেন লুণ্ঠিত না হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'কেউ রাস্তায় ঘুমাবে না।' আমরাও রাস্তায় ঘুমাতে চাই না। ভালো পরিবেশে সন্তানদের মানুষ করতে চাই।

বস্তিবাসীর অধিকার সুরক্ষা কমিটির ডিএনসিসির ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি রোকেয়া বেগম বলেন, যে বাসায় বসবাস করছিলাম, সেটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন বাবা-মা, ভাই-বোনকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। সরকার যে ভাতা দেয়, সেটাও পাচ্ছি না। ক্ষুদ্রঋণও পাই না। ফলে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই কাটাতে হয়।

আরও পড়ুন

×