ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সিএনএনের বিশ্লেষণ 

ইসরায়েলের সঙ্গে কি সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র 

ইসরায়েলের সঙ্গে কি সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র 
×

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৩:০১

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু করার বিষয়টি সব সময়ই দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল। তবে সম্প্রতি এই উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেছেন। এটি অনেকের কাছে সরাসরি হুমকির মতো শুনিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন ধরে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল, এটি ছিল তারই চূড়ান্ত রূপ। 

সিএনএনের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টতই আশঙ্কা করছে, ইসরায়েল হয়তো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতাটি ভেস্তে দিতে পারে। গত শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি নবায়নে সম্মত হলেও লেবাননে তেল আবিবের হামলা অব্যাহত রয়েছে। 

দুই দেশের মধ্যকার এই দূরত্ব তৈরি হওয়া যেন অনিবার্য ছিল। এর পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইরানের যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ইসরায়েলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমনকি প্রবলভাবে ইসরায়েলপন্থি রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও এখন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দেশটির তীব্র সমালোচনা করছেন। এখন ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ইসরায়েলকে চিৎকার করে বলছে, ‘আমরা যা দিয়েছি তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকো, অন্যথায় পরিণতি ভালো হবে না।’ 

জেডি ভ্যান্সের নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি 
ট্রাম্পের রানিং মেট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা কমার কথা উল্লেখ করে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সারাবিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে বিশ্বের বুকে অবশিষ্ট থাকা একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে এভাবে আক্রমণ করতাম না।’  ভ্যান্স বারবার ইসরায়েলকে সাবধানে পা ফেলার পরামর্শ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের ওপর ইসরায়েলের সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি নেতাদের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা উচিত। আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। শুধু হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আপনারা আপনাদের প্রতিটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না।’ 

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান 
জেডি ভ্যান্সের এই সুর খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরই প্রতিধ্বনি। ট্রাম্পও বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক আচরণকে বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘বিবি, তোমাকে সতর্ক হতে হবে, অন্যথায় খুব শিগগিরই তুমি একা হয়ে পড়বে।’  ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ইসরায়েলকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেন, ‘কাউকে খোঁজার জন্য প্রতিবার একটা পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই ভবনে আরও অনেক মানুষ থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহ নয়।’  তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে আজ ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। ইসরায়েল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে শতভাগ মুছে যেত এবং ইসরায়েলের প্রতিটি বুদ্ধিমান মানুষ এই সত্যটি জানে।’ 

নতুন মেরূকরণ ও ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ
এই কঠোর বার্তার মানে এই নয় যে, ট্রাম্প ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখনই পুরোপুরি ভেঙে যাবে। শান্তি আলোচনার টেবিলে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হয়তো ওয়াশিংটন এই কৌশল অবলম্বন করছে। কিন্তু ট্রাম্প এবং ভ্যান্সের মুখে এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করাটাই একটি নজিরবিহীন ঘটনা। অতীতে ট্রাম্প অন্য মিত্রদের সঙ্গে ব্যবসায়িকসুলভ রূঢ় আচরণ করলেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে পবিত্র মনে করতেন। কিন্তু এখন ভ্যান্স ও ট্রাম্প যেভাবে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন, তা গত বছর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনোস্কিকে দেওয়া ট্রাম্পের সেই ধমকের কথা মনে করিয়ে দেয়। ট্রাম্প বলেছিলেন- আপনি কি একবারও ধন্যবাদ বলেছেন? 

উভয় ক্ষেত্রেই ট্রাম্প নিজের শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে মিত্রদের বাধ্য করছেন। তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এই নীতি কয়েক দশকের পুরোনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×