ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারী ও কন্যাশিশু সুরক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

নারী ও কন্যাশিশু সুরক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
×

ছবি: সংগৃহীত

রিক্তা রিচি 

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ১৩:০৩ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ১৩:১০

আজ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতা কারখানার নারীরা মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এরপর ১৯০৮ সালে ১৫ হাজার নারী নিয়ে প্রথম নারী সম্মেলন এবং ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দেন। ১৯১৪ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় এ দিনটি উদযাপিত হয়। জাতিসংঘ ৮ মার্চকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৫ সালে। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী এ দিনটি নারী দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। তবে নারী দিবসের প্রথম প্রতিপাদ্য ঠিক হয় ১৯৯৬ সালে। ‘অতীতের উদযাপন, ভবিষ্যৎ ঘিরে পরিকল্পনা’–এ প্রতিপাদ্য নিয়ে সে বছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। 

নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। এ প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়–নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় এখনই কাজ না করলে ভবিষ্যতের সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি রোধ, বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের মতো সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, পরিবার ও সমাজে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিলে আগামীতে এর সুফল দৃশ্যমান হবে। আজ উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে আগামীতে নারী ও শিশু নিরাপদে চলাফেরা ও কাজ করতে পারবে, আইন ও বিচারব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থাকবে না, নেতৃত্বের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ স্বাভাবিক হবে। মূলত মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বলে। নিরাপত্তা, মর্যাদা, সমতা ও স্বাধীনতা–এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।

উচ্চ আদালতের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম মনে করেন, সমাজে এক ধরনের সামগ্রিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ কমানো যায়–এমন ধারণা বিপজ্জনক। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে নির্যাতনের শাস্তি আর হত্যার শাস্তি প্রায় সমপর্যায়ে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনকে নিশ্চিহ্ন করতে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে।’ তিনি মনে করেন, আইনের পাশাপাশি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন জরুরি। দীর্ঘদিনের শাসন-সংস্কৃতি নৃশংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। তাই পদক্ষেপ হতে হবে সামগ্রিক–শুধু আইন নয়, মানুষের মানসিক গঠনেও পরিবর্তন আনতে হবে।

কন্যাশিশু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের সমাজে এখনও অনেক পরিবার কন্যাকে বোঝা মনে করে। অথচ কন্যাকে যদি আশীর্বাদ হিসেবে বড় করা যায়, তবে বঞ্চনার বদলে মমতা কাজ করবে। তাঁর মতে, কন্যাশিশু পিছিয়ে থাকলে ‘সমতা’ নয়, বরং ইতিবাচক বৈষম্যের মাধ্যমে আগে তাকে এগিয়ে নিতে হবে। শিক্ষা ও চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে। সংবিধানে সমতার কথা থাকলেও পারিবারিক আইন ও সম্পত্তির মালিকানায় বৈষম্য রয়ে গেছে–এসব সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

নারীপক্ষের সদস্য ও আইনজীবী কামরুন নাহার মনে করেন, এবারের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী। ‘শুধু রাষ্ট্র নয়, পরিবার, সমাজ–প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার।’ তিনি বলেন, আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বড় ঘটনা ঘটলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে তা আর না ঘটে, সে রকম টেকসই উদ্যোগ কম দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, নারীবিদ্বেষী তৎপরতা বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। ইতিবাচক আইন থাকলেও বাস্তবায়নে উদাসীনতা ও নেতিবাচক মানসিকতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই আইনের সংস্কারের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তন অপরিহার্য।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত ‘আগামীর ন্যায়বিচার’কে একটি সমন্বিত ধারণা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এটি শুধু আইনি ন্যায়বিচার নয়; সামাজিক মর্যাদা, বৈষম্যহীনতা, অর্থনৈতিক সুযোগ ও সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গেও জড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে নারী ও কন্যাশিশু সুরক্ষায় একাধিক আইন রয়েছে–যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), গার্হস্থ্য সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন (২০১০), বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন (২০১৭)। কিন্তু ঘাটতি রয়ে গেছে প্রয়োগে বিলম্ব, তদন্তের দুর্বলতা ও ভুক্তভোগী সহায়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায়।

তিনি মনে করেন, ভুক্তভোগীরা সামাজিক কলঙ্ক ও পারিবারিক চাপে অনেক সময় অভিযোগই করতে পারেন না। তাই দ্রুত বিচার, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জেন্ডার সংবেদনশীলতা এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষা, পুষ্টি ও আর্থিক সহায়তায় লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য কমাতে কার্যকর হতে পারে।
তিনজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট–আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন দুর্বল; সচেতনতা আছে, কিন্তু দায়বদ্ধতা কম। পরিবারে বৈষম্য শুরু হয়, সমাজে তা বিস্তার পায় আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেটিকে রোধ করা।

আজকের পদক্ষেপ যদি হয় শিক্ষা, সুরক্ষা, আইনি সংস্কার ও মানসিক পরিবর্তনের সমন্বিত প্রয়াস–তবেই আগামীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। 

আরও পড়ুন

×