ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

রম্য রচনা

আর্জেন্টিনা আসলে কাদের দোসর?

আর্জেন্টিনা আসলে কাদের দোসর?
×

জর্ডানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে গোলের ব্যবধান বাড়ান লিওনেল মেসি। ছবি: এএফপি

অর্ণব সান্যাল

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৫:৪৭ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ | ১৫:৪৮

‘সবচেয়ে বেশি জার্সি চলতেসে হইলো আর্জেন্টিনার’। 

কথাগুলো বলছিলেন শরীফ পাটোয়ারী। তিনি জার্সি বিক্রি করেন। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার পরই জার্সি বিক্রিতে এগিয়ে আছে ব্রাজিল। এরপর আছে পর্তুগাল ও স্পেন। তাই অন্তত জার্সি বিক্রিতে বাংলাদেশে ব্রাজিল পিছিয়ে গেছে আর্জেন্টিনার তুলনায়। 

শুধু কি আর জার্সি বিক্রি? একবার চারপাশে চোখ বোলালেই দেখা যাবে, আকাশি-সাদা শিবিরের প্রাধান্য একটু বেশিই। জার্সি আছে, ক্যাপ আছে, লুঙ্গি আছে, শাড়িও আছে। আর পতাকা তো দেখা যাচ্ছে হরহামেশা। এত কিছুর ভিড়ে তাই এতটুকু বলাই যায় যে, প্রচার, প্রচারণায় এবার আর্জেন্টিনা শিবির ‘ফর্মে’ আছে। এটি স্বাভাবিকও। কারণ বিশ্বকাপের গত আসরেই শিরোপা পেয়েছে মেসির দল। সুতরাং, হলুদ-সবুজের তুলনায় কিছুটা বেশি ‘ফ্লেক্স’ বা বড়াই দেখানোর অধিকার আসলেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আছে। 

ওদিকে ২০২২ সালে যে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে আর্জেন্টিনাকে মনে-প্রাণে ধারণ করা বাংলাদেশিরা, ঠিক একই যাতনায় এখন আছে ব্রাজিলীয়দের চেয়ে বেশি সাম্বা নাচের মুদ্রা জানা বাংলা মুলুকের বিশেষ জনতা। আগে যাদের কথায় কথায় ৩৬ মনে করিয়ে দেওয়ার রোগ ছিল, এখন তারা নিজেরাই ২৪ ভুলতে পারছে না। কেউ ভুলতে না দেওয়ার চেষ্টা করলেও আবার রেগে যাচ্ছে তারা। সেই রাগ একটু-আধটু নয়, একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠা যেন!  

মূল ক্যাঁচাল হলো, আর্জেন্টিনা এখনও সদ্য বিশ্বকাপজয়ী দল। সেই ‘হিট’ বা উত্তাপ ব্রাজিলের সমর্থকেরা নিতে পারছে না। 

বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন আর্জেন্টিনার হিসাব জানা যাক। ১৯৭৮ সালে প্রথমবার ফুটবলের বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ওই সময়টায় দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল সেনাশাসিত একনায়ক। অর্থাৎ, এক কথায় স্বৈরশাসনে ছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এই শাসন চলে। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ওই স্বৈরশাসনের কালকে বলা হয়ে থাকে ‘ডার্টি ওয়ার’। 

মূলত বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে নিকেশ করার জন্য ওই সময়টা কুখ্যাত ছিল। এবং সেই বৈশিষ্ট্যের কারণেই নামকরণ হয়েছিল ‘ডার্টি ওয়ার’। ১৯৮৩ সালের পর ধীরে ধীরে স্বৈরশাসন থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনের দিকে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে সেই রূপান্তর খুব একটা সহজে হয়নি। বরং স্বৈরশাসনের বৈশিষ্ট্য থেকেই যায়। তৎকালীন গণতান্ত্রিক সরকারও নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। আর তা থেকে পুরো আর্জেন্টাইন জাতিকে একটুখানি স্বস্তি দিয়েছিল এক নায়ক। নাম তাঁর ম্যারাডোনা। যিনি আবার প্রতিপক্ষকে এক হাত নিতেও কখনো কসুর করতেন না!

ম্যারাডোনার জাদুতেই ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এরপর থেকেই মূলত বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন। কারণ ম্যারাডোনা এমনই আলোড়ন তুলতে পেরেছিলেন, যাতে গোটা পৃথিবীর মতো আন্দোলিত হয়েছিল এ দেশের আপামর ফুটবলপ্রেমী। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ওই বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের পরই বাংলাদেশে মানুষের আর্জেন্টিনার প্রতি প্রেম গাঢ় হয়েছিল। এতটাই গাঢ় যে, এরপরের ৩৬ বছরেও তা ফিকে হয়নি। এমনকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয়েছে। তাতে আক্ষেপ ছিল, হলুদ-সবুজ শিবিরের সঙ্গে ঝগড়াও ছিল। কিন্তু টিকে থেকেছে আকাশি-সাদার প্রতি প্রেম। 

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে যে সময় থেকে আর্জেন্টিনা ও ম্যারাডোনার প্রতি প্রেম সৃষ্টির জোয়ার উঠেছিল ওই সময়ে বাংলাদেশও ছিল একনায়কতন্ত্রের অধীনে, তা স্বৈরশাসন হিসেবেই দেখা হতো। 

অবশেষে সাড়ে তিন দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ পায় আর্জেন্টিনা। তাতেও বড় অবদান এক নায়কের। তিনি লিওনেল মেসি। ওই সময়টায় বাংলাদেশে কে বা কারা ক্ষমতায় ছিল, তা নিশ্চয়ই আর মনে করিয়ে দিতে হবে না। এ দেশের মানুষের মেমোরি জেলি ফিশের মতো বলে দুর্নাম আছে বটে। তবে তাই বলে অতোটাও না আবার! সুতরাং চাইলে ডট মিলিয়ে ফেলা যায়। আর তাতে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যই মূর্ত হয়ে ওঠে। সেটি আর্জেন্টিনায় হোক বা বাংলাদেশে। 

আর্জেন্টিনা যে বরাবরই এক নায়কের ওপর ভর করে বিশ্বকাপ জেতে- তা সম্ভাব্যতার সূত্র অনুযায়ী বেশ মেলে। তা এই ‘এক’ ও ‘নায়ক’-এর মধ্যে তফাৎ থাকুক, আর না থাকুক। এক-এর ওপর ভর করার এই বিষয়টা নতুন নয়। একটা সময় পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ফুটবলকে বড় বড় সাফল্য এনে দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। এখন দিচ্ছেন মেসি। সেই নির্ভরশীলতা এতটাই যে, এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা দলের কেউ গোল করতে পারেনি। তৃতীয় ম্যাচে গোল যদিও অন্যরা করতে পেরেছে, কিন্তু ব্যবধান বাড়াতে প্রয়োজন হয়েছে সেই মেসিকে। 

এই প্রয়োজনের রূপ এমনই যে, দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা ৭ ম্যাচে গোল করতে হয়েছে মেসিকেই। এর মধ্যে আবার বিশ্বকাপ জেতা ফাইনাল ম্যাচও আছে। আসলে বিশ্বকাপের মতো আসরে অভিষেকের পর থেকেই মেসির ওপর ভর করে আছে আর্জেন্টিনা ও সমর্থকেরা। সেভাবেই বিশ্বকাপ জয়ের খরা মিটেছে। এক মেসির ওপর ভর করাটা এতটাই যে, আর্জেন্টিনায় মেসির বিশাল বড় মূর্তিও তৈরি হচ্ছে। ‘এক নায়ক’ বা ‘একনায়ক’-দুই ক্ষেত্রেই এমনটা আমরা দেখি সচরাচর।

ফলে মেসির ওপর চাপও অনেক। কেমন? কতটা? একটা অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে মাত্রাটা বোঝানো যাক। সম্প্রতি রাস্তার পাশের এক দোকানে চা খাওয়া হচ্ছিল কাজের ফাঁকে। ওই রুটিরুজির ফাঁকে একটু মাথা ঠান্ডা করা আর কি। ঠিক সেই সময়টায় একজনের কন্ঠ প্রবেশ করল কর্ণকুহরে। তিনি ফোনের ওপাশে থাকা কাউকে নিজের অসহায় অবস্থা বোঝাতে বলছিলেন, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’। এই বলে তিনি থামেননি। বলতেই থাকেন, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’, ‘অনেক চাপে আছি, ভাই’… হ্যাঁ, এতবার বলেই থেমেছিলেন তিনি। বুঝুন তাহলে, চাপ কতটা হলে মানুষ এভাবে বলে!

ঠিক একই মাত্রার চাপ আছে মেসির ওপরও। চাপা স্বভাবের মানুষ, তাই উচ্চস্বরে হয়তো বলেন না আর কি! এত বছর ধরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সাফল্যের স্বাদ এনে দেওয়ার কাজ করে চলেছেন তিনি। নিজের ক্লান্তির কথাও উল্লেখ করেছেন বেশ কয়েকবার, অনেকটা ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’ ধাঁচে। বার কয়েক অবসর নেওয়ার কথাও বলেছেন। আবার খেলেছেনও। এমনটা বেশ কয়েকবার হওয়ায় এখন মেসির ‘না খেলার ঘোষণা’র ওপর থেকে ক্রীড়াপ্রেমীদের বিশ্বাসও উঠে গেছে অনেকটা। দেখা গেল, অবসরের ঘোষণা দিয়েই পরে আবার ভেঙে ফিরে আসতে হলো!

না ফিরে আর উপায়ই বা কি? যে দল বা দলের সমর্থকগোষ্ঠীর কাছে মেসি একাই নায়ক (সঙ্গত কারণেই অবশ্য), সেখানে এছাড়া গত্যন্তর থাকে না।    

তা, এমন অবস্থায় আর্জেন্টিনা আসলে কাদের ‘দোসর’ বলে মনে হয় আপনাদের? 

ভাবুন। মজা পেতে হলেও না হয় ভাবুন একটু। ভাবা প্র্যাকটিস তো করুন!

(লেখকের নিজস্ব ভাবনা।)

আরও পড়ুন

×