ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০২৬

মেধার লড়াইয়ে নির্বাচিত সেরা দশ

মেধার লড়াইয়ে নির্বাচিত সেরা দশ
×

দেশের ১০টি আঞ্চলিক জীববিজ্ঞান উৎসব থেকে নির্বাচিত বিজয়ী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয়েছে

 প্রত্যয় নিশান

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১২:২৪

জন্মান্ধ মানুষ কি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে? ডিম আগে না মুরগি আগে? মানব ক্লোনিং কেন নিষিদ্ধ? মানুষ দৌড়ালে শ্বাসপ্রশ্বাস বৃদ্ধি পায় কেন? খাদ্য গ্রহণে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অনুস্মরণ করায় শৈবালকে উদ্ভিদ বলা যাবে? বাদুড় বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করে কিন্তু নিজে আক্রান্ত হয় না কেন?

৮ মে শুক্রবার রাজধানীর আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০২৬-এর জাতীয় উৎসবের প্রশ্নোত্তর পর্বে এমন নানা মজার, সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নে জর্জরিত হন প্যানেলের শিক্ষকরা। চমকপ্রদ প্রশ্নের উত্তর দেন মঞ্চে উপবিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানীরা।

এ ছাড়া, ক্যান্সার চিকিৎসায় কার-টি সেল, জীববিজ্ঞানের আধুনিক চর্চায় বিপ্লব এনে দেওয়া ক্রিসপার ক্যাস নাইন প্রযুক্তি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। প্রশ্নের যাথাযথ উত্তরের পাশাপাশি বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করায় শিক্ষার্থীদের উপহার হিসেবে পায় বিজ্ঞানবিষয়ক বই। লিখিত ও এমসিকিউ পরীক্ষা, খুদেশিক্ষার্থীদের দারুণ সব প্রশ্ন- পাল্টা প্রশ্ন আর জীববিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের যুক্তিনির্ভর উত্তরে মুখর হয়ে ওঠে উৎসব।

এর আগে সূর্যের আলো প্রখর হতে না হতেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও আয়োজকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। সকাল ৮টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় ও আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শতাধিক শিক্ষার্থী এক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত জুনিয়র, নবম ও দশম শ্রেণি মিলে সেকেন্ডারি এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি এই তিন ক্যাটেগরিতে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গত এপ্রিলজুড়ে দেশের ১০টি আঞ্চলিক জীববিজ্ঞান উৎসব থেকে নির্বাচিত বিজয়ী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এ জাতীয় অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক এতে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের পাঠ্যক্রম অনুসারে কোষতত্ত্ব ও প্রাণরসায়ন, প্রাণী ও উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান ও শারীরতত্ত্ব, প্রাণী আচরণবিদ্যা, বাস্তুসংস্থান, জৈব অভিব্যক্তি ও বংশগতিবিদ্যা, বায়োসিস্টেমেটিক্স এবং বায়োইনফরমেটিক্স এই সাতটি বিষয়ে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।

দিনের কার্যক্রম শুরু হয় সংক্ষিপ্ত প্রশ্নভিত্তিক লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে। পরে বহুনির্বাচনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যাহ্নবিরতির পর শুরু হয় বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ পর্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক ও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী।

বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হয় সমাপনী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ছিলেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. হাসিনা খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আব্দুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর ড. রাখহরি সরকার। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রফেসর ড. মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ডু।

আয়োজকরা জানান, তরুণদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা, গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। উৎসবের জুনিয়র, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটেগরিতে মোট ১০০ জন শিক্ষার্থী চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ ও সেকেন্ড রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এ ছাড়া বরেণ্য বাঙালি জীববিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, একেএম নুরুল ইসলাম এবং এসএম হাসানুজ্জামানের নামে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা শিক্ষার্থী আরিজ আনাস (সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ), মো. সিনান সাইফি রহমান (সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল), আহনাফ দাইয়ান (ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল), মো. শাহরিন আল-মুহাইমিন (নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং শাফিনা কবির ইপ্সিতা (মুমিনুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ)-কে। অনুষ্ঠানের ট্রেনিং পার্টনার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, টেকনিক্যাল পার্টনার ল্যাব বাংলা এবং ম্যাগাজিন পার্টনার বিজ্ঞান চিন্তা ও কিশোর আলো।

বায়োক্যাম্পে বিজয়ীদের প্রশিক্ষণ

দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে সনদ ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। নির্বাচিত ২০ জন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৩ থেকে ১৬ মে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজিতে অনুষ্ঠিত বায়োক্যাম্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। ধারাবাহিক মূল্যায়নের শেষে গঠন করা হবে বাংলাদেশ জাতীয় জীববিজ্ঞান দল। মাস্টার ক্যাম্পার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ১০ জন। তারা হলেন– নাশওয়ান হক মাহির, সাবিল ইসলাম, দিবস তালুকদার, মোহাম্মদ সাইফান হায়দার, নওশীন শাকিরীন, ইসরাত জেরিন ফারিয়া, রক্তিম চক্রবর্তী, মো. ইয়াসিন, আবু মাহজুরাহ আয়মান, আহনাফ দাইয়ান। তাদের সঙ্গে যোগ দেন আগে পদকজয়ী ফারাবীদ বিন ফয়সাল। এই ১১ জন ৫ ঘণ্টাব্যাপী ব্যবহারিক ও তত্ত্বীয় জীববিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবেন চারজন প্রতিযোগী। যারা লিথুয়ানিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করবে।

আরও পড়ুন

×