ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

ভোরের ছিনতাইয়ে 'ভাই-ব্রাদার গ্রুপ'

ভোরের ছিনতাইয়ে 'ভাই-ব্রাদার গ্রুপ'
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৯ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৪

রাজধানীর উত্তরায় রিকশায় চড়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন এক শিক্ষিকা। মোটরসাইকেল আরোহী দুই ব্যক্তি সেই রিকশাটি থামিয়ে মাত্র ৩৪ সেকেন্ডে কেড়ে নেয় তার ব্যাগ ও গলার চেইন। পুরো দৃশ্য ধরা পড়ে আশপাশের বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায়। তা ছড়িয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।

অভিজাত এলাকায় ফিল্মি স্টাইলের এমন ছিনতাইয়ের পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, শুরু হয় সমালোচনাও। চক্রটিকে চিহ্নিত করতে আদাজল খেয়েই মাঠে নামে পুলিশ। শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ওই চক্রের তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, গত ১৮ জানুয়ারি সকাল পৌনে ৮টার দিকে উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সেকশনে স্কুলশিক্ষিকা ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়ে যায়। ডিবি-উত্তর বিভাগ ছায়াতদন্তে নেমে গত রোববার তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে শিক্ষিকার ছিনিয়ে নেওয়া ভ্যানিটিব্যাগ, ছিনতাই কাজে ব্যবহূত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার তিন জন হলো সারজুল ওরফে বাদশা, পারভেজ ও আল আমিন। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, ছিনতাইয়ের নেপথ্য কাহিনি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, 'গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে পারভেজ ও আল আমিন আপন ভাই। ওই দুইজনের অপর ভাই মহসিন ছিনতাই মামলায় সিলেট কারাগারে রয়েছে। সারজুল ওরফে বাদশা এক সময়ে বিশেষ আনসার সদস্য ছিল। কয়েক বছর আগে চাকরিচ্যুতির পর ছিনতাই কাজে নামে।'

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে গত তিন মাসে ঢাকাতে অন্তত ১০টি ছিনতাইয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা ভোরে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ছিনতাই করে। এরমধ্যে পারভেজ অ্যাপসভিত্তিক মোটরইকেল চালানোর নাম করে ভোরে বের হয়। যাত্রী হিসেবে কখনও সারজুল, আবার কখন আল আমিন মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ছিনতাই করে থাকে।

ছিনতাইয়ে ভাই-ব্রাদার গ্রুপ : ডিবি সূত্র জানায়, তিন ভাই মহসিন, পারভেজ ও আল আমিনের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। বড় ভাই মহসিন সিলেটে থাকে। কলার ব্যবসার পাশাপাশি ছিনতাইয়ে হাত পাকায়। ২০১৩ সালে একবার ধরা পড়ে সিলেটের বিশ্বনাথ থানায়। সেখানেই পরিচয় হয় বিশেষ আনসার সদস্য সারজুলের সঙ্গে। ছিনতাই করে ধরা পড়ার পর দুইজনের সখ্য গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অপর দুই ভাই পারভেজ ও আল আমিনও জড়িয়ে যায় ছিনতাই কাজে। এরপর এই তিন ভাই ঢাকা ছাড়াও সিলেট, চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই কাজ করে আসছে।

পারভেজ জানিয়েছে, তার বাসা রামপুরা এলাকায়। সে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন ভোরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়। শ্যামলী থেকে সারজুল ওরফে বাদশা ভাইকে মোটরসাইকেলে তোলে। এরপর দুইজনে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ঘুরতে থাকে। টার্গেট পেলে ছিনতাই করে। মাঝেমধ্যে তার ভাই আল আমিনও মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়। আবার ডাক পড়লে সিলেটে বড় ভাইয়ের কাছে চলে যায়। তারা মোটরসাইকেল চালালে মূলত সারজুল ওরফে বাদশা ভাই ছিনতাই করে থাকে। এতে মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে তা সমান ভাগ করে নেয় তারা।

ওই চক্রটিকে গ্রেপ্তার অভিযানে থাকা ডিবি-উত্তর বিভাগের এডিসি বদরুজ্জামান জিল্লু সমকালকে বলেন, ''তিন ভাই মিলে ছিনতাইয়ের জন্য রীতিমতো গ্রুপ গঠন করে ফেলেছে। অপরাধ জগতে এই গ্রুপটি 'ভাই-ব্রাদার' গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত। তবে এই চক্রের গুরু সারজুল ওরফে বাদশা। তারা সাধারণত খুব ভোরে এবং মধ্যরাতে ফাঁকা সড়কে ছিনতাই করে থাকে। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে রিকশাযাত্রীর ব্যাগ টান দেয়। কখনও অস্ত্র ঠেকিয়ে সব কেড়ে নেয়। পাশাপাশি তারা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ইয়াবার ব্যবসাও করে থাকে। গ্রেপ্তারের সময়ে তাদের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ইয়াবা ও ছিনতাই কাজে ব্যবহূত দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।'

আনসার সদস্য সারজুল যেভাবে ছিনতাইয়ের 'বাদশা' হয়ে ওঠে :গ্রেপ্তারের পর সারজুল জানিয়েছে, তার বাড়ি ঝিনাইদহে। এক সময় চরমপন্থি শ্রমজীবী পার্টি করত। ২০০০ সালের দিকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় আত্মসমর্পণ করে। এরপর সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিশেষ আনসার সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় দায়িত্ব পালনের সময়ে ছিনতাই মামলার আসামি মহসিনের সঙ্গে পরিচয় হয়। ২০১৩ সালের দিকে অবৈধভাবে মদ পাচারের সময়ে বাদশা ধরা পড়ে। এরপর তাকে ক্লোজ করে সিলেট পুলিশ লাইনে রাখা হয়। এক পর্যায়ে চাকরি চলে গেলে ফের ছিনতাইকারী মহসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। দুইজনে মিলে ছিনতাইয়ে নামে। শেষ পর্যন্ত নিজে গ্রামের বাড়ি চলে যায়। এরপর আবার ঢাকায় এসে নিজের নাম পাল্টে বাদশা রাখে। নিরাপত্তাকর্মীর কাজ নেয়। রাতভর দায়িত্ব পালন শেষে ভোরে বাসায় ফেরার আগে পারভেজ বা আল আমিনকে নিয়ে ছিনতাই কাজে নামে।

সারজুল ওরফে বাদশা জানায়, ধীরে ধীরে তার নাম বাদশা হয়ে যায়। মহসিন, আল আমিন ও পারভেজ তাকে বাদশা ভাই বলে ডাকে।

ডিবি পুলিশের এডিসি বদরুজ্জামান জিল্লু সমকালকে বলেন, সারজুল ওরফে বাদশা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় কৌশলী এবং অনেক সাহসী। সে দুঃসাহসিকভাবে ছিনতাই করে আসছিল। এই চক্রটি গত তিন মাসে উত্তরার ঘটনা ছাড়াও ঢাকাতেই অন্তত ১০টি ছিনতাই করেছে। তাদের সবার বিরুদ্ধে ঢাকাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ডিবি সূত্র জানায়, এর মধ্যে ১৭ জানুয়ারি মিরপুরের শিয়ালবাড়ী মোড়ে এক নারীর কাছ থেকে চেইন ছিনিয়ে নেয়। ১৪ জানুয়ারি ধানমন্ডি সিটি কলেজের অদূরে, ১ জানুয়ারি নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের রাস্তায়, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ষাটফিট সড়কে, একই দিন শ্যামলীতে ছিনতাই করে। এ ছাড়া গত নভেম্বরে শিয়ালবাড়ী মোড়, সেপ্টেম্বরে ভূতের গলি ও মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় লালমাটিয়া এলাকায় ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেছে।

উত্তরায় ৩৪ সেকেন্ডের সেই ছিনতাই : সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়ক। সময় ১৮ জানুয়ারি সকাল ৭টা ৫৭ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। রিকশায় করে যাচ্ছেন স্কুলশিক্ষিকা। পেছন থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল রিকশার গতিরোধ করে। পালসার ব্র্যান্ডের ওই মোটরসাইকেলে দুইজন আরোহী। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনে থাকা আরোহী ছুটে আসে রিকশায় বসে থাকা শিক্ষিকার দিকে। ছুরি ঠেকিয়ে 'ছোঁ' মেরে কেড়ে নেয় তার কাছে থাকা ভ্যানিটিব্যাগ। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন রিকশাচালক।

প্রথম দফায় ভ্যানিটিব্যাগ নিয়ে মোটরসাইকেলটি একটু এগিয়ে যায়। রিকশার দিকে ফিরে এসে আবারও ছুরি ঠেকিয়ে শিক্ষিকার গলা থেকে স্বর্ণের চেইন ও হাতের চুরি নিয়ে যায়। ফুটেজে দেখা যায়, ৭টা ৫৮ মিনিট ২২ সেকেন্ডে অর্থাৎ মাত্র ৩৪ সেকেন্ডে শেষ হয় সেই ছিনতাই অপারেশন।

ডিবি কর্মকর্তারা বলেছেন, চাঞ্চল্যকর এই ছিনতাইয়ের সময় মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল গ্রেপ্তার হওয়া পারভেজ এবং পেছনে বসে ছিনতাই অপারেশন চালায় সারজুল ওরফে বাদশা ভাই।

আরও পড়ুন

×