ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

মশা বেড়েছে ঢাকায়, উদ্বেগ ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া নিয়ে

মশা বেড়েছে ঢাকায়, উদ্বেগ ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া নিয়ে
×

অমিতোষ পাল ও রাজবংশী রায়

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:১৪ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:২৯

এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু জ্বর গত বছর দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। প্রথমে রাজধানীতে এর প্রকোপ দেখা দিলেও ধাপে ধাপে বেড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত হয় কয়েক লাখ মানুষ। ডেঙ্গুতে অন্তত ৩০০ জনের মৃত্যু হয়। এর আগের বছর রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল চিকুনগুনিয়া। মূলত বর্ষা মৌসুমে এই দুটি রোগ ছড়ায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বছরজুড়েই ডেঙ্গু রোগের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। শীত মৌসুমেও মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন- এমন খবর মিলেছে। মার্চ থেকে মূলত এ রোগের প্রকোপ শুরু হয়। জুন-জুলাই-আগস্টে বিস্তার লাভ করে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সামনে ভর মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি কী আকার ধারণ করে তা নিয়ে নগরবাসী উদ্বিগ্ন। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের বছরগুলোয় শীতের সময় মশার দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু এবার শীত মৌসুমেও মশার দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া দুটি রোগ নিয়েই উদ্বেগ বিরাজ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১২ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০ শতাংশ এলাকায় এডিস লার্ভার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতির মাত্রার চিত্রও উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত মুগদা এলাকা, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মায়াকানন এলাকা, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের শাজাহানপুর এলাকা ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগান এলাকা এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাফরুল এলাকা, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম আগারগাঁও এলাকা ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নূরজাহান রোড এলাকায় ২০ পয়েন্টের বেশি এডিসের লার্ভার ঘনত্ব সূচক বা ব্রুটো ইনডেক্স মিলেছে। দক্ষিণের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলাবাজার এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ৭০ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীবাজার এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ৫০ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে উত্তরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের তোলারবাগ এলাকায় এই সূচক ৩০  পয়েন্ট। মশার লার্ভার  উপস্থিতির হিসাব করা হয় এই ব্রুটো ইনডেক্সের মাধ্যমে। প্রতি একশ' প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০ বা তার বেশিতে যদি এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি বলা হয় বলে জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অথচ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলছে, মশা নিয়ন্ত্রণে আছে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। সিটি করপোরেশন নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কাজ করছে। পাশাপাশি মশক নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে। ক্র্যাশ প্রোগ্রামে অত্যাধুনিক নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে। ওষুধেরও কোনো ঘাটতি নেই। কাজেই মশা এবার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

তবে জানা গেছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৪ দিনব্যাপী বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম উদ্বোধন করে ডিএনসিসি। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেশে প্রথমবারের মতো জার্মানি থেকে আমদানি করা ভেহিকল মাউন্টেড ফগার মেশিন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মেশিন চালু করতেই ভেহিকল মাউন্টেড ফগার মেশিনের ব্যারেলের মুখ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে আগুনের স্ম্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকে। অনেক সময় চেষ্টা করে একটি মাত্র মেশিন চালু করতে সক্ষম হন ডিএনসিসির মশক নিধন কর্মীরা। আরেকটি মেশিন চালুই করতে পারেনি। এ অবস্থার মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা ওই মেশিন দিয়েই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম উদ্বোধন করেন।

জানা যায়, মশক নিধনের জন্য জার্মানির সুইং ফগ কোম্পানির কাছ থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক ভেহিকল মাউন্টেড ফগার মেশিন প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে বরাদ্দ দিয়েছে ডিএনসিসি। কিন্তু ওই মেশিন চালানোর মতো কোনো প্রশিক্ষণ মশক নিধন কর্মীদের দেওয়া হয়নি। ফলে মেশিনগুলো কাজে আসছে না।

অবশ্য ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, মেশিনগুলো প্রথমে চালু হতে কখনও কখনও সময় নেয়। সমস্যা হলে কোম্পানি সেগুলো মেরামত করে দেবে অথবা ফেরত নেবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ না দেওয়ার কথাও ঠিক নয়। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন কর্মীকে এ মেশিন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যারেলের মুখ দিয়ে বের হওয়া আগুনের স্ম্ফুলিঙ্গগুলো বিপজ্জনক নয়। ওই মেশিনই এ রকম।

এদিকে গত বছর ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সিঙ্গাপুর সফর করে। তারা মশার বন্ধ্যত্বকরণের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি আমদানির উদ্যোগ নেন। সেটাও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ডিএনসিসির তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামও কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেন। পাশাপাশি কলকাতার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যিনি কাজ করেছেন, সেই বিশেষজ্ঞ অনিক ঘোষের সঙ্গেও কথা বলেন। দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কলকাতার একটি বিশেষজ্ঞ দলকেও ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু এরপর আর কোনো কার্যক্রম নেই। এমনকি সচেতনতামূলক যেসব কার্যক্রম চলার কথা, সেগুলোও দেখা যাচ্ছে না। নালা, পুকুর, ডোবা, জলাশয় পরিস্কার করার কার্যক্রমও চোখে পড়ছে না। এ ছাড়া শুস্ক মৌসুম শুরু হওয়ায় খালগুলোতে পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। ফলে বদ্ধ জলাশয়গুলো মশার উৎকৃষ্ট প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় মশার দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এ ছাড়া ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ আগামী ১৬ মে শেষ হবে। এরপর দায়িত্ব নেবেন নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। ডিএনসিসির নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলামও দায়িত্ব পাবেন ১৬ মে। ডিএনসিসি চলছে ভারপ্রাপ্ত মেয়র দিয়ে। কাজেই নতুন দুই মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ও আতিকুল ইসলাম যখন দায়িত্ব পাবেন, তখন থাকবে মশার ভরা মৌসুম। এখনই যদি দুই সিটি করপোরেশন মশকনিধনে উদাসীনতার পরিচয় দেয়, তাহলে মে মাসের শেষ দিকে মশার দৌরাত্ম্য চরমে উঠতে পারে। কাজেই দুই মেয়রের দায়িত্বই শুরু হতে পারে মশার সঙ্গে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

অবশ্য ঢাকা উত্তর সিটির ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা বলেন, মশকনিধনে ইতোমধ্যে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। মশকনিধনের জন্য সম্প্রতি অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওষুধেরও মজুদ আছে। পাশাপাশি আরও ওষুধ কেনার প্রস্তুতি চলছে। কাজেই মশার দৌরাত্ম্য এবার বাড়ার আশঙ্কা নেই।

তবে নগরবাসী মনে করে, মশকনিধনের কোনো কার্যক্রম তারা দেখছেন না। ৫২১ পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সৈয়দ লিয়াকত হোসেন বলেন, এতদিন শুনেছেন মশা ছয়তলার ওপরে উঠতে পারে না। এবার আটতলাতেও মশার যন্ত্রণায় থাকতে পারছেন না। মশার আকৃতিও বেশ বড়। সন্ধ্যা হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ে। মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মশা তাড়ানোর তরল ওষুধযুক্ত মেশিন সব সময় জ্বালিয়ে রাখছেন। তার পরও আশানুরূপ ফল মিলছে না।

মগবাজারের ৬৩৮ পেয়ারাবাগের গৃহবধূ নিশাত সাবেরা বলেন, পাঁচতলার ওপরে থেকেও মশার যন্ত্রণার কমতি দেখছি না। বিশেষ করে স্কুলপড়ূয়া মেয়েকে নিয়ে খুব ভয়ে আছি। মগবাজারের ৩৭৩ দিলু রোডের বাসিন্দা তালেয়া বেগম জানান, ক'দিন আগেও তার বাসার পাশের একজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ জন্য তারাও ভয়ে আছেন। প্রতিদিন বিকেল হতেই কয়েল জ্বালিয়ে রাখছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, তারা নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কাজেই মশার দৌরাত্ম্য আছে বলা যাবে না। ওষুধের কোনো ঘাটতি নেই। তারা মশকনিধন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) উপদেষ্টা ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান সমকালকে বলেন, মশার ঘনত্বসূচক ২০ মাত্রার ওপরে গেলে তা অত্যন্ত ঝূঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। সে হিসাবে বলা যায়, এবার পরিস্থিতি হয়তো আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তবে গত বছর ডেঙ্গু টাইপ পরিবর্তন করে সেরোটাইপ-৩ হওয়ার কারণে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। এবারও যদি একই টাইপ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি ততটা গুরুতর আকার ধারণ করবে না। কিন্তু টাইপ পরিবর্তন করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বলেন, গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্নিষ্টদের দ্রুত কর্মসূচি প্রণয়ন করা উচিত। এখনই মশার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বাসাবাড়িতে শীতের মৌসুমেও মশার দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু মশকনিধন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। এদিকে লক্ষ্য রেখে এগোতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০১৮ সালে বর্ষ-পরবর্তী কোনো জরিপ হয়নি। তবে সব ইনডেক্সেই ২০১৭ সালের তুলনায় এবার মশার উপস্থিতি কম। মশার উপস্থিতি ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা আগের বছরের তুলনায় কম পাওয়া গেছে। তাছাড়া এবার অনেক বেশি সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হয়েছে। এ জরিপ মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবে।

আরও পড়ুন

×