ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

রূপনগর বস্তিতে আগুন

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
×

আগুনে পুড়ে ছাই বসতভিটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই পোড়া থালা-বাসন কুড়িয়ে নিচ্ছে এক কিশোর। ছবিটি বৃহস্পতিবার রূপনগর বস্তি থেকে তোলা - সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০ | ১৩:৫৭

চোখের সামনেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে বসতঘর-যৎসামান্য সম্বল। রাতে কারও ঠাঁই হয়েছে স্থানীয় স্কুলের বারান্দায়, কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পরিচিত কারও বাসায়। একবেলা খাবার জুটেছে তো আরেক বেলা কেটেছে অনাহারে। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কী করবেন, কোথায় যাবেন, কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছেন না। এর মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূৃপে পরিণত হওয়া রূপনগর বস্তিতে পোড়া টিন-কাঠ সরিয়ে কিছু খুঁজছেন অনেকে। কথা বলে জানা গেল, সর্বনাশা আগুন থেকে তেমন কিছু রক্ষা করতে পারেননি বেশিরভাগ বাসিন্দা। তাই তারা এখন খুঁজে দেখছেন, যদি আগুনের গ্রাস থেকে কোনো জিনিসপত্র রেহাই পেয়ে থাকে! নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সেটুকুই হবে সম্বল। এখানে হোক বা অন্য কোনো বস্তিতে, মাথা গোঁজার ব্যবস্থা তো করতেই হবে। কেউ তাই ছুটেছেন কাজের সন্ধানে। কেউ আবার স্বজন-পরিচিতের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে এ ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছেন।
এদিকে, সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা বিশাল এই বস্তিতে ছিল পাঁচ হাজারের বেশি ঘর। এগুলোর মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা। ক্ষমতার দাপট অনুযায়ী বস্তিতে কারও ২০-২৫টি ঘর ছিল, আবার কারও ছিল ৩০০টি। এ রকম ঘর মালিকের সংখ্যা পঞ্চাশজনের বেশি। কোনোরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই বাঁশ-কাঠের কাঁচা ঘরগুলোয় তারা দিয়েছিলেন গ্যাস ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ। ঘরভাড়া ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ বাবদ প্রতি মাসে আদায় করা হতো কোটি টাকার বেশি। নিম্ন আয়ের মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বছরের পর বছর ব্যবসা করে আসছিলেন প্রভাবশালীরা।
বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সহস্রাধিক ঘর পুড়ে যায়। সব হারিয়ে নিঃস্ব হন হাজার হাজার মানুষ। তাদের অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বস্তি উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
রূপনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক কুমার দাস সমকালকে বলেন, 'অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বা অন্য কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। তবে বুধবার সকালে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে উত্তেজিত জনতা তাদের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।'
আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বস্তিতে পাঁচ হাজারের বেশি ঘর রয়েছে। এসব ঘরের প্রতিটির ভাড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা। প্রায় অর্ধেক ঘরে ছিল গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। এর জন্য দিতে হতো গড়ে ৬০০ টাকা। প্রতি ঘরের জন্য পানির বিল হিসেবে ২০০ এবং বিদ্যুতের বিল হিসেবে ৩০০ টাকা করে দিতে হতো। এ হিসাবে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিত বস্তির দখলদাররা।
বস্তির শিয়ালবাড়ি অংশের বাসিন্দা সালেহ আহমেদ চৌধুরী জানান, দুই-তিন মাস আগে বস্তি তুলে দেওয়ার জন্য ঘর মালিকদের কাছে একটি নোটিশ আসে। সেটা শোনার পর তারা মালিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এখন কী হবে? মালিকরা তাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, কিছুই হবে না। কিন্তু এখন তাদের সন্দেহ, উচ্ছেদের উদ্দেশ্যেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বস্তির সব ঘরের মালিক ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী বা তাদের অনুসারীরা বলেও জানান তিনি।
আরেক বাসিন্দা রংমিস্ত্রি কামাল হোসেন জানান, স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে বুধবার রাতে এলাকার এক ব্যক্তির গুদামঘরে ছিলেন। সব পুড়ে ছাই হওয়ায় খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভিন্নজনের উদ্যোগে যেটুকু খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তা পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। তাই সকালে উঠে তিনি কাজের সন্ধানে বেরিয়েছেন, যেন রাতে পরিবারের সবার খাবার ব্যবস্থা করতে পারেন।
পুড়ে যাওয়া ঘরের অংশেই ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে রান্না করছিলেন গৃহবধূ আসমা বেগম। তিনি জানালেন, স্বামী-সন্তানসহ এখানেই থাকতেন। বুধবারের আগুনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার মতো অনেকেই এখন নিঃস্ব। খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই তিনি রান্না চড়িয়েছেন।
রূপনগর বস্তিতে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে গতকাল থেকেই কাজ শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। এই কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।



আরও পড়ুন

×