ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

'প্যাটের জন্নি রাস্তায় নামছি'

'প্যাটের জন্নি রাস্তায় নামছি'
×

করোনাভাইরাসের জেরে ঘরবন্দী রাজধানীবাসী, এ কারণে বিপাকে পড়েছেন রিকশাচালকরা- সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২০ | ১০:২৫

রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার শামীম সরণির মোড়। রাস্তাজুড়ে সারিবদ্ধ রিকশা। দূর থেকে কেউ আসতে দেখলে তার কাছে যাচ্ছেন তারা। দামাদামি নয়; যেখানে যেতে চান, সেখানেই নিয়ে যাচ্ছেন রিকশাচালকরা। বিনিময়ে যাত্রী যা দেন, তা-ই নিচ্ছেন।

মঙ্গলবার বিকেলে ৫২ বছর বয়সী রিকশাওয়ালা অলির কাছে জানতে চাইলাম- সবকিছুই তো বন্ধ, তারপরও কেন বের হয়েছেন? ক্ষোভের সঙ্গে অলি বললেন, 'জানেন না কেন বের অইছি- প্যাটের জন্নি। আপনাগে তো চাকরি আছে। আমাগো কী আছে। পোলা-মাইয়াগো বাঁচাইতে অইবো। এমনি তো দেবেন না। রাইত পোয়াইলেই ২/৩ কেজি চাল লাগে। হেডি কে দিবো?'

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে ঘরে থাকার নির্দেশনা আসার পর পাঁচ দিন বের হননি অলি। ক'দিন সংসার কোনোরকম চললেও বাধ্য হয়ে মঙ্গলবার থেকে রিকশা নিয়ে বের হন। কারণ, স্ত্রী-সন্তানরা অভুক্ত।

অলির মতো ঢাকা শহরে লাখ লাখ রিকশাচালক রয়েছেন, যাদের দিন এনে দিন খেতে হয়। তাদের একদিন উপার্জন বন্ধ থাকলে পুরো পরিবারকে উপোস থাকতে হয়। এই দুর্যোগের সময়ও তাদের দেখার কেউ নেই। উপায়ন্তর না দেখে সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার সন্ধানে তারা আবার রাস্তায় নেমেছেন। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে সব গণপরিবহন বন্ধ থাকায় রাজধানী ঢাকা ফাঁকা হয়ে পড়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে খাদ্যের সংকট।

কয়েকজন রিকশাচালক জানান, আগে তাদের দৈনিক আয় ৭০০/৮০০ টাকা ছিল। সড়কে যাত্রী না থাকায় এখন আয় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ১২০ টাকা আয় হয়েছে বলে জানান অপর রিকশাচালক বরিশালের আবদুল হালিম।

মাদারীপুরের মোহাম্মদ আলী পশ্চিম কাফরুলে থাকেন। তিনি বলেন, আর কয়দিন বাসায় থাকব। স্ত্রী-সন্তানরা তো না খেয়ে আছে। তাই বাধ্য হয়ে বের হয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো সাহায্য পাচ্ছি না। যারা পায়, তারা কমিশনারের লোক।

বরগুনার সোলায়মান নামের আরেক রিকশাচালক জানান, পীরেরবাগ এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন। কয়েক দিন ঘরেই ছিলেন, কেউ সাহায্য দেয়নি। গতকাল থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তিনি। পুলিশও এখন আর নিষেধ করে না। কারণ তারা বুঝছে, রিকশা না চালালে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

গত ১৩ বছর ধরে মিরপুর এলাকায় রিকশা চালান সাহেব আলী। থাকেন আগারগাঁও বিএনপি বস্তিতে। প্রায় ৬০ বছর বয়সী এই রিকশাচালক সহজে হাত পাতেন না কারও কাছে। কয়েক দিন আগে পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় হঠাৎ পড়ে যান। বাঁ পায়ে ব্যথার কারণে কিছুদিন গাড়ি চালাতে পারেননি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে অনেক ভাসমান শ্রমিক দিন আনে দিন খায়। এদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে রিকশা শ্রমিকের সংখ্যা শুধু ঢাকা শহরেই কয়েক লাখ। জাতীয় কোনো দুর্যোগ বা মহামারি দেখা দিলেই তাদের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ ছুটিতে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার নিম্ন আয়ের মানুষ। যারা রাজধানীর বস্তিতে থাকেন এবং প্রতিদিনের রোজগারে সংসার চালান, তাদের কষ্টের সীমা নেই। তারা না পারছেন কাজ করতে, না পারছেন খাদ্য সংগ্রহ করতে। রাজধানীর অলিগলিতে দেখা যায়, রিকশাচালকরা অলস সময় পার করছেন, যাত্রী না পেয়ে রিকশায় বসেও ঘুমাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

×