অ্যাম্বুলেন্স চালকের জবান
করোনায় মৃতকে কাফনের কাপড়ও পরিয়ে দিতে হয় তাদের
ফাইল ছবি
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ০৫:৫৩ | আপডেট: ০৩ মে ২০২০ | ০৫:৫৭
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের আনা-নেওয়া, মৃত ব্যক্তির লাশ পরিবহন ও দাফনের কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আল মারকাজুল ইসলামীর স্বেচ্ছাসেবকরা। রাজধানীতে করোনায় মৃতদের দাফন করা হচ্ছে খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে। স্বেচ্ছাসেবকরা লাশ অ্যাম্বুলেন্সে পরিবহন করে তালতলা কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করছেন। তাদেরই একজন আল মারকাজুল ইসলামীর অ্যাম্বুলেন্স চালক শরিফুল ইসলাম। তিনি জানালেন, কেবল লাশ পরিবহন নয়, দাফনের কাজও করছেন। তার মতো আরও ১৬ জন অ্যাম্বুলেন্স চালক এই দায়িত্ব পালন করছেন।
শরিফুল সমকালকে বলেন, কেবল করোনা রোগী বা মৃতদেহ পরিবহন নয়, কখনও কখনও কাফনের কাপড়ও পরিয়ে দিতে হয় তাকে। স্বেচ্ছাসেবকরা সবাই পিপিই, মাস্ক, গামবুট, গ্লাভস পরে কাজ করেন। দাফনের পর গামবুট ছাড়া বাকি সব প্রতিরোধক পুড়িয়ে ফেলেন।
তিনি বলেন, করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়ারও লোক পাওয়া যায় না। দাফনের সময় তারা যে দু'চারজন থাকেন, তারাই জানাজা পড়েন। যারা এসব কাজ করছেন, তাদের মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে আল মারকাজুলের অফিসে আলাদা একটা ফ্লোরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চার সন্তানের জনক শরিফুল বলেন, তার এই কাজে স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজনের কোনো আপত্তি নেই। কারণ এ কাজ না করলে আমরা গুনাহগার হয়ে যাব।
আল মারকাজুল ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামজা শহীদুল ইসলাম জানান, তাদের বড় আর্থিক ফান্ড নেই। তবুও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন। অর্থ থাকলে এ কাজের পাশাপাশি গরিব মানুষকে ত্রাণ দিতে পারতেন। তিনি জানান, আল মারকাজুল ইসলামী সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। ৩২ বছর ধরে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর রোকেয়া সরণির তালতলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুস শহিদ প্রায় ১০ বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালান। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকেন। কখনও অসুস্থ রোগীকে নিয়ে, কখনও মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে। তিনি বলেন, অসুস্থ ব্যক্তি বা লাশ সবই মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর পড়েছেন মহাসংকটে। একদিকে হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগী কমে গেছে, অন্যদিকে যে বাসায় ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়িওয়ালা এবং প্রতিবেশীরাও তাকে নিয়ে কানাঘুষা করেন।
শহিদ আরও বলেন, আগে দিন শেষে অ্যাম্বুলেন্স মালিককে দিয়েও দেড়-দুই হাজার টাকা থাকত। এখন কোনোদিন ট্রিপ পাওয়া যায় তো কোনোদিন যায় না।
গত কয়েকদিনে কথা হয় ছয়জন অ্যাম্বুলেন্স চালকের সঙ্গে। তারা বলেন, রোগীদের এখন আনা-নেওয়া করতে ভয় হয়। এ ছাড়া মালিকদের পক্ষ থেকে চালকদের কোনো সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। নিজেরা কোনো রকমে একটি মাস্ক ও গ্লাভস কিনে ব্যবহার করছেন। আর চেষ্টা করছেন মৃত ব্যক্তির দেহ বহন না করার। কোনো রোগী বহন করার আগে রোগের ধরন সম্পর্কে জেনে নিচ্ছেন।
জানা গেছে, রাজধানীতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার অ্যাম্বুলেন্স চালক রয়েছেন। করোনার এই সময়ে অনেক চালক রোগী বহন করা বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা চালাচ্ছেন তারাও রোগী সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ভাড়া ঠিক করছেন। তবে কিছু অসাধু চালক অ্যাম্বুলেন্সে সাধারণ যাত্রী পরিবহন করছেন।
পশ্চিম পান্থপথের বীরউত্তম কাজী নুরুজ্জামান রোডের আলিফ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী মোমেন আলী বলেন, বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের চাহিদা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারণ আগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সব সময় রোগীর ভিড় থাকত। এখন সেসব হাসপাতাল নিয়ম রক্ষার কারণে খোলা রাখা হয়েছে। কিন্তু রোগী রাখা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আগে যে কেউ অ্যাম্বুলেন্স চাইলেই পাঠিয়ে দিতেন। এখন রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আগে জেনে নেন। যদি দেখেন জ্বর-কাশি-মাথাব্যথা আছে, তখন না করে দেন। আল মারকাজুল ইসলামীর ফোন নম্বর দিয়ে দেন।