সাহেদের প্রতারণার 'গোয়েন্দা' কৌশল
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১৫:৩৭
মো. সাহেদের প্রতারণার কিছু ঘটনা সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়। কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিকে টার্গেট করে তার 'ভুল ও দুর্বলতা' খুঁজে বের করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যেতেন তিনি। এজন্য তার একটি বাহিনীও ছিল। সেখানে একাধিক নারী কাজ করতেন।
গতকাল সাহেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তবে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তিনি ভারতে পালিয়ে যেতে পারেন, এমন সন্দেহে মৌলভীবাজার পুলিশ রাত থেকে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
কোনো ব্যক্তির দুর্বলতা জানার পর সাহেদ নানা কৌশলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। এরপর নিজের পরিচিতি ও ক্ষমতার 'কৃত্রিম' আবহ তুলে ধরতেন তার কাছে। এক পর্যায়ে টার্গেট করা ওই ব্যক্তিকে জানাতেন আজ একটি গোয়েন্দা সংস্থার অফিসে গিয়েছিলেন। দেখে এলেন তার (টার্গেট করা ব্যক্তির) বিরুদ্ধে একটি চিঠির খসড়া তৈরি হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে চিঠি হয়তো পাবেন তিনি।
এটা শোনার পর স্বাভাবিকভাবে অনেকে ভয় পেয়ে যেতেন। তখন সাহেদ আবার বলতেন, 'ভয় পাচ্ছেন কেন। কোনো সমস্যা নেই। আমার সঙ্গে ওই গোয়েন্দা কার্যালয়ের প্রধানের সুসম্পর্ক রয়েছে। এটা যাতে বেশি দূর না গড়ায় সেটা আমি দেখব।' তবে এরপরই টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে গোয়েন্দা সংস্থার ভুয়া চিঠি পৌঁছে দেওয়া হতো। তখন ওই ব্যক্তি ধারণা করতেন, তিনি কোনো বিপদে সত্যি সত্যি পড়তে যাচ্ছেন। বিপদ থেকে বাঁচার জন্য ওই ব্যক্তি আবার সাহেদের দ্বারস্থ হতেন।
প্রতারিত ব্যক্তির বিশ্বাস জন্মাত, সাহেদের বিশেষ ক্ষমতা আছে বলেই আগেভাগেই চিঠির বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ওই গোয়েন্দা অফিসের হর্তাকর্তাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই সাহেদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এরপর সাহেদকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনকে ম্যানেজ করার অনুরোধ করা হলে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা চেয়ে বসতেন। বিভিন্ন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সংস্থার ভুয়া প্যাড তৈরি করে এভাবেই দিনের পর দিন বহু মানুষকে চিঠি পাঠিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন সাহেদ।
সাহেদের প্রতিষ্ঠানের একাধিক সাবেক কর্মী জানান, রিজেন্টের অফিসে বসেই গোয়েন্দা সংস্থার নামে এসব ভুয়া চিঠি সাহেদের হয়ে তৈরি করতেন শিমুল ও তরিক। এরই মধ্যে তরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাহেদের প্রতারণার আরেকটি কৌশল ছিল নিজের মোবাইলে মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের নামে ভুয়া নম্বর সেভ করে রাখা। সাহেদের আপন খালু বাবলু এ কাজে তাকে দীর্ঘদিন সহায়তা করেছেন।
বাবুলের একাধিক মোবাইল নম্বর সাহেদের মোবাইলে বিভিন্ন নামে সেভ করা থাকত। বাবলুর কোনো নম্বর হয়তো কোনো মন্ত্রীর নামে সেভ করা থাকত। আবার আরেকটি নম্বর হয়তো সেভ করা হতো প্রশাসনের কোনো প্রভাবশালী লোকের নামে। এরপর তিনি প্রতারণার জন্য এসব নম্বরে কথা বলে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন।
যেমন কোনো ব্যক্তি হয়তো সাহেদের কাছে একটি সমস্যায় পড়ে উদ্ধার করার অনুরোধ জানাতে এলেন। যে দপ্তরে সমস্যা সেখানে বলে দেওয়ার অনুরোধ করলেন ওই ব্যক্তি। তখন সাহেদের কৌশল ছিল নিজের মোবাইল সেট নিয়ে খালুর নম্বরে ফোন করেন। তবে সেবাপ্রত্যাশী ব্যক্তিকে বলতেন, তার সমস্যা সমাধানের জন্য মন্ত্রী-সচিবকে ফোন করা হচ্ছে। লাউড স্পিকারে তা শোনাতেন তিনি। ওই ব্যক্তি দেখতেন সত্যি সত্যি সাহেদ তার সমস্যা নিয়ে প্রভাবশালী কাউকে ফোন করছেন। ওই নম্বরটি তার ফোনের স্ট্ক্রিনে ভেসে উঠত। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফোনের ওপাশ থেকে সাহেদের খালু কোনো মন্ত্রী বা প্রভাবশালী কোনো কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে কথা বলতেন, বলা চলে অভিনয় করতেন। সাহেদও অভিনয় চালিয়ে যেতেন। অভিনয় শেষে সাহেদ বলতেন, স্যারের সঙ্গে আপনার সমস্যা নিয়ে কথা হলো। তবে স্যারকে তো খুশি করতে হবে। তখন ওই ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করতেন তিনি।
সাহেদের সাবেক এক দেহরক্ষী সমকালকে জানান, তিনি প্রতারণার জন্য যেসব কৌশলের আশ্রয় নিতেন, তা দেখে তারা বিস্মিত হতেন। এত কূটবুদ্ধি একজনের থাকে কী করে!
জানা গেছে, মানুষকে বোকা বানানোর আরেকটি পথ ছিল কোনো মামলার আসামিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায়। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর হেলিকপ্টার নাসির নামে এক ব্যক্তিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আট লাখ নিয়েছিলেন সাহেদ।
রিজেন্টের একাধিক সাবেক কর্মী জানান, সাহেদের হয়ে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের সমস্যাগ্রস্ত নারীদের তথ্য সংগ্রহ করতেন বেশ কয়েকজন। এরপর তাদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে ঢাকায় আনা হতো। পরে ওই নারীদের অশালীন কাজের প্রস্তাব দিতেন সাহেদ।
এ ছাড়া অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে অনেক টাকাপয়সার মালিক আছেন যাদের সংসারে অশান্তি। তাদের নম্বর সংগ্রহ করার জন্য সাহেদ দীর্ঘদিন একটি ম্যারেজ মিডিয়ার নারী মালিককে ব্যবহার করেন। ওই নারীকে একটি দামি প্রাইভেটকারও উপহার দেন সাহেদ। ম্যারেজ মিডিয়ার মালিকের একটি নেশা হলো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তার অফিসে রাখা। প্রভাবশালীদের সঙ্গে সাহেদের ছবি তোলার বাতিক ওই নারীর কাছ থেকেই এসেছে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রতারণা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে নগরের ধনিয়ালাপাড়ার মেসার্স মেগা মোটর্সের নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ডবলমুরিং থানায় মামলাটি দায়ের করেন মো. সাইফুদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী। মামলায় মো. সাহেদ করিম ওরফে সাহেদ ছাড়াও মো. শহীদুল্লাহ নামে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার এক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরে সিএনজি থ্রি-হুইলার চলাচলের অনুমতি নিয়ে দেওয়ার নামে জালিয়াতি করে এ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
ডবলমুরিং থানার ওসি সদীপ দাশ সমকালকে বলেন, 'সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তিনি গ্রেপ্তার হলে তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চট্টগ্রামে আনা হবে। গ্রেপ্তার না হলে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।'
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ১৩৮০ ডিটি রোডের ধনিয়ালাপাড়ার অবস্থিত গাড়ি, গাড়ির টায়ার ও যন্ত্রাংশ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স মেগা মোটর্স। মামলার আসামি মো. শহীদুল্লাহর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মালিক জিয়া উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচিত হন মো. সাহেদ। তিনি নিজেকে বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলে পরিচয় দেন। সেই সুবাদে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা মেগা ব্র্যান্ডের সিএনজি থ্রি-হুইলার গাড়ি ঢাকায় চলাচলের জন্য রুট পারমিটসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমতি নিয়ে দেওয়ার কথা বলেন সাহেদ। তার ওপর আস্থা রেখে এসব কাজের জন্য সাহেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেডের প্রিমিয়ার ব্যাংকের হিসাবে ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ১৩ দফায় ৫৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর। সাহেদ তার অফিসে এসে নিয়ে যান ৩২ লাখ টাকা। এভাবে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নেওয়ার পর বিআরটিএ চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত ২০০টি থ্রি-হুইলার ঢাকা মহানগরে চলাচলের একটি অনুমতিপত্রের কাগজ জাহাঙ্গীরকে দেন তিনি। সেটি নিয়ে তাদের সন্দেহ হওয়ায় বিআরটিএতে খোঁজ নিয়ে দেখেন অনুমতিপত্রটি ভুয়া। এটি জাল তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি সাহেদকে জানালে উল্টো জাহাঙ্গীরকে ভয়ভীতি দেখান। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দেখাশোনা করেন তার চাচাতো ভাই মো. সাইফুদ্দিন। তিনি সমকালকে বলেন, 'বিষয়টি মীমাংসার জন্য একাধিকবার আশ্বাস দেওয়ায় মামলা দায়ের করতে দেরি হয়েছে। এ ঘটনার পর আমার ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ায় সাহেদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতাম। একপর্যায়ে তিনি আমার নম্বর ব্লক করে দেন। পরে লাপাত্তা হয়ে যান এ প্রতারক।'
- বিষয় :
- সাহেদ
- প্রতারণা
- গোয়েন্দা' কৌশল
- গোয়েন্দা