ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চিত্রাঙ্কন

শিশুভাবনায় মূর্ত দেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ

শিশুভাবনায় মূর্ত দেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ
×

শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সকাল। ঢাকার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণ তখন আর নিছক ইটপাথরের চত্বর নয়, হয়ে উঠেছে এক বিশাল ক্যানভাস। শত শত শিশুর ভাবনার রঙে মূর্ত হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা ও আত্মত্যাগ। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক স্মরণে আয়োজিত শিশু-কিশোরদের এ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা যেন প্রজন্মের সঙ্গে ইতিহাসের মেলবন্ধন।

সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল শুক্রবার উৎসবমুখর পরিবেশে জাদুঘরের খোলামেলা পরিসরে কার্পেটের ওপর বসে মগ্ন হয়ে আঁকছে শিশুরা। চারপাশের প্যানেলে ঝোলানো রয়েছে তাদেরই আঁকা নানা ছবি। কেউ আঁকছে প্রকৃতি, কেউবা মুক্তিযুদ্ধ। অভিভাবকদের উপস্থিতিতে পুরো প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যময়।

এক কিশোরী পরম যত্নে জলরঙে ফুটিয়ে তুলছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। তার তুলির আঁচড়ে স্মৃতিসৌধের পাদদেশে পতাকাবাহী জনতার ঢল, যা বিজয়ের উল্লাসকে মনে করিয়ে দেয়। সামনে রাখা কালার প্যালেট যেন তার কল্পনারই রঙধনু। অন্যদিকে উজ্জ্বল কমলা ও হলুদের আবহে জাতীয় স্মৃতিসৌধের পেছনে উদীয়মান রক্তিম সূর্য। এক শিশু সেই ছবিই আঁকছিল গভীর মনোযোগে। প্রতিযোগিতা প্রাঙ্গণের দৃশ্যগুলোই বলে দিচ্ছিল শিশুদের আগ্রহের কথা।

প্রায় সাড়ে ৩০০ শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণে মুখর ছিল আয়োজন। শিশু ও কিশোর– এ দুটি বিভাগে ১৮টি পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় বিজয়ীদের হাতে। প্রতিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের পাশাপাশি ছিল বিশেষ পুরস্কার। এ ছাড়া শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের পরিবারের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয় আরও পাঁচটি পুরস্কার।
তবে এটি কেবল পুরস্কার জেতার প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল শেখার আসরও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারক আলভী। শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভালো ছবি আঁকতে হলে আগে মন দিয়ে দেখতে হবে। নিজের মতো করে আঁকলেই ছবি ভালো হবে। তাঁর মতে, বারবার চেষ্টার মাধ্যমেই একজন খুদে শিল্পী বড় শিল্পী হয়ে ওঠে।

২৭ বছর ধরে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক স্মরণে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ট্রাস্টি সারওয়ার আলী মনে করিয়ে দেন, এটি কেবল ছবি আঁকা নয়, বরং একজন দেশপ্রেমিক বীরকে সম্মান জানানো। প্রতিযোগী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধা জানানোই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।’
অনুষ্ঠানে উঠে আসে নগরজীবনের যান্ত্রিকতার কথাও। শিল্পী মনিরুজ্জামান অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান শিশুদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়ার। তিনি বলেন, ইটপাথরের শহর থেকে শিশুদের মাসে অন্তত একবার গ্রামে নিয়ে যান। দিগন্তজোড়া মাঠ, নদী আর পাহাড় দেখলে তাদের মনে প্রশ্ন জাগবে, দেশপ্রেম তৈরি হবে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের পরিবারের সদস্য নাজনীন হক অভিভাবকদের সৃজনশীল চর্চার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, একাডেমিক শিক্ষা সবাই নিতে পারে; কিন্তু সাংস্কৃতিক চর্চা শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্পী অশোক কর্মকার ও শহীদ পরিবারের সদস্য অধ্যাপক মাইনুল হক। সঞ্চালনায় ছিলেন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।
দিন শেষে জাদুঘরের দেয়ালে ঝোলানো শিশুদের আঁকা ছবিগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছিল। মনে হলো, এ শিশুরাই তো আমাদের আগামীর বাংলাদেশ। তাদের তুলির আঁচড়েই এক দিন দূর হবে সব কালো, ফুটে উঠবে এক অনাবিল সুন্দর সকাল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এ প্রাঙ্গণ সেই সুন্দর আগামীরই এক আঁতুড়ঘর।

আরও পড়ুন

×