পিআরআইর আলোচনা সভা
বৈশ্বিক অস্থিরতায় বৈদেশিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে বাংলাদেশের
রাজধানীর বনানীর পিআরআই কার্যালয়ে রোববার আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিথিরা। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১২:০৭ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১২:১৪
চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)। পিআরআই ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) যৌথ উদ্যোগে গতকাল রোববার ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনসাইটস: গ্লোবাল টার্বুলেন্সেস অ্যান্ড আ রাইজ ইন এক্সটার্নাল সেক্টর ভালনারএবিলিটিজ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় পিআরআইর অর্থনীতিবিদরা এমন মত দেন। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা অংশ নেন।
সভায় মূল প্রবন্ধে পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। গত ছয় বছরে বাংলাদেশকে অস্থির বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। প্রথম ধাক্কাটি আসে কভিড-১৯ মহামারি থেকে, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য উত্তেজনা ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত থেকে নতুন করে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ড. আশিক আরও উল্লেখ করেন, দেশের আর্থিক ও রাজস্ব খাতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা সরকারকে এসব ধাক্কার কার্যকর মোকাবিলা করতে সীমাবদ্ধ পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি তাঁর বক্তব্যে বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আরও নমনীয় বিনিময় হার এবং টাকার আরও অবমূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক তৈরি পোশাক কারখানা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটি কারখানা প্রতি মাসে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। সাত মাস ধরে রপ্তানি কমছে এবং জুন পর্যন্ত এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে এলডিসি উত্তরণের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান। যদিও তা আপাতত স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসা সহজীকরণের জন্য কর ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এমন সব উপাদান রয়েছে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিপথকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে। প্রথমটি হলো যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ব্যবস্থা, যা এখনও পুরোপুরি অনুমোদিত না হলেও বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কিছু অঙ্গীকার করেছে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তা দিয়ে নিটওয়্যার বা বোনা পোশাক তৈরি করে, তাহলে সেই পণ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, জাপান অত্যন্ত উদার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। জাপান বাংলাদেশের প্রায় ১৯ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা দিতে প্রস্তুত, যার মধ্যে তৈরি পোশাকও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি রপ্তানি এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে। বৈদেশিক খাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি কমেছে। তবে প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণে এই ঘাটতি অনেকটা পুষিয়ে গেছে।
আলোচনা সঞ্চালনা করেন পিআরআইর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ। তিনি বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় বিনিয়োগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বেড়েছে। ফলে আমদানিও বাড়বে। ৬ থেকে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আমদানিকে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
তিনি বলেন, মধ্যমেয়াদে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বর্তমান গতিতে থাকবে না এবং সম্ভবত ৫ থেকে ৬ শতাংশ প্রবণতামূলক প্রবৃদ্ধিতে স্থিতিশীল হবে। ফলে আমদানি অর্থায়নের প্রধান উৎস হবে রপ্তানির দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি। এটি অর্জনের জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, নিম্ন মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য সুরক্ষা হ্রাস, উন্নত বাণিজ্য লজিস্টিকস, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানির ভবিষ্যৎ বেশ কিছু অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ইইউ বাজারে রপ্তানি হ্রাস, ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক অনিশ্চয়তা, এলডিসি উত্তরণ এবং সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের মতো বহিরাগত ধাক্কা এর কারণ। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে, কারণ এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাশরুর রিয়াজ বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সময়োপযোগী সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশন, ঢাকার ফার্স্ট সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) হ্যারি থম্পসন বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশই বৈদেশিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সংকট একই সঙ্গে সুযোগও তৈরি করতে পারে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশিদ আলম।
- বিষয় :
- বাণিজ্য
- আলোচনা সভা
- পিআরআই
