ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মোহাম্মদপুরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং

মোহাম্মদপুরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং
×

নিহত মো. ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন

ইন্দ্রজিৎ সরকার

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১৬

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোর তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান ও হাজার হাজার গ্রেপ্তার; তবু কিছুতেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি। বিশেষ করে গত দুই বছরে বেপরোয়া হয়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’গুলো এখনও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক বছরে এসব গ্যাংয়ের হাতে অন্তত তিনজন খুন এবং ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হন। রোববার বিকেলে একটি কিশোর গ্যাংয়ের হোতা ইমন হোসেন ওরফে অ্যালেক্স ইমন ওরফে এলএক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা সমকালকে বলেন, ইমন হত্যার ঘটনায় তার মা মোছা. ফেরদৌসী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। সেখানে ২১ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামি সুমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে আরমান শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ইমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৮টি মামলা রয়েছে।

পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, কিশোর গ্যাংসহ এই এলাকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায় পুলিশ। গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও জড়ায় অপরাধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং অ্যালেক্স ইমনের বিরুদ্ধে ছিনতাই-চাঁদাবাজি-মাদক কারবারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ছিনতাইয়ে বাধা পেলে কুপিয়ে জখম করতেও তারা দ্বিধা করে না। আর আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যকার বিরোধে খুনোখুনি তো আছেই। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। ইমনের নেতৃত্বে তাদের হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। দুই বছর আগে ইমন একটি বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে। এরপর সেই দাপট দেখিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করে।

স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তৎপর হয়ে ওঠে অপরাধীরা। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ের জনপদ। দীর্ঘদিনেও সেখানকার ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সামাল দিতে হিমশিম খায় পুলিশ। কিশোর গ্যাংগুলোর নিজেদের সংঘাত, শক্তি প্রদর্শনের মহড়া বা প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের সিসিটিভি ফুটেজ জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। সেগুলোর মধ্যে বেশি আলোচনায় আসে কবজি কাটা গ্রুপ। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ভিডিও দেখে মানুষ আঁতকে ওঠে। গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর তাদের তৎপরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের কর্মকাণ্ড থেমে ছিল না। এই এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে– পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান, চেতাইলেই ভেজাল ইত্যাদি। 

খুন-জখম, ছিনতাই
আদাবর বালুরমাঠ এলাকায় গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বাসায় ঢুকে রিপন ওরফে নিপু নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে বেলচা মনির গ্রুপের সদস্যরা। এর আগে ১৬ মে মোহাম্মদপুরের অদূরে ধানমন্ডির জিগাতলায় কলেজছাত্র সামিউর রহমান আলভীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এ ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, মাদক সেবন নিয়ে বিরোধে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। কিশোর গ্যাং গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি চার পুলিশ এবং ১ সেপ্টেম্বর আরও এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে জখম করে। প্রথমটিতে পাটালি ও দ্বিতীয় ঘটনায় কবজি কাটা গ্রুপ জড়িত ছিল। কবজি কাটা গ্রুপ একই বছরের ৩০ জানুয়ারি আদাবর বালুরমাঠ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক যুবকের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ১৮ ডিসেম্বর চাঁদ উদ্যান এলাকায় সাগর নামে এক যুবককে জখম করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

৮ মার্চ রাতে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক। ছিনতাইকারীরা তাঁকে কুপিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ কেড়ে নেয়। চাঁদা না পাওয়ায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের আবির এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলা চালায় কিশোর গ্যাং। 

আরও পড়ুন

×