ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তরুণ লেখকদের প্রশিক্ষণে বক্তারা

সফল লেখক হতে সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে

সফল লেখক হতে সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে
×

‘লেখালেখি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা ২০২৬’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ২১:৩৩ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ | ২১:৩৬

বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়ার প্রসারের ফলে প্রাথমিক তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়, তাই কলাম লেখার সময় ঘটনার গভীর বিশ্লেষণ থাকতে হয়। একজন সফল কলামিস্ট হতে সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা, প্রচুর পড়তে হবে। নিয়মিত অনুশীলন এবং সমালোচনায় ভয় না পেয়ে এড়িয়ে লেখালেখি শুরু করা উচিত।

আজ রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম আয়োজিত ‘লেখালেখি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। 

অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ফয়সাল মাহমুদ, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বাবলু। তারা দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। 

অনুষ্ঠানে সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, সাংবাদিকতা বা কলাম লেখা মোটেও কোনো অসম্ভব কাজ নয়; যারা গুছিয়ে একটি সুন্দর চিঠি লিখতে পারেন, তাদের পক্ষে ভালো কলাম লেখাও সম্ভব। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ডিজিটাল মিডিয়া ও অনলাইনের প্রসারের ফলে সংবাদের ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন ‘কী, কোথায়, কখন’—এসব তথ্য অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় বলে পত্রিকার কলামে মূলত একটি ঘটনা ‘কেন এবং কীভাবে’ ঘটলো তার বিশ্লেষণ থাকতে হয়। বর্তমান সময়ে কলাম লেখকদের সাধারণ খবরের বাইরে গিয়ে গভীর চিন্তা, তুলনামূলক গবেষণা এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে। 

একজন সফল কলামিস্ট হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রচুর পড়ার পরামর্শ দেন শাহেদ মুহাম্মদ আলী। তাঁর ভাষায়, তিন পৃষ্ঠা লেখার জন্য তিনশ পৃষ্ঠা পড়তে হবে। লেখালেখিকে তিনি ‘রিরাইটিং’ বা প্রতিনিয়ত সম্পাদনার প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে প্রথমবার লিখে সন্তুষ্ট না হয়ে বারবার পড়ে অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেঁটে ফেলে লেখাকে ঝরঝরে করতে হয়। কলামে অবশ্যই নিরপেক্ষতা বা ব্যালেন্স বজায় রাখতে হবে, কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না এবং ভাষা হতে হবে অত্যন্ত মার্জিত।

তিনি তরুণ লেখকদের পত্রিকায় লেখা না ছাপানো নিয়ে হতাশ না হয়ে নিজস্ব পাঠক তৈরি করার আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজের পেজ ব্যবহার করে নিয়মিত লেখার চর্চা করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি লেখকের এমন একটি নিজস্ব স্বকীয়তা তৈরি করা উচিত যেন তার লেখা বা শিরোনাম দেখেই মানুষ চিনে নিতে পারে যে এটি কার লেখা।

অনুষ্ঠানে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মিনিস্টার ও প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ। তিনি বলেন, পত্রিকায় ছাপা হওয়া যেকোনো লেখাই কলাম নয়; বরং একটি কলাম হলো এমন একটি শক্তিশালী মতামত যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বা পাঠকের চিন্তায় নতুন ধারণার জন্ম দিতে সক্ষম। 

নিউজ ও ফিচারের সঙ্গে কলামের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কলামিস্ট হতে হলে সমাজের মানুষ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বোঝাপড়া থাকতে হবে এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণাত্মক মতামত দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, আবেগ বা সাধারণ উপদেশের বদলে লেখার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনার তুলনামূলক আলোচনা থাকা প্রয়োজন। ভাষার দুর্বলতা কাটানোর ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল ব্যবহার করে তরুণরা সহজেই তাদের চমৎকার আইডিয়াগুলোকে সুন্দর ও গোছানো ভাষায় রূপান্তর করতে পারেন; তবে কলামের মূল শক্তি হিসেবে নিজস্ব মৌলিক ও শক্তিশালী চিন্তাধারাই সবসময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, বর্তমান সময়ে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তাই লেখার প্রথম তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। এর জন্য তিনি ‘লেটেস্ট অ্যান্ড গ্রেটেস্ট’ তথ্য বা কোনো নির্দিষ্ট মানবীয় গল্প দিয়ে লেখা শুরুর পরামর্শ দেন। 

তাঁর মতে, কলাম বা ফিচার লেখার ক্ষেত্রে ‘পিটিজি’- পার্টিকুলার টু জেনারেল ফরম্যাট সবচেয়ে কার্যকর; যেখানে একটি নির্দিষ্ট গল্প বা ঘটনা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে মূল বিষয়ের দিকে অগ্রসর হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ তিনি এক ভিখারি নারীর গল্প উল্লেখ করেন, যা দিয়ে শুরু করা একটি ফিচার প্রতিবেদন পরবর্তীতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ কাড়তে এবং সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল।

আবার লেখার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মিডিয়ায় পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য চটকদার বা ‘ক্লিকবেইট’ শিরোনাম ব্যবহারের প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করেন মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বাবলু। তিনি বলেন, শিরোনাম আকর্ষণীয় হলেও মূল লেখার সাথে তার সামঞ্জস্য থাকা বাধ্যতামূলক; অন্যথায় পাঠকরা প্রতারিত বোধ করেন এবং প্রকাশনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গালিগালাজ করেন। এছাড়া পাঠককে লেখার প্রতি আকৃষ্ট রাখতে তিনি সহজ ভাষা, ছোট বাক্য এবং ছোট প্যারাগ্রাফ ব্যবহারের ওপর জোর দেন, যাতে পাঠকের চোখের ওপর চাপ না পড়ে এবং তারা ক্লান্ত না হয়ে যান। লেখার উপসংহার টানার ক্ষেত্রেও শুরুর গল্পের রেশ ধরে রাখা বা একটি চিন্তামূলক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে শেষ করার পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন তরুণ কলাম লেখক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আশিক খান, সঞ্চালনা করেন তরুণ কলাম লেখক ফোরাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবিদ হাসান রাফি। অনুষ্ঠানে তরুণ কলাম লেখক ফোরাম আয়োজিত কবিতা ও কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১৩জনকে পুরস্কৃত করা হয়।

আরও পড়ুন

×