ফাঁকা ঢাকায় ঈদ, ‘বখশিসের’ নামে বাড়তি ভাড়ার চাপ
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট ফাঁকা। ছবিটি বৃহস্পতিবার বিকেলে তোলা।
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬ | ১৮:৪৫ | আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ | ১৯:১৫
ঈদুল আজহায় লাখো মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। অধিকাংশ মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় রাজধানী এখন অনেকটাই ফাঁকা। রাস্তায় যানবাহনের চাপ নেই, নেই চিরচেনা যানজটও। মহানগরীতে থেকে ঈদ উদযাপন করছেন যারা, তাদের চলাফেরা অনেকটাই ভোগান্তিবিহীন।
তবে এই স্বস্তির মধ্যেও নগরবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যানবাহনের বাড়তি ভাড়া। বাস, সিএনজি, অটোরিকশা বা রিকশা সব ধরনের যানবাহনেই এই বাড়তি ভাড়া হাঁকা হচ্ছে। চালকদের ঈদ বকশিসের চাপে পড়ে অনেকটাই অস্বস্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বৃহস্পতিবার ঈদের দিন সকাল থেকে গোটা রাজধানীজুড়ে এমন পরিস্থিতি হয়েছে।
এদিন বিকেলে রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় সপরিবারে ঈদের ঘোরাঘুরি করতে বের হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে এই বেসরকারি চাকরিজীবী জানালেন, ঈদের দিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছেন। বিকেলের দিকে খোলা হাওয়ায় ঘোরাঘুরির ইচ্ছাও আছে তার। কিন্তু রাস্তায় যানবাহন যেমন কম, তেমনি চালকরা প্রচলিত ভাড়ার চেয়েও অনেক বেশি চাইছেন। অজুহাত হিসেবে ‘ঈদের বখশিস’, ‘আজকে ঈদের দিন, খুশি করবেন না’ এমন কথা বলছেন চালকরা। এমনকি স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যের জন্যও ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে।
ফার্মগেট এলাকায় ব্যবসায়ী সোলায়মান আহমেদ জানালেন, ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত যাওয়া গেলেও ভাড়া নিয়ে এক ধরনের অরাজকতা চলছে। তেজগাঁও সাত রাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য রিকশা ভাড়া করেছিলেন তিনি। অন্যদিনে ৩০ টাকা ভাড়া হলেও আজ ঈদের কারণে ৫০ টাকার নিচে কোনো রিকশাচালকই যেতে রাজি হননি। অগত্যা সেটা দিয়েই গন্তব্যে যেতে হলো।
কেবল পশ্চিম শেওড়াপাড়া ও ফার্মগেট নয়, রাজধানীর সব এলাকায়ই একই অবস্থা দেখা গেল। সরেজমিনে মিরপুর-১, মিরপুর-১০, ইসিবি চত্বর, পূর্ব শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী, কুড়িল, রামপুরা, বনশ্রী, কুর্মিটোলা, নতুন বাজার, নর্দা পল্টন, নয়াপল্টন ও সেগুনবাগিচা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রিকশাচালক স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাবি করছেন। সিএনজি চালকদের দাবি আরও বেশি। ৩০০ টাকার নিচে কোনো চালক কোথাও যেতে রাজি নন। ভাড়ার মোটর সাইকেলেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও যাত্রীদের সঙ্গে বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডাও দেখা যাচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক চালক বাড়তি ভাড়ার দাবিতে মানুষের সঙ্গে রীতিমতো দুর্ব্যবহার করছেন।
কয়েকজন যাত্রী বলেন, ঈদের ছুটির কারণে আজ মেট্রোরেল বন্ধ রাখা হয়েছে। এটাও তাদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেট্রোরেলে যেমন নির্ধারিত ভাড়ায় ও ঝামেলাবিহীন যাতায়াত করা যেতো, আজ সে সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে হয়েছে তাদের।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আসিফ খান বলেন, ঈদে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আগারগাঁও, সংসদ ভবন ও আশপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে ঘোরাঘুরির জন্য বের হয়েছিলেন। মেট্রোরেল খোলা থাকলেও সহজেই ও কম ভাড়ায় ঘুরে আসার সুযোগ মিলতো। এখন না থাকায় বাসে উঠেছিলেন। জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখলাম। অনেক যাত্রী এ নিয়ে ক্ষোভ জানালেও কিছুই করার ছিল না।
একই অভিযোগ করেন গৃহবধু সুলতানা বেগম। তিনি বলেন, শিশু সন্তানের আকস্মিক অসুস্থতার জন্য কাজীপাড়া থেকে শ্যামলীতে শিশু হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এমন দুর্ভোগের মধ্যেও কোনো চালকের মানবিকতা দেখা গেল না। স্বাভাবিক ভাড়া ৫০ টাকার স্থলে ৮০ টাকা নেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে।
তবে যানবাহন চালকদের দাবি, ঈদের দিন তারা পরিবার ছেড়ে কাজ করছেন। এই কারণেই বাড়তি ভাড়া চাইছেন। মিরপুর-১ নম্বর এলাকার সিএনজি চালক রহিম শেখ বললেন, ‘আমরা নিজেরা পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ না করে মানুষকে সেবা দিতে নেমেছে। ঈদের দিনও আমাদের বিশ্রাম নেই। এই অবস্থায় সামান্য কিছু বখশিষ চাইলে, সেটাতে রাগ হওয়ার কারণ তো দেখি না। সারা বছর এই ধরণের উৎসবের দিনই তো আমরা কিছুটা বাড়তি রোজগার করে পরিবারের মুখে কিছুটা হলেও হাসি ফোটানোর জন্যই এত পরিশ্রম করে থাকি।’
পল্টন এলাকার রিকশাচালক আব্দুর রহিম বলেন, ঈদের দিন সবাই পরিবার নিয়ে আনন্দের সময় কাটান। আর আমরা রাস্তায় থাকি। তাই একটু বেশি ভাড়া চাইলে দোষের কিছু দেখি না। অনেক যাত্রী আবার খুশি হয়ে নিজেরাও বখশিস দেন।
মিরপুর-১২ থেকে গুলিস্তানগামী বাস শিকড় পরিবহনের চালক মো. মামুন বলেন, ঈদের দিন সড়কে যাত্রী তুলনামূলক কম থাকে। অনেক সময় বাসের বেশিরভাগ সিটই ফাঁকা থাকে। কিন্তু তাতে তেল ও স্টাফের বেতন বাবদ খরচ তো আর কমে না। এসব কারণেই বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো যাত্রীকে চাপ দিয়ে নয়, তাদের কাছে চেয়েই নেওয়া হয়। অনেকে আবার বখশিষ না দিয়ে স্টাফদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেন। এই বিশেষ দিনে কিছুটা মানবিক ও সহযোগিতার মনোভাব দেখালে কিন্তু এই সমস্যা হওয়ার কথাও নয়।
- বিষয় :
- রাজধানী
- ফার্মগেট
- ভাড়া বৃদ্ধি
