ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আদ্‌-দ্বীনে ছয় নবজাতকের মৃত্যু 

নাম রাখার আগেই নিভে গেল জীবন

নাম রাখার আগেই নিভে গেল জীবন
×

আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল। ছবি-সংগৃহীত

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০০:৪২

একটি ছোট্ট শিশুকে ঘিরে পরিবারের কত স্বপ্নই না থাকে। কেউ নাম ঠিক করে, কেউ নতুন কাপড় কেনে, কেউ ভবিষ্যতের গল্প বোনে। কিন্তু আরিফ ও মিম দম্পতির সেই স্বপ্ন টিকল মাত্র তিন দিন। পৃথিবীতে আসার পর পরিবার যখন প্রথম সন্তানকে ঘিরে আনন্দে ডুবে ছিল, তখনই মৃত্যু কেড়ে নিল তাদের কন্যাশিশুকে। শিশুটির নাম রাখারও সময় পায়নি তারা।  

রাজধানীর আদ্‌-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মঙ্গলবার গভীর রাতে একসঙ্গে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের একজন ছিল এই শিশুটি। বুধবার হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শোক যেন পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে।

ওয়ার্ডের এক কোণে নীরবে বসে ছিলেন শিশুটির দাদি মাসুদা বেগম। কোলে জড়িয়ে রেখেছেন ছোট্ট নিথর দেহ। চোখেমুখে গভীর শোক আর অসহায়ত্ব। পাশে শয্যায় শুয়ে থাকা মা মিম আক্তার বারবার চোখ মুছছিলেন। কয়েক দিন আগেও যে সন্তানকে বুকের কাছে আগলে রেখেছিলেন, সেই সন্তান এখন নিথর।

মাসুদা বেগম বলেন, ‘আমার নাতনির বয়স ছিল মাত্র তিন দিন। তার নামও রাখা হয়নি। প্রথম সন্তান ছিল, সবাই অনেক খুশি ছিলাম। ভাবতেই পারছি না এভাবে চলে যাবে।’

তিনি জানান, ছেলে আরিফ ও পুত্রবধূ মিম আক্তার কাজের কারণে ঢাকায় থাকেন। তাদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। সন্তান জন্মের খবর পেয়ে পরিবারের সবাই আনন্দে ভাসছিল। কিন্তু বুধবার সকাল আনন্দকে শোকে পরিণত করে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সকালে আমার ছেলে ফোন করে বলেছিল বাচ্চার অবস্থা খারাপ। তখনও বুঝিনি এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরে জানতে পারি, আমার নাতনি আর বেঁচে নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখনও আমাদের সঙ্গে স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি।’

সৌদি আরব প্রবাসী সাইদুল ইসলাম। মঙ্গলবার রাতেও দূর পরবাস থেকে ভিডিওকলে মোবাইল স্ক্রিনে পরম মমতায় তাকিয়ে ছিলেন তার তিন দিনের কন্যাসন্তানের দিকে। ওপাশে মা ফারিয়ার কাছে থাকা ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখে বারবার হাসছিলেন বাবা, দূর থেকেই জানাচ্ছিলেন আদর। কে জানত, সেই হাসিমুখের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক চিরন্তন বিদায়ের সুর!

ভোরের আজানের কিছু পরে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। শিশুটির দাদি মোছা. জানু বেগম খেয়াল করেন, কেবিনে থাকা অন্য শিশুরা কাঁদলেও তাদের নাতনিটি চুপ। ফুফু জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, ‘আমার আম্মু দেখে অন্য বাচ্চারা কান্না করতেছে, কিন্তু আমাদের বাচ্চা কান্না করছে না। তখন কাছে গিয়ে দেখে বাচ্চা ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারতেছে না, কষ্ট হচ্ছে নিতে।’

এরপর দ্রুত শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। দাদি জানু বেগম চারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে স্বজনরা ভেতরে ঢুকতে পারলেও দেখেন, সব শেষ। দুপুরের দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শিশুটি আর বেঁচে নেই। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও ভিডিওকলে বাবার সামনে সে সুস্থ ছিল। মা ফারিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। 

স্বজনরা জানান, পরিবারে কেউ তাঁকে ‘বাবু’, কেউ ‘নাতিন’ আবার কেউ ‘বইন’ বলে ডাকত। নাম রাখার আগেই নিভে গেল তার জীবন। রাজধানীর মাদারটেকের নন্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও ছোট ব্যবসায়ী হাসান সরদার এবং নাজমা বেগম দম্পতির সংসার ছিল দুই ছেলেকে নিয়ে। গত ২৪ মে সিজারের মাধ্যমে তাদের কোল আলো করে আসে আরও দুই যমজ ছেলে সন্তান। ডাক্তার-নার্সরা তিন দিন ধরে বলছিলেন বাচ্চারা ভালো আছে। বুধবার তাদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল। কিন্তু হাসান সরদারকে ফিরতে হলো শূন্য হাতে।
হাসান সরদারের অভিযোগ, মঙ্গলবার গভীর রাতে হঠাৎ করেই ওয়ার্ডের ভেতরে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভেতরে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং শিশু দুটির বমি শুরু হয়। হাসান সরদার বলেন, ‘পরে শুনলাম রুমের ভিতরে গ্যাসের মতো কিছু ছিল। শুধু আমার বাচ্চা না, ওই রুমে থাকা আরও কয়েকটা বাচ্চাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।’ তার বোনজামাই ও ছোট ভাই ভেতরে ঢুকে দেখেছিলেন, সেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না।

অসহায় এই বাবা কাঁদতে কাঁদতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এনে বলেন, অসুস্থ বাচ্চাদের নিয়ে এক তলা থেকে চার তলা, পাঁচ তলায় শুধু দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে তাদের। ডাক্তারদের দেওয়া সব টেস্ট করানো এবং ১০ হাজার টাকার ওষুধ কেনার পরও আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দুই ভাই। অন্য দুই সন্তানের নাম ‘মোহাম্মদ আলী’ ও ‘আবু বকর আলী’ এর সঙ্গে মিলিয়ে এদের নাম রাখার কথা ভাবা হয়েছিল, কিন্তু সেই সুযোগ আর মেলেনি। দুপুরে স্থানীয় মসজিদের কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে যমজ দুই শিশুকে।
সন্তানদের মাটি দিয়ে ফেরার পথে বাকরুদ্ধ মা নাজমা বেগম ঘরে পাথরের মতো নিঃশব্দে কাঁদছেন। শোকে ভেঙে পড়া বাবা হাসান সরদার বারবার বলছিলেন, ‘আজ তো বাসায় আনার কথা ছিল… যার যায়, সেই বোঝে ভাই…।’

আরও পড়ুন

×