কাজ হয়েছে অর্ধেক বিল তোলা সারা
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৩
কাজ হয়েছে অর্ধেকের মতো। এর মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসাকে
বুঝিয়ে দিয়েছে পদ্মা-জশলদিয়া এবং সাভারের ভাকুর্তা-তেঁতুলঝোড়া পানি
শোধনাগার প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও জানানো হয়েছে, প্রকল্প দুটি
সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে। এমনকি প্রকল্প দুটির যাবতীয় বিলও তুলে নিয়েছে ঠিকাদার-
যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।
এখানেই শেষ নয়। কাজ শেষ হওয়ার অসত্য তথ্য দিয়ে গত ১০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনাকে দিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করানো হয়েছে প্রকল্প
দুটি। বাস্তবচিত্র গোপন করে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এই প্রকল্প উদ্বোধনের পর
থেকে ঢাকা ওয়াসায় এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
নানা ধরনের অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং পুরো কাজ শেষ না করেই পদ্মার মাওয়া
পয়েন্ট থেকে রাজধানীতে পানি সরবরাহের পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের কাজ শেষ
করেছে ঢাকা ওয়াসা। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চায়না সিএএমসি
ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড কাজ শেষ না করেই পুরো কাজের বিল তুলে নিয়েছে। এ
প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে তিন হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা থাকলেও পরে
তা বাড়িয়ে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারকে
সুবিধা দিতেই এটা করা হয়।
ওয়াসা সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী মাওয়া থেকে ঢাকায় পানি সরবরাহের জন্য
খাল-নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন স্থাপনের কথা থাকলেও তা কোনোমতে জোড়াতালি
দিয়ে করা হয়। এতে এমনকি নদীর তলদেশের পাইপের নিরাপত্তার জন্য সেটির ওপর
কোনো নিরাপত্তা খাঁচা (প্রটেকশন কেজ) দেওয়া হয়নি। কয়েক মাস আগে ধলেশ্বরী
নদীতে চলাচলকারী একটি নৌযানের তলা ওই পাইপে লাগে। এর ফলে পাইপটি ফেটে যায়। এ
ছাড়া যে পাইপ বসানো হয়েছে, সেটা দুই হাজার মিলিমিটার ব্যাসের। যদিও ওই
পরিমাণ পানির জন্য সরবরাহ লাইন তৈরি করা হয়নি। ফলে পুরোদমে চালু হলে পানি
সরবরাহ লাইনে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ সায়েদাবাদের সরবরাহ
লাইন ৬০০ মিলিমিটার ব্যাসের। এতে পাইপ ফেটে যাওয়ারও আশঙ্কা আছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত পাইপের বদলে কম পুরুত্বের পাইপ বসানো হয়েছে এ প্রকল্পে।
২২ মিলিমিটার পুরুত্বের (কে-১০) পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে ১৯ মিলিমিটার (কে-৯)।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাইপের মানও পরীক্ষা করা
হয়নি। এই পাইপের মান পরীক্ষার জন্য বুয়েট ৯ কোটি টাকা দাবি করেছিল। অভিযোগ,
ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই এটা করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের ৩৩ কিলোমিটার
পাইপলাইনই নির্মিত হয়েছে নিম্নমানের। এ ছাড়া প্রকল্পের ফাউন্ডেশনের
ক্ষেত্রে আরসিসি পাইলিংয়ের পরিবর্তে ভরাট করা হয়েছে সাধারণ পাথর-বালু দিয়ে।
প্রকল্পপত্র অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা সায়েদাবাদ পানি
শোধনাগার-২-এর নকশা ও প্রযুক্তি অনুযায়ী। বাস্তবে তা করা হয়নি। এ জন্য
প্রকল্পের মূল কনসালট্যান্ট ডেনমার্কের বোডো গোপার্টকে পদত্যাগে বাধ্য করা
হয়। বোডো গোপার্ট সায়েদাবাদ-২ পানি শোধনাগার প্রকল্পের কনসালট্যান্ট ছিলেন।
পরে গ্রুনমিজ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হয়। পুরো
প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও গত নভেম্বরে প্রকল্পটি ঢাকা ওয়াসাকে বুঝিয়ে দেয়
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রকল্প থেকে
দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু তা পাওয়া যাচ্ছে না।
এসব প্রসঙ্গে পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম
সমকালকে বলেন, ওয়াসায় কিছু লোক আছে, তারা এসব বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
ধলেশ্বরীতে পাইপ ফেটে যাওয়ার কারণ, তখন পানির লেয়ার অনেক নিচে চলে গিয়েছিল।
তখন একটি ভারী জাহাজের তলদেশে ধাক্কা লেগে পাইপ ফেটে গিয়েছিল। আর কে-৯
টাইপের পাইপ দিয়েই সব জায়গায় পানি সরবরাহ করা হয়। সব জায়গায় যেটা ব্যবহার
করা হয়, এখানেও সেটাই ব্যবহার করা হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, দুই হাজার মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ থেকে পানি সরবরাহ
লাইনে ঢুকলেও কোনো সমস্যা হবে না। কনসালট্যান্ট যেভাবে বলেছে, সেভাবেই কাজ
করা হয়েছে। কাজও মোটামুটি শেষ।
এদিকে পানির খনি পাওয়ার কথা বলে ২০১২ সালের জুন মাসে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ও
ভাকুর্তা এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য ভাকুর্তা-তেঁতুলঝোড়া ওয়েলফিল্ড
প্রকল্প হাতে নেয় ওয়াসা। এ জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫৭৩ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের
আওতায় ৪৬টি পাম্প, পাম্পের পানি শোধনে দুটি আয়রন অপসারণ প্লান্ট, একটি
ভূ-উপরিস্থ জলাধার, একটি অফিস ভবন এবং ৪২ কিলোমিটার পানি সরবরাহ লাইন
স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখান থেকে উত্তোলিত পানি মিরপুর এলাকায়
সরবরাহ করা হবে। প্রতিদিন পাওয়া যাবে ১৫ কোটি লিটার পানি। ২০১৬ সালের মধ্যে
প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ওয়াসা তা পারেনি। দুই দফা সময় বাড়ানো
হয়। কিন্তু কয়েকটি পাম্প চালুর পরই আশপাশের সাধারণ টিউবওয়েলগুলোতে পানি
তোলা বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ১৫টি পাম্প চালু করে প্রকল্পের কাজ শেষ করে
ঢাকা ওয়াসা। গত জানুয়ারি মাসে প্রকল্পটি ওয়াসাকে বুঝিয়ে দেয় কোরিয়ান
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রটেন। কাজের মধ্যে মধ্যে বিল নেওয়ার পাশাপাশি
প্রকল্প বুঝিয়ে দেওয়ার পর বাকি বিলও ওয়াসা থেকে তুলে নেয় তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাভারের হেমায়েতপুর থেকে পশ্চিম-দক্ষিণ দিকের সড়কটি
ধরে কিছুদূর এগোলেই প্রায় ফাঁকা মাঠের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি পাম্প।
কিছু পাম্প পাইলিং করে রাখা হয়েছে। সেগুলোর পাইলিংয়ের পাইপগুলো কৃষিজমির
ভেতরে খাড়া হয়ে আছে।
ওয়াসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ রকম সাতটি নলকূপ পাইলিংয়ের পর এভাবে পড়ে
আছে। একেকটির পাইলিংয়ে খরচ হয়েছে ৭০ লাখ টাকা। সেখানে পাম্প বসালেও পানি
উঠবে না- এ কারণেই এগুলোর কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। বাকি ১৫টি নলকূপ চালু করা
হয়েছে। অন্যগুলোর অবকাঠামো তৈরির পর সেগুলো বন্ধ আছে। এ প্রকল্পের সঙ্গে
সম্পৃক্ত এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, একটি পাম্পের স্পেসিফিকেশন গ্রাফিটি
(পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর বা সক্ষমতা নির্দেশক সূচক) তিন দশমিক ৭৫ হলে
মানসম্মত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। তবে ভাকুর্তা-তেঁতুলঝোড়া প্রকল্পের
পাম্পগুলোর স্পেসিফিকেশন গ্রাফিটি পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক
শূন্যর মধ্যে। যে কারণে বেশিরভাগ পাম্প চলে না। এ অবস্থায় ওয়াসা প্রকল্পটি
বুঝে নিয়েছে এবং ঠিকাদারকে ধাপে ধাপে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কিছু কাজ বাকি আছে।
তবে সেটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করে দেবে। এ জন্য তাদের জামানতের টাকা রাখা
আছে। দুই বছর তারা মেইনটেন্যান্স করবে। এ সময়ের মধ্যে কাজ করে না দিলে
তাদেরই লোকসান হবে। যে পাম্পগুলোর কাজ বাকি আছে, সেগুলোও তারা করবে। তবে
স্পেসিফিকেশন গ্রাফিটি-৫ পাওয়া গেছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, আশপাশে পানি
সংকট সৃষ্টির বিষয়টি সরকার চাইলে অন্যভাবে সমাধান করতে পারে। পাইপলাইনের
মাধ্যমে ওই এলাকায় পানি সরবরাহ করতে পারে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে
কয়েকটি জায়গায়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন।
এ দুটি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এ দেশীয় এজেন্ট হিসেবে ছিলেন
আজিজুল আকিল ডেভিড নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে তিনি
কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
- বিষয় :
- ঢাকা ওয়াসা
