রক্তাক্ত ৬ মার্চ: বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বুকে এক ক্ষতচিহ্ন
সুকান্ত দাস
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০ | ১০:৫১ | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২০ | ১২:১৮
১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বুকে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিন রাত ১টা ১০ ও ১টা ১৭ মিনিটে বাঙালি সংস্কৃতির চেতনাবিরোধী হায়েনাদের পেতে রাখা দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে ঝরে যায় গান পাগল ১০টি তাজা প্রাণ। আহত হয় আরও প্রায় দেড় শতাধিক সংস্কৃতিপ্রেমী। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অঙ্গহানি ঘটে। একথা আমরা সবাই জানি। আমরা সবাই জানি সেদিন সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর গভীর রাতে শহরের বিভিন্ন পাড়া – মহল্লার মসজিদের মাইক থেকে আহতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। সমগ্র যশোরবাসী সেই রাতে জেগে উঠেছিল আর্তমানবতার সেবায়। পরদিন সকালে শহরের ফুল ব্যবসায়ীরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে কালো কাপড়ে ”এই শহরে ফুল বিক্রি করতে আমাদের ঘৃণা হয়” লিখে তাদের দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। আমাদের হয়তো এখনো মনে আছে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনসহ সকল প্রগতিশীল গণআন্দোলনের পীঠস্থান এই যশোরবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেদিন যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে, বিচলিত না হয়ে আরো দৃঢ়তার সাথে পরদিন থেকেই সেই ভাঙ্গাচোরা মঞ্চে দিনের পর দিন প্রতিবাদী গান, কবিতা, নাটক পরিবেশন করে গিয়েছে। একজন উদীচী কর্মী হিসেবে, সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে এই আবহে, এই পরিবেশে বেড়ে উঠেছি। এই চেতনাকে ধারণ করেই দিনে দিনে নিজেকে তৈরি করেছি।
মাত্র ২১ বছর। এই ২১ বছরে সেদিনের সেই চেনা–জানা প্রিয় যশোরের সবকিছু কেমন যেন আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে গেছে। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যাদেরকে দেখে পথচলা শিখেছি সেই মানুষগুলো পর্যন্ত। শুধু যশোর কেন, সারা দেশেরই প্রায় একই অবস্থা। যে সমস্ত মানুষগুলোর নাম শুনলে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেত অদ্ভূত শিহরণে, শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যেত, তাদের বেশিরভাগই আজ মুক্ত বিহঙ্গ থেকে স্বেচ্ছা খাঁচায় বন্দি পাখি হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে তারা এখন আর যেতে পারেন না। শেখানো বুলির বাইরে কিছু বলতে সংকোচ বোধ করেন। আর তাইতো এই ২১ বছরে আমাদের ক্ষতে কোনো প্রলেপ পড়েনি বরং ক্ষত আরো দগদগে হয়েছে।
বিগত ২১ বছরে সারাদেশের ন্যায় যশোরেও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। প্রতিদিনই একাধিক স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে। যদিও চেতনাহীন, বোধহীন অনুষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। প্রতিনিয়ত যত্রতত্র নতুন নতুন ব্যানার সর্বস্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন গজিয়ে উঠছে। সাংস্কৃতিক নেতা হওয়াটা এখন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়া যেমন বড় বড় ব্যবসায়ী, পুঁজিপতিদের দখলে চলে গিয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু সুবিধাবাদি মানুষ সামাজিকভাবে স্বচ্ছ ইমেজধারী, সংস্কৃতিপ্রেমী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদেরকে জাহির করার জন্য নামকাওয়াস্তে সাংস্কৃতিক সংগঠন খুলে বসছেন। অঢেল টাকা পয়সা খরচ করে, বড় বড় প্যান্ডেল সাজিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভিআইপিদের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত সাংস্কৃতিক কর্মীদের হটিয়ে অল্পদিনেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কেউকেটা বনে যাচ্ছেন। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ব্যানারের মূল নেতৃত্বে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। যার ফলাফল, শত শত সাংস্কৃতিক সংগঠন, হাজার হাজার সাংস্কৃতিক কর্মী থাকা সত্ত্বেও, তুলনামূলক অধিক সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ঠুটো জগন্নাথ হয়ে পড়ে আছে। এই আন্দোলনও আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। প্রশাসনের তোষামোদি আর সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তির বাইরে বের হতে পারছেন না বেশিরভাগ সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ। এটা যেমন বাঙালি জাতির জন্য তেমনি বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশের পথে এক বড় অশনি সংকেত।
উদীচী হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পার হলেও এই মামলা আজও আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে মামলাটি কি অবস্থায় আছে, আদৌ সেটি চালু আছে কিনা সেটাও অজানা। ২১ বছর ধরে আহত নিহতদের পরিবার, যশোর সহ সমগ্র দেশবাসীর আবেদনে কোনো সরকারই সাড়া দেয়নি। তাই একথা বলতে আজ আর কোনো দ্বিধা নেই যে, সরকার চায়নি তাই আজও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। সরকার যেদিন সত্যি সত্যিই চাইবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক সেদিই বিচার হবে, তার আগে নয়।
সরকার চেয়েছিল বলেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার হয়েছে। সরকার চেয়েছিল বলেই গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম হয়েছিল, মৃত্যুও হয়েছে সরকারের চাওয়াতেই। সরকার চেয়েছিল বলেই একাত্তরের নরঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। সরকার চায়নি তাই সাঈদী এখনো ফাঁসির বদলে কারাগারে বসে মুরগি পোলাও খায়। সরকার চেয়েছিল বলেই হেফাজতিদের জ্বালাও পোড়াও রাতের মধ্যেই বধ হয়েছিল। সরকার চেয়েছে বলেই হেফাজতিরা এখন সরকারের কোলে বসে দুধ-ভাত খাচ্ছে। মোদ্দাকথা সরকার যখন যা চাইবে তখন তাই হবে, না চাইলে নয়।
কিন্তু সরকারকে যদি চাওয়ানো যায়, আমাদের চাওয়াটাকে যদি সরকারের চাওয়াই রূপ দেওয়া যায়, তাহলে কেমন হয়? এটা কি সম্ভব নয়?
অবশ্যই সম্ভব। আমরা যদি সেই ২১ বছর আগে ফিরে যেতে পারি, যেখানে মন্দির-মসজিদ থেকে আহ্বান আসে আর্তমানবতার সেবার পক্ষে, জাতি ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য লালনের পক্ষে। যেখানে উদার, মুক্তচিন্তার, সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষগুলো নিজেদেরকে একে অপরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে , দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে সকল ধর্ম ব্যবসায়ী, দেশদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। তাহলেই সম্ভব আমাদের চাওয়াটাকে সরকারের চাওয়াই রূপ দেওয়া।
এমনই একটা সুযোগই করে দিয়েছিল হায়েনার দল ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ উদীচী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতির ওপর আঘাত হেনে। আমরা সাংস্কৃতিক কর্মীরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি। এই হত্যাকাণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের বন্ধন আরো দৃঢ় করার পরিবর্তে বিপরীত দিকেই ঝুকেছি বেশি। ক্ষুদ্র স্বার্থে নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি, ছোট ছোট উপদলে বিভক্তি প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্রকারীদের হাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি বানিয়ারচরের গীর্জায়, সাতক্ষীরার গুড় পুকুরিয়ার মেলায়, ময়মনসিংয়ের সিনেমা হলে বোমা হামলায়। পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, সিপিবির সমাবেশে, নেত্রকোনা উদীচীতে, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলাসহ সারাদেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি বেছে বেছে দেশের প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকাশক, ব্লগারদেরকে হত্যার মাধ্যমে।
এত এত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পরও এদেশের কোনো সরকার এই ২১ বছরে উদীচী হত্যাকাণ্ডের কোন কূল কিনারা করতে পারলো না। বিচারের বাণী আজও নিভৃতেই কেঁদে ফেরে। দীর্ঘ ২১ বছর পর আজও এই টাউন হল ময়দানে একান্তে দাঁড়ালে সেদিনের সেই মধ্যরাতের ভয়াবহতা স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে। মনে হয়, এখনো এখানে মধ্যরাত; বিচারের দাবিতে এখনো প্রতিনিয়ত এখানকার আকাশ বাতাস ভারী করে তোলে সেইসব খণ্ড বিখণ্ড মানুষের আর্তনাদ।
লেখক: সাংস্কৃতিক কর্মী
- বিষয় :
- সাংস্কৃতিক আন্দোলন
- উদীচী হত্যাকাণ্ড
