করোনার পূর্বসূরী : ইতিহাসে মহামারি
নিশাত জাহান রানা
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১০:৫২ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৩৩
২০১৯-এর শেষপ্রান্তে যখন চীনে কোভিড ১৯-এর সূচনা ঘটে, তখন অনুমান করা যায়নি যে অচিরেই এই করোনা নামের ভাইরাসটি পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির পায়ের নিচের মাটি টলিয়ে দেবে। ১২ মার্চ ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক মহামারি (Pandemic) ঘোষণা দেয়ার পরও পৃথিবীর অনেক দেশই এই ভাইরাসকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। সাধারণ সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ নিয়ে করোনা ভাইরাস মাত্র ৩ মাসের মধ্যে দুই শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ ছিনিয়ে নেবে- চন্দ্রবিজয়োত্তরকালের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিনে এটা মেনে নেয়া সত্যি কষ্টকর। বিশেষত ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডার মতো দেশকে এই ভাইরাস সামাল দিতে এতোটা বিপর্যস্ত হতে দেখে সমগ্র পৃথিবী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। নিঃসন্দেহে এই আতঙ্ক জয় করে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষকে মোকাবেলা করতে হয়েছে বিবিধ ধরনের মারণব্যাধিকে।
ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত অথবা এখনো অজানা কারণে সংঘটিত মহামারি পৃথিবীতে নতুন নয়। তবে, প্রতি ১০০ বছর পর পরই যে এরকম মহামারি ঘটছে- তাও সত্য নয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে হঠাৎ মানুষের হিংস্রতার প্রতিশোধ নিতে বিশ্বপ্রকৃতি এই করোনা ভাইরাস পাঠিয়েছে- ইতিহাস জানা থাকলে সে কথাও মান্য করা মুসকিল! প্রকৃতি ও মানবপ্রজাতি পরস্পর পরস্পরের প্রতি হিংস্রতা প্রদর্শন করে যেমন, মায়াও তেমনি কিছু কম প্রদর্শন করে না। একথা না মেনে তো উপায় নেই যে, মানুষ প্রকৃতিরই সন্তান। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, ইতালি বা চীন, ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকা বহুবারই ভয়ঙ্কর মহামারির শিকার হয়েছে। মহামারি ফিরে ফিরে এসেছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে- নানাররুপে, নানাভাবে। পাশাপাশি, ধ্বংসের ভেতর থেকে ফিনিপের মতোই মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছে বারবার। করোনা-কম্পিত সময়ে তাই সবার জন্য উপস্থাপন করছি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ কয়েকটি মহামারির সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
১। প্রাগৈতিহাসিক কালের মহামারি : খৃষ্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০০ বছর
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ধারণা করা হয় যে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে চীনের এক প্রাগৈতিহাসিক গ্রাম মহামারিতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। সেই মহামারিতে ঐ এলাকার আক্রান্ত মানুষদের মৃতদেহ একটা বাড়ির মধ্যে স্তুপ করে রেখে পরে অগ্নিদগ্ধ করা হয়। এরমধ্যে শিশু-কিশোর-তররুণ-বৃদ্ধ সকলের কংকালই পাওয়া গেছে। চীনের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের এই সযত্নে সংরক্ষিত প্রত্নএলাকাটির নাম 'হামিন মান্ঘা' (Hamin Mangha)। প্রত্নতাত্বিক এবং নৃতাত্বিক গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, এতো দ্রুত এবং ভয়ঙ্করভাবে এই মহামারিটি সংঘটিত হয়েছিলো যে মৃতব্যক্তিদের যথাযথ সৎকারের সময়ও পাওয়া যায়নি। এলাকাটিকে পরবর্তীকালে আর বসবাসযোগ্যও করা হয়নি। 'হামিন মান্ঘা' আবিস্কৃত হওয়ার আগে, চীনের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে 'মিয়াওজিজৌ' (Miaozigou) নামের প্রায় একই সময়ের আরেকটি প্রাগৈতিহাসিক গণকবর খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুটো গণকবর আবিস্কার থেকে ধারণা করা হয় যে, একই সংক্রামক মারণব্যাধি দ্বারা সংঘটিত মহামারিতে একইসময়ে ওই এলাকাগুলো নিশ্চিহ্ন হয়েছিলো।
২। এথেন্সের প্লেগ : খৃষ্টপূর্ব ৪৩০ (Plague of Athens)
প্রাচীন এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরই এথেন্স এক মহামারির কবলে পড়ে। এটা আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৪৩০ বছর আগের কথা। এথেন্সের নিকটবর্তী বন্দর নগরী পিরাইয়ুস ছিল খাদ্য এবং অন্যান্য রসদ আনার একমাত্র পথ। এই পথেইপ্লেগের আগমন ঘটেছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐতিহাসিকের মতে, এই মারণব্যাধি ইথিওপিয়া থেকে মিসর ও লিবিয়া হয়ে গ্রীসে প্রবেশ করে এবং বিস্তৃত ভূমধ্যসাগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ নতুন এই রোগ সম্পর্কে চিকিৎসকদেরও কোনো ধারণা ছিল না। ফলে রোগীর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে অনেক চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেন। ঘনবসতিপূর্ণ এথেন্সের প্রায় ২৫ভাগ অধিবাসী আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এথেন্সের নেতা, বীর পেরিক্লিসও এই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। চারিদিকে কেবলই দাহকার্যের আগুন চোখে পড়ায় রোগাক্রান্ত শত্রুর সংস্পর্শের ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য স্পার্টানরা কিছুকাল নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে রাখে। প্রায় ৫ বছর স্থায়ী এই মহামারিতে আনুমানিক ৭৫০০০ থেকে ১ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। এই মহামারির লক্ষণ ছিল- আকস্মিকভাবে মাথা অত্যন্ত গরম হয়ে যাওয়া, চোখ রক্তবর্ণ হওয়া এবং প্রচ- জ্বালা করতে থাকা। এছাড়া, শরীরের ভেতরদিকের কিছু অংশে, যেমন গলার ভেতর বা জিহ্বা রক্তবর্ণ হওয়া এবং অস্বাভাবিক ও দুর্গন্ধময় শ্বাস-প্রশ্বাস হতে থাকা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মহামারি নিয়ে গবেষণা করছেন। এর পেছনে অনেক অসুখের সমন্বিত আক্রমণ থাকতে পারে-এমন ধারণা আছে- যার মধ্যে বিশেষ করে টাইফয়েড এবং ইবোলাও (Ebola) আছে।
৩। আন্তোনাইন প্লেগ : ১৬৫-১৮০ খৃষ্টাব্দ (Antonine Plague)
সৈনিকরা পশ্চিম-এশিয়া, তুরস্ক, মিশর অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রোম সাম্রাজ্যে এই মহামারিটি বহন করে এনেছিলো বলে ধারণা করা হয়। গ্রীক চিকিৎসক গ্যালেন তখন রোমে বাস করছিলেন এবং তিনিই এটার বিবরণ দিয়েছিলেন বলে তার নামেও এই মহামারি 'প্লেগ অব গ্যালেন' হিসেবে চিহ্নিত। যদিও প্রকৃত তথ্য এখনো অনাবিস্কৃত বলেই ধরে নেয়া হয়, তবু গবেষকরা একে জলবন্ত বা হাম বলেও অনুমান করেন। মনে করা হয় যে, রোমান সম্রাট লুসিয়াস ভেরু ১৬৯ খৃষ্টাব্দে এই রোগে মারা যাওয়ার ৯ বছর পর এই মহামারি পুনরায় দেখা দেয়। তখন রোমে একদিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যন্ত মানুষ মারা গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই মহামারি প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় বলে অনুমান করা হয়। কোনো কোনো এলাকার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। রোম সাম্রাজ্য যখন ক্ষমতার তুঙ্গে এই মহামারিটি তখন ঘটে। এতে রোমান সৈন্যবাহিনী ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো।
৪। সাইপ্রিয়ানের প্লেগ : ২৫০-২৭১ খৃষ্টাব্দ (Plague of Cyprian)
মোটামুটি ২৪৯ থেকে ২৬২ খৃষ্টাব্দে সংঘটিত এই মহামারিকালে রোমান সাম্রাজ্য একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলো। ধারণা করা হয় যে, এই প্লেগে মৃত্যুর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিলো। তিউনিসিয়ার কার্থেজ নগরীর বিশপ সেইন্ট সাইপ্রিয়ানের নামে এই মহামারির নামকরণ হয়েছে 'সাইপ্রিয়ানের প্লেগ'। তিনি এই মহামারির প্রত্যক্ষদর্শী এবং এর বিবরণ রেখে গেছেন। মহামারির ভয়াবহতা দেখে তিনি বলেছিলেন- এই প্লেগে পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। জানা যায়, কেবল রোমেই নাকি একদিনে ৫০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। যদিও ঠিক কোন রোগ থেকে এই মহামারি ঘটেছিলো, তা এখনো নিশ্চিতভাবে আবিস্কৃত হয়নি; তবে গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যে, এর লক্ষণগুলির মধ্যে ছিলো জলবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো প্রচণ্ড ক্ষতিকারক জ্বর। তাছাড়া লাগাতার ডায়রিয়া এবং ভেতরে একধরনের দহন সৃষ্টি হয়ে মুখের ভেতর ক্ষত তৈরি হতো। খুব সম্প্রতি, ২০১৪ সালে, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই প্লেগের শিকার মানুষদের এক বিশাল গণকবর আবিস্কার করেছেন।
৫। জাস্টিনিয়ানের প্লেগ : ৫৪১-৫৪২ খ্রিষ্টাব্দ (Plague of Justinian)
বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান-এর আমলে (৫২৭-৫৬৫) এই প্লেগের শুরু। তাঁর সময়েই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করে। রাজধানী কনস্টানটিনোপলে (বর্তমান ইস্টত্মান্বুল) জাস্টিনিয়ান 'হাজিয়া সোফিয়া' নামের সুবিশাল ক্যাথেড্রাল নির্মাণ করেন। জাস্টিনিয়ান নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন; যদিও তিনি আরোগ্যলাভ করেন। তার নামেই এই মহামারির নামকরণ হয়েছে। এই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য খর্ব হতে থাকে। বলা হয়, এই প্লেগ দিয়ে বাইজেন্টিয়াম সভ্যতার ধ্বংসের শুরু। এই প্লেগ শতাব্দি জুড়ে বারে বারে ফিরে এসেছিল। কোনো কোনো হিসেবে পৃথিবীর প্রায় ১০ ভাগ মানুষ এই মহামারিতে মৃত্যুবরণ করে।
৬। কৃষ্ণমৃত্যু : ১৩৪৬-১৩৫৩ (The Black Death)
ধ্বংসচিহ্ন এঁকে এঁকে কৃষ্ণমৃত্যু যেন পরিভ্রমণ করেছিলো এশিয়া থেকে ইউরোপ। ১৩৪৭-এর অক্টোবর মাসে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির মেসিনা প্রদেশের সিসিলিয়ান বন্দরে ভিড়লো ১২টি জাহাজ। বন্দরে উপস্থিত লোকজন হতভম্ব হয়ে দেখলো জাহাজের নাবিকেরা প্রায় সকলেই মৃত। যারা তখনো জীবিত আছে, তাদের শরীরে কালো কালো ফোঁড়া। তা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত আর পুঁজ। সিসিলি কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জাহাজগুলিকে বন্দরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলো। কিন্তু ততক্ষণে যা বিলম্ব হওয়ার তা হয়েছে। কোনো কোনো হিসেবে এই বৈশ্বিক মহামারি চতুর্দশ শতকে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক (আনুমানিক ২ কোটি/২০ মিলিয়ন) জনসংখ্যাই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। যারসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) নামের এক ব্যাকটেরিয়া ছিল এর মূলে- যা এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলেই গবেষকদের ধারণা। এই ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। মৃতদের স্থান হয়েছিলো গণকবরে। প্রায় ৪ শতাব্দী ধরে ফিরে ফিরে আসা কৃষ্ণমৃত্যুর এই দীর্ঘ পর্যায় ইউরোপের ইতিহাসের বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। এই বিপুল মৃত্যুর পর কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠেছিল। ফলাফল হিসেবে শ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং সম্ভবত কারিগরী আবিস্কারের প্রণোদনাও তৈরি হয়।
৭। কোকোলিজৎলি মহামারি : ১৫৪৫-১৫৪৮ (Cocoliztli epidemic)
মেপিকো এবং মধ্য আমেরিকার ১.৫ কোটি (১৫ মিলিয়ন) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো এই মহামারিতে। এটা ছিল একধরনের হেমোরেজিক ফিভার। এমনিতেই মহামারির আগে থেকেই এই অঞ্চলে চূড়ান্ত দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ ছিল বিপর্যস্ত; তার ওপর এই রোগ একেবারে ধ্বংস ডেকে আনে। এই মহামারির শিকার মৃতমানুষের ডি এন এ পরীক্ষা করে খুব সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে যে, Salmonella নামের এক ব্যাকটেরিয়ার উপগোত্র Salmonella paratyphi C থেকে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছিলো। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রা বা টাইফয়েড, জলশুন্যতা বা ডিহাইড্রেশন এবং পেটের পীড়া অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এইসব সমস্যা আজও বড়ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে থেকে গেছে।
৮। আমেরিকান প্লেগ : ষোড়শ শতাব্দি (American Plagues)
ইনকা এবং এ্যাজটেক সভ্যতা ধ্বংসের পেছনে এই মহামারির গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপ থেকেই জলবন্তসহ একগুচ্ছ মারণরোগের আমেরিকায় অভিযান ঘটেছিলো এই মহামারিকালে। কোনো কোনো হিসেবে বলা হয় যে, পশ্চিম গোলার্ধের প্রায় ৯০ ভাগ আদিবাসী এতে নিশ্চিহ্ন হয়। ১৫১৯ এবং ১৫৩২ সালে দুইদফায় স্পেনীয় সেনাঅভিযানের মাধ্যমে যথাক্রমে এ্যাজটেক এবং ইনকা সাম্রাজ্য বেদখল হয়। এই দুই যুদ্ধেই এ্যাজটেক এবং ইনকা সৈন্যবাহিনী পরাভূত হয় মূলত মারণরোগে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে পরবর্তীতে বৃটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদের এসব এলাকায় বসত গড়ে তোলা সহজ হয়।
৯। লন্ডনের বৃহৎ প্লেগ : ১৬৬৫-১৬৬৬ (Great Plague of London)
কৃষ্ণমৃত্যুর শেষ ধাক্কায় রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নেতৃত্বে বিশালসংখ্যক মানুষ লন্ডন থেকে অভিবাসনে চলে গিয়েছিলো। ১৬৬৫ সালের এপ্রিলে যে পেস্নগ শুরু হয়েছিলো, তার সংক্রমণ ঘটানোর পেছনে প্লেগ-আক্রান্ত ইঁদুরেরই ভূমিকা ছিল প্রধান। বছরখানেকের মধ্যেই লন্ডনের ১৫ ভাগ অধিবাসীসহ মোট প্রায় ১০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। প্লেগের পাশাপাশি দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৬৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ৪ দিনব্যপী এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়, যার ফলে নগরের এক বৃহৎ অংশ ভস্মীভূত হয়।
১০। মার্সাইয়ের বৃহৎপ্লেগ : ১৭২০-১৭২৩ (Great Plague of Marseille)
পূর্ব-ভূমধ্যসাগর থেকে গ্র্যান্ড সেইন্ট আন্তোয়েন নামের এক পণ্যবাহী জাহাজ ফ্রান্সের মার্সাই বন্দরে নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় এই ভয়াবহ প্লেগ। যদিও জাহাজটিকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছিলো, কিন্তু তারমধ্যেই ইঁদুরবাহিত প্লেগ শহরে ঢুকে পড়ে। এই প্লেগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং পরের তিন বছরে মার্সাইয়ে এবং আশেপাশের এলাকার প্রায় ১০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এরমধ্যে মার্সাইয়ের জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মানুষ ছিল। ইউরোপে কৃষ্ণমৃত্যুর এটাকেই সর্বশেষ পর্যায় বিবেচনা করা হয়।
১১। রাশিয়ার প্লেগ : ১৭৭০-১৭৭২ (Russian plague)
রাশিয়ার এই মহামারির সময় খুব ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনা ঘটেছিলো। প্লেগ-জর্জরিত মস্কোয় কোয়ারেন্টাইনে রাখা অধিবাসীরা প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা শুরু করে। শহরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কেউ কোনো নির্দেশ মান্য করছিল না। পরিস্থিতি এমন ভয়ানক হয়ে ওঠে যে, আর্চবিশপ এ্যামব্রোসিয়াস যখন প্রার্থনার জন্য সমাবেশ করতে নিররুৎসাহিত করলেন, তখন উন্মত্ত জনতা তাকে হত্যা করে। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথেরিন (ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট) জনশৃংখলা ফিরিয়ে আনা ও প্লেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মরিয়া হয়ে আদেশ জারি করলেন যে সব কারখানা মস্কো থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এই মহামারিতে প্রায় ১০০০০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিলো।
১২। ফিলাডেলফিয়ার হরিদ্রা জ্বর : ১৭৯৩ (Philadelphia yellow fever epidemic)
তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ফিলাডেলফিয়ায় যখন হরিদ্রা জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভ্রান্তিবশত বিশ্বাস করেছিলো যে, দাসদের এই রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। ফলে, অসুস্থদের সেবার জন্য নার্স হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিলো আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের। এই রোগ মশাবাহিত এবং তার দ্বারাই সংক্রামিত। সে বছরে গরমকালের আবহাওয়ায় ফিলাডেলফিয়ায় যেন মশার চূড়ান্ত প্রজনন ঘটেছিলো। শীতের আগমনে মশাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এই মহামারি অব্যাহত ছিল। তখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
১৩। বৈশ্বিক মহামারি ফ্লু : ১৮৮৯-১৮৯০ (Flu pandemic)
এই ফ্লুতে প্রথম আক্রান্তের খবর পাওয়া যায় রাশিয়ায়। সেন্ট পিটার্সবুর্গে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিলো এই ভাইরাস। যদিও পৃথিবীতে তখন পর্যন্ত্ম আকাশপথে যাতায়াত শুরু হয়নি, তবু মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে ইউরোপ এবং সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এই ফ্লু। ৫ সপ্তাহের মধ্যে মহামারিটি চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষ) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো।
১৪। আমেরিকান পোলিও : ১৯১৬ (American polio epidemic)
আজকাল সকল শিশুকে পোলিওর টিকা খাওয়ানো বাধ্যতামূলক করা হলেও ১০০ বছর আগে এটি ছিল এক ভয়াবহ ব্যাধি যার কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। পোলিও মুলত শিশুদেরই হয় এবং কখনো কখনো শিশুর শরীরে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা রেখে যায়। ১৯১৬ সালে নিউইয়র্কে ২৭০০০ শিশু পোলিও আক্রান্ত হয় এবং সমস্টত্ম যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০০ মৃত্যু ঘটে। ১৯৫৪ সালে সাল্ক ভ্যাকসিন আবিস্কার হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝে মাঝেই এই রোগ দেখা যেতো। যদিও পোলিও এখনো নিশ্চিহ্ন হয়নি, তবে ভ্যাকসিন আবিস্কারের পর থেকে পৃথিবীতে এই রোগের হার একেবারেই কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ পোলিও আক্রান্তের তথ্য পাওয়া যায় ১৯৭৯ সালে।
১৫। স্প্যানিশ ফ্লু : ১৯১৮-১৯২০ (Spanish Flu)
স্প্যানিশ ফ্লুকে ভয়াবহতম বৈশ্বিক মহামারি বলা যেতে পারে। দক্ষিণ সাগর থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন/৫০ কোটি মানুষ স্প্যানিশ ফ্লুর শিকার হয়েছিলো। এরমধ্যে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৫০ মিলিয়ন (৫ কোটি)। অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে চলে যায়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সুস্থ কিংবা দুর্বল সকলেই এই ফ্লুর শিকার হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে এই মহামারির সূচনা। ঐতিহাসিকদের ধারণা যে, যুদ্ধকালে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে সৈন্যরা যখন অত্যন্ত নোংরা এবং আর্দ্র পরিবেশে থাকতে বাধ্য হলো এবং খাদ্যাভাবে প্রচন্ড অপুষ্টির শিকার হলো তখন তাদের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তখনি তারা এই ভাইরাসের শিকার হয়। যদিও ৩ দিনের মধ্যে অনেকে সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু অনেকেই সুস্থ হয়নি। সৈনিকেরা নিজ দেশে ফিরে আসার পরই দ্রুত শহর-গ্রাম-জনপদে ছড়িয়ে পড়ে এই ফ্লু।
এই ফ্লু'র সঙ্গে স্পেনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথম মহাযুদ্ধে স্পেন ছিল নিরপেক্ষ অবস্থায়। তাদের সংবাদমাধ্যম ছিল স্বাধীন। যুদ্ধকালীন সংবাদ তারা নিরপেক্ষভাবেই প্রকাশ করতো। তারাই প্রথম এই ফ্লুর সংবাদ পরিবেশন করে। সে কারণে এই ফ্লুর নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু।
১৬। এশিয়ান ফ্লু : ১৯৫৭-১৯৫৮ (Asian Flu)
এটাও ইনফ্লুয়েঞ্জাভিত্তিক বৈশ্বিক মহামারি। চীন থেকে উদ্ভূত এই মহামারিতে প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষাধিক) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলো ১১৬০০০ মানুষ। এভিয়ান ফ্লু গোত্রের সমন্বিত ভাইরাসের আক্রমণে সংঘটিত এই মহামারি খুবই দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিলো। ১৯৫৭-এর ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে, এপ্রিলে হংকংয়ে এবং তারপরই যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র-উপকূলীয় নগরগুলিতে এটা ছড়িয়ে পড়ে।
১৭। এইডস : ১৯৮১ থেকে বর্তমান (AIDS pandemic and epidemic)
বিংশ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে এসে এইডস (Acquired Immune Deficiency Syndrome-AIDS) বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিলেও এর প্রারম্ভে ১৯২০ সালে। যতদূর জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকায় এক শিম্পাঞ্জি ভাইরাস থেকে মানবদেহে স্থানান্তরণের মাধ্যমে এইডস-এর মূল ভাইরাস এইচআইভির [Human immunodeficiency virus (HIV)] উৎপত্তি। এই ভাইরাস চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে ৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এখন আক্রান্ত্মদের প্রায় ৬০ ভাগই সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের অধিবাসী। দীর্ঘকাল এই ভাইরাসের প্রতিষেধক ছিল না। তবে ১৯৯০ থেকে একধরনের নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে অসুস্থতা নিয়েও আক্রান্তব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে। ২০২০ সালে আরো কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
১৮। H1N1 সোয়াইন ফ্লু : ২০০৯-২০১০ (H1N1 Swine Flu pandemic)
২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু প্রথম মেপিকোয় চিহ্নিত হয়। এটা GUv H1N1 গোত্রের একটা নতুন ভাইরাস। দ্রুতই সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস, এবং মাত্র একবছরে ১.৪ বিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়। আনুমানিক ১৫১৭০০ থেকে ৫৭৫৪০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই ভাইরাসের প্রধান শিকার হয়েছে শিশু এবং তরুণরা। ৮০ ভাগ মৃত্যুই ঘটেছে ৬৫ বছর বয়সের নিচের জনসংখ্যায়। যদিও ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক, কারণ বেশিরভাগ ফ্লু ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রধান মৃত্যুহার ৬৫-উর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যেই ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে যে, ৬৫-উর্ধ্ব বয়সীরা সম্ভবত H1N1 গোত্রের অন্যান্য ভাইরাস-প্রতিরোধী শক্তি অর্জন করে ফেলায় সো্য়াইন ফ্লু আর তাদেরকে খুব কাবু করতে পারেনি। এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে।
১৯। পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা : ২০১৪-২০১৬ (West African Ebola epidemic)
১৯৭৬-এ প্রথম সুদান ও কঙ্গোয় ইবোলার প্রকাশ ঘটে। অনুমান করা হয় যে ভাইরাসটি বাদুড় থেকে এসেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় ২৮৬০০ জন ইবোলা ভাইরাস আক্রান্ত হয় এবং ১১৩২৫ জন মৃত্যুবরণ করে বলে জানা যায়। ২০১৩-এর ডিসেম্বরে আক্রমণ হয় গিনিতে। এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিয়নে। মূলত এই তিন দেশই ইবোলার প্রধান আক্রমণক্ষেত্র। তবে আরো কিছু মানুষ আক্রান্ত্ম হয় নাইজেরিয়া, মালি, সেনেগাল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। ইবোলার ভ্যাকসিন আবিস্কারের কাজ চলছে।
২০। জিকা ভাইরাস : ২০১৫ থেকে বর্তমান (Zika Virus epidemic)
জিকা ভাইরাস শিশু কিংবা বয়স্ক কারো জন্যই তেমন ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এই ভাইরাস ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে মায়ের জঠরে থাকা এখনো জন্ম নেয়নি যে শিশু-তার। উষ্ণ এবং আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে বলে ভাইরাসটি মাতৃগর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করে বেশি। জিকা ভাইরাসের আক্রমণে নানাধরনের বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নেয় নবজাতক। এটা সাধারণত মশাবাহিত তবে যৌনসংক্রমণও ঘটে। এইডস গোত্রের মশাই এই জিকা ভাইরাস বহন করে। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় জিকা মহামারি আকার ধারণ করার আগে তেমন করে এর খবর পাওয়া যায়নি। মূলত আমেরিকায়ই এখনো জিকার চলাচল।
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে পৃথিবীব্যাপী মহামারির তরঙ্গ প্রবহমান রয়েছে। এ প্রবহমানতার শেষ কোথায় তা এখনো বলা সম্ভব হয়নি। হয়তো কখনোই বলা সম্ভব হবে না, কারণ বিশ্বপ্রকৃতির লক্ষ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে চেনা কবে শেষ হবে কে জানে! তবে এইসব মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অন্ত্মত সতর্কতা অবলম্বনে তো কিছুটা সচেতন ও সক্রিয় হতে পারি। মহামারির ভয়াবহ আতংকের দিনে পূর্বে যেসব সামাজিক অস্থিরতা-অসচেতনতা ঘটেছে আজ আবারও সেসবের পুনরাবৃত্তি থেকে তো নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি! তাহলে অন্তত মহামারির ধ্বংসযজ্ঞকে সামাল দেয়া কিছুটা সহজ হবে।
