কভিড-১৯ ও ফাইভজি গুজব
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২০ | ০১:৩২ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
দুনিয়াতে এখন পর্যন্ত যে কয়েকটা ভাইরাসের আনা গোনা তার মধ্যে করোনাভাইরাসাই সবচেয়ে ‘রহস্যময়’। এর উৎস এখনও অজানা। উৎস নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি বলেই হয়তো করোনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। অন্ধ বিশ্বাস সবকিছু নিয়েই কিছু ভীতি, গুজব সব সময়ই ছড়ায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে উৎসাহী একটি মহলও এবার সেই গুজবে বেশ জোরেশোরে বাতাস দিচ্ছে। তাদের মধ্যে আবার দু’টি দলও হয়ে গেছে। এক দল বলছে, ফাইভজি নেটওয়ার্ক থেকেই করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি। এই দলটির জন্ম ইংল্যান্ডের মত উন্নত দেশে এবং যারা গত ৪ এপ্রিল খোদ লন্ডন শহরে ফাইভজি টাওয়ারে আগুন দিয়েছে! আর এক দল আছে, যারা ফাইভজি টাওয়ারে আগুন লাগানো অন্ধ বিশ্বাসীদের চেয়ে একটু ‘প্রগতিশীল’। তাদের অভিমত, ফাইভজি’র প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্যই এই প্রযুক্তির জন্য বিনিয়োগকারী বিশ্ববাণিজ্যর শক্তিধররা করোনাভাইরাস পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়েছে! এই যে লকডাউন, অফিস ফ্রম হোম, অনলাইনে কেনা কাটার প্রসার, অনলাইন বিশ্ব সম্মেলন- এগুলোর জন্য ফাইভজি অপরিহার্য। এই অপরিহার্যতা প্রমাণের জন্যই করোনাভাইরাস ছড়ানো হয়েছে!
প্রথম দলের জবাবটা আমরা ব্রাসেলসভিত্তিক আর্ন্তজাতিক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘পলিটিকো’র প্রযুক্তি বিভাগে খ্যাতনামা বিশ্লেষক জন হেনডেলের কাছ থেকে পেয়েছি। তিনি যুক্তি-তর্ক, বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট বলছেন, ‘এটা নিছক কুসংস্কার, কারণ বেতার তরঙ্গ নির্ভর কোন প্রযুক্তি থেকে জৈব ডিএনএ বা আরএনএ সম্বলিত ভাইরাস ছড়ানো বাস্তবে অসম্ভব। অতএব এই কুসংস্কার কোনো যুক্তিতেই ধোপে টেকে না।’ আসলে নিজের একটা খোলা মস্তিস্ক থাকলে, যুক্তি দিয়ে উপলব্ধির মত নূন্যতম লেখাপড়া থাকলে, এই বিষয়টা বোঝার জন্য কোন বিশ্লেষকের কাছে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। এখন যদি কেউ বলে মাইক্রোওেয়েভ অ্যান্টেনায় বিকিরণের তাপে মুরগী আর ডিম ছাড়াই বাচ্চা ফুটছে, সেটা যেমন হাস্যকর হবে, তেমনি ফাইভজি নেটওয়ার্ক থেকে করোনাভাইরাস ছড়ানোর বিষয়টিও হাস্যকর।
অপর দলটির অবস্থা অনেকটা সেইসব ‘প্রাজ্ঞজনে’র মত; যারা দিনে-রাতে দেদারসে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করেন, রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল হ্যান্ডসেট মাথার কাছে রেখে ঘুমাতে যান, আর সকাল বেলা প্রমাণিত নিরাপদ দূরত্বে থাকা মাইক্রোওয়েভ টাওয়ারের রেডিয়েশনের ক্ষতি থেকে জাতিকে বাঁচানোর জন্য রাজপথে নেমে যান! তারা এখন বলছেন, ফাইভজির প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্যই করোনাভাইরাস ছড়ানো হয়েছে!
এই দলের জটিল চিন্তাবিদরা যদি একটু সরল মাথায় চিন্তা করতেন, তাহলে বুঝতেন- এজন্য নিজেকেসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে মৃত্যু ঝুঁকিতে ফেলার মতো বোকামি হয় না। এখন ফাইভজির যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও সেবাদাতারা বরং বিপাকে পড়েছেন। কারন বিশ্ব অর্থনীতি করোনায় যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ফলে ফাইভজি সম্প্রসারণ কিংবা চালুতে বড় ব্যয়ের আগে অনেক দেশই ভাববে, এসব দেশের টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ভাববে। বিশেষ করে উন্নয়শীল এবং স্বল্পন্নোত দেশ যাদের জন্য ফোরজি কিংবা ফাইভজি ব্যবহারের পার্থক্যটা এখন পর্যন্ত খোলাসা হয়নি, কিংবা ফাইভজি ব্যবহারটা অতি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হয়ে ওঠেনি, সেই সব দেশে ফাইভজির সম্প্রসারণ পেছানোর সম্ভাবনাই বেশি।
অনলাইন কনফারেন্স, অফিস ফ্রম হোমসহ এ ধরনের আরও অনেক বড় কার্যক্রম ফোরজিতেই স্বচ্ছন্দে করা যায়, যদি ফোরজি সার্ভিসটা সত্যিকার অর্থে ফোরজি হয়। ফলে ফাইভজির জন্য নতুন বড় ব্যয়ের চেয়ে স্বল্প খরচে ফোরজি আরও কতটা উন্নত করা যায় সেদিকেই নজর দেবে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো।
দ্বিতীয় দলের অনেকেই ভেবেছে, করোনাভাইরাস ছড়ানোর পর ফাইভজির জন্য চীনের হুয়াওয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এটি অ্যান্ড টিসহ বিশ্বের কয়েকটি কোম্পানি বিনিয়োগ রাতারাতি বাড়িয়ে দিয়েছে। অতএব পাওয়া গেছে সমীকরণ সূত্র! তারা একবারও ভাবেনি, ফাইভজির জন্য এখন পর্যন্ত বিনিয়োগটা প্রাথমিক বিনিয়োগ, আর একটা কোম্পানি শখ করে প্রাথমিক বিনিয়োগ বাড়ায় না! অথচ এখনকার পরিস্থিতিতে বেশি লাভের আশা না দেখার পরও বিনিয়োগ বাড়ানোর অর্থ হচ্ছে, এরই মধ্যে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে তা রক্ষা করা। অর্থাৎ, আরও কিছু বিনিয়োগ বাড়িয়ে হলেও করোনা সংকট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাইভজি সম্প্রসারণে আগের পরিকল্পনার চেয়ে আরও বেশী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তার প্রস্তুতি নেওয়া। এই বিনিয়োগের ঘোষণাটা আমরা জানি। বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যয়ের চিত্রটা জানি না।
অতএব করোনা ভাইরাস আর ফাইভজির মধ্যে সম্পর্ক খোঁজার চিন্তা হাস্যকর। উৎস সম্পর্কে অন্ধকারে রাখার কারণে রহস্যময় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বরং অনুজীববিজ্ঞান কিংবা জৈব রাসায়নিক ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য গবেষণার কোন ভিত্তি আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহটা অনেক যুক্তিযুক্ত।
সবশেষে বলি, ফাইভজি মানব সভ্যতার জন্য অসাধারন একটি প্রযুক্তি। যে প্রযুক্তিতে সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীতে নতুরন একটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব নিয়ে আসছে। বর্তমানে ফোরজি প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ ৪৫ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ফাইভজি সেখানে এক জিবিপিএস (এক হাজার এমবিপিএস) কিংবা তারও বেশি গতি এনে দেবে মোবাইল ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে। ইন্টারনেটের এই গতিই বড় পরিবর্তণ নিয়ে আসবে। আগে যেখানে অফিসের একটা সার্ভারের কাজ ছিল অডিও-ভিডিও কিংবা নানা ধরনের ডাটা ফাইল ট্রান্সফার, ফাইভজি সেখানে অফিসের সরাসরি কমান্ড (নির্দেশনা) পৌঁছে দেবে এবং সে অনুযায়ী আপনার কাজ নিশ্চিত করবে। যেমন ধরুন আপনার কারখানায় রোবট দলবেঁধে যন্ত্রপাতির সুইচ হাতে নিয়ে বসে আছে। আপনি দূর থেকে ফাইভজির মাধ্যমে সেই রোবটগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে নিখুঁতভাবে কারখানার উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারেন। আবার সেই উৎপাদিত পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যাকেট করা, চালকবিহীন গাড়িতে করে বন্দরে নিয়ে যাওয়ার কাজটিও ফাইভজি প্রযুক্তির মাধ্যমে সেরে নেওয়া যাবে দূর নিয়ন্ত্রিতভাবে। আবার বিগ ডাটা, ভার্চুয়াল রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ব্যাবসার আয়-ব্যায়ের সঠিক হিসেব নিরাপদে সংরক্ষণও করা যাবে।
এখন আগুন লাগা কিংবা ভূমিকম্পের দুর্যোগে মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। ফাইভজি প্রযুক্তিতে মানুষের নিয়ন্ত্রণে কাজটি রোবট করবে। কোথাও দ্রুত আগুন নেভানো কিংবা ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবনের ভেতরে উদ্ধার কাজ পরিচালনার মত কঠিন কাজও ফাইভজির সময়ে সহজ করে দেবে রোবট, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার অভিযান থেকে মুক্তি দেবে মানুষকে। মনে করুন, মানবসভ্যতা এতদিন ‘স্মার্ট’ হওয়ার অভিযানে নানা পথে জাহাজে করে সমুদ্রে ভেসেছে। ফাইভজির বন্দরে সেই জাহাজ ফেলতে পারবে শক্ত নোঙর।
লেখক: সাংবাদিক