আমরা কি এমন ঈদ চেয়েছিলাম?
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২০ | ০৭:১০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
চান্দ্রমাস অনুসরণ করায় মুসলমানের ঈদ উৎসব খ্রিস্টানের বড়দিন বা হিন্দুর দুর্গাপূজার মতো প্রতিবছর একই ঋতুতে আসে না। কিন্তু ঈদুল ফিতরের আগমণী বার্তা ও উদযাপন শতশত বছর ধরে সুনির্দিষ্ট; এক মাস রোজা শেষে সন্ধ্যাবেলা পশ্চিমাকাশে শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ। ‘আল হেলাল’ আরব ভূমিতে অন্য উপমায় প্রকাশ হতে পারে, এই বঁঙ্গে সেই চাঁদকে কৃষকের বাঁকা কাস্তের মতোই মনে হয়। কাস্তে যেমন ফসল ঘরে তোলার আনন্দের প্রতীক, তেমনই শাওয়াল মাসের চাঁদ মানে কৃষকের জীবনে অন্তত একটি দিনের কর্মবিরতি ও আনন্দ। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা’ তারাও এই দিন অপেক্ষাকৃত উন্নত খাবার ও সামান্য মিষ্টান্ন আয়োজন করে। বিকেলে দলে দলে ভাগ হয়ে মাঠে সৌখিন খেলাধুলা। বস্তুত বাঙালি মুসলমানের জীবনে হাতে গোনা যে কয়টি ‘উৎসব’ সর্বজনীন, ঈদ তার অন্যতম প্রধান।
বাঙালি মুসলামনের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি যত সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী হয়েছে, ঈদ উদযাপনের চরিত্র ক্রমে পাল্টেছে। গত শতকের গোড়ার দিকে যুক্ত হয়েছিল ঈদ উপলক্ষে সঙ্গীত। ১৯৩২ সালে কাজী নজরুল ইসলামের রচনা ও সুরে এবং আব্বাস উদ্দিনে কণ্ঠে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ তো গত অর্ধশতকে বাঙালি মুসলমানের অনিবার্য ঈদ সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়া মাত্রই রেডিও টেলিভিশনে এই গান বাজতে থাকে। রমজানের ২৯ বা ৩০ তারিখে চাঁদ না দেখেও কেউ যদি এই গান শোনে, বুঝে নেয় পরদিন ঈদ অনিবার্য। বলা চলে, শাওয়ালের চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের গানটিও বাঙালি মুসলমানের ঈদ উৎসবের আগমণী বার্তার অংশ হয়ে গেছে। নিদারুণ পরিহাসই বলতে হবে, এবারের ঈদুল ফিতর পড়েছে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে। কিন্তু তার গানটিই বাজছে না কোথাও।

দু’বার ঈদের সময় বিদেশে অবস্থানের কথা বাদ দিলে আমার সামান্য জীবনে এমন কোনও ঈদ নেই, যার আগের সন্ধ্যায় এই গান শুনিনি। ব্যতিক্রম এবারের ঈদ। ২৯ রমজানে চাঁদ না দেখা যাওয়ায় সোমবার ঈদ অনিবার্য ছিল। তারপরও নিয়ম রক্ষায় চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসেছে, দেখা যাওয়ার ঘোষণা করেছে। সেই সংবাদ ‘ব্রেকিং নিউজ’ আকারে এসেছে। কিন্তু বরাবরের ঐতিহ্য মেনে গানটি বাজতে শুনিনি। অন্তত আমি যে কয়টি চ্যানেল ঘুরেছি, শুনিনি। বাসার আশপাশ থেকেও চিরচেনা সেই সুর ও সঙ্গীত ভেসে আসেনি। ঢাকাই ঐতিহ্য মেনে ঈদের চাঁদ দেখা উপলক্ষে পটকা ও বাজী কি ফুটেছে? অন্তত আমার চক্ষু কর্ণ এড়িয়ে গেছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যে দিকে গড়িয়েছে; ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে উৎসবের আমেজ আনা কঠিন।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাও কি চিরায়ত চেহারা হারিয়ে ফেলেনি? মুসলমানদের দুই পবিত্রতম মসজিদ মক্কার হারাম শরীফ ও মদীনার মসজিদে নববীতে ঈদের জামাত হয়েছে শুধু সেখানকার ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা রক্ষীদের অংশগ্রহণে। বাইরের কারো অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। গোটা সৌদী আরবে বরং বলবৎ ছিল কারফিউ। বাংলাদেশের মুসলমানরা সেদিক থেকে খানিকটা মুক্ত। সীমিত পরিসরে হলেও মসজিদের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের জামাতে অংশ নিতে পেরেছে। মসজিদের বাইরে মাঠে নামাজ পড়ার সুযোগ ছিল না। ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহগুলোও ছিল বন্ধ। দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ কিশোরগঞ্জের সোলাকিয়ায় এবার জামাত হয়নি। ঈদগাহটির ২৭০ বছরের ইতিহাসে এমনটি ঘটেনি। সমকাল অনলাইনে দেখছি- রাজধানীতে যেমন বাসার ছাদে ছাদে, তেমনই মফস্বলে বাড়ির উঠোনে উঠোনেও স্বল্প পরিসরে জামাত আয়োজন করা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ও বিস্তৃতি রোধে এর বিকল্পও ছিল না।
করোনার কারণে গত কয়েক মাসের মতো বিষন্নতা রমজানের শেষ দিনটিতেও মিশে ছিল। বিশেষত ওই দিনই দেশে করোনা ভাইরাসে একদিনে সর্বোচ্চ ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছিল। সোমবারের ২১ জন মিলিয়ে এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫০১। শনাক্তের সংখ্যাও পর্যন্ত ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বলা বাহুল্য, মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি। করোনায় আক্রান্ত পরীক্ষা পর্যন্ত যেতে পারে না, সব মৃত্যুও সরকার ও সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে না। এর চেয়েও খারাপ সময় কি আসতে পারে?
দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপন বাঙালি মুসলমাানের জন্য নতুন নয়। বৃষ্টি-বর্ষণ তো মাঝেমধ্যেই, থইথই বন্যার কারণে নৌকায় দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়ার নজিরও কম নেই। এবার করোনা চলাকালেই ঘূর্ণিঝড় আম্পান এসেছে। ঘরবন্দি থেকে সীমিত পরিসরে ঈদ উদযাপনের সুযোগও কারো কারো নেই। মাথার ওপরের সামান্য ছাদটুকুও উড়িয়ে নিয়ে গেছে আম্পান। পায়ের নিচের অনুর্বও ডাঙাটুকুও ডুবিয়ে দিয়েছে জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের লোনা পানি। বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ঈদ এসেছে। একাত্তরের নভেম্বরে শত্রু কবলিত দেশেও থেমে থাকেনি ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ও সামাজিকতা।
মনে হতে পারে, এবার পরিস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নাজুক। করোনা যুদ্ধ প্রচলিত যুদ্ধেও চেয়েও ব্যাপক। করোনা ভাইরাস দুধর্ষতম গেরিলার চেয়েও মারাত্মক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ যেন করোনার ব্যাপ্তি ও গভীরতার কাছে তুচ্ছ। কিন্তু ঈদের দিন সমকাল অনলাইনে ছাপা হওয়া একটি ছবি বলে অন্য কথা। খুলনার কয়রায় ঈদের দিনও স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত করেছে স্থানীয় মানুষ। তারপর হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়েই ঈদের নামাজ পড়ছে জামাতে। এক্ষেত্রে করোনায় শারিরীক দুরত্ব কতখানি রক্ষিত হয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে বৈকি। কিন্তু বাঁধ মেরামত ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। করোনা আক্রান্ত হলে কয়েক শতাংশ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু বাঁধ না থাকলে উৎপাদন শূন্যতা ও কর্মহীনতায় মারা পড়বে আরও বেশি।
সন্দেহ নেই, আমরা চেয়েছিলাম ঈদ উপলক্ষে লাগামহীন কেনাকাটায় রাশ টানা হোক। আমরা চেয়েছিলাম, সংযমের মাসে ভোগের বাহুল্য ছেঁটে ফেলা হোক। আমরা চেয়েছিলাম প্রদর্শনবাতিকের বদলে জাকাত-ফিতরা প্রাপকের কাছে পৌঁছানো হোক নিরবে। এমনকি ‘নাড়ির টানে’ প্রতি ঈদে যে লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যায়, যেতে গিয়ে দুঘটনা ও দুর্ভোগের শিকার হয়; সেক্ষেত্রেও আমরা চেয়েছিলাম কিছু চাকা উল্টো ঘুরুক। প্রতি ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার বদলে গ্রামের বাড়ির লোকজন কোনো কোনো ঈদ শহরে উদযাপন করতে পারে। এবারের ঈদুল ফিতরে কার্যত এমন চিত্রই দেখা গেছে। রমজান মাসে ভোগবাহুল্য নেই, শপিং মলে ভিড় নেই, মহাসড়কে যানজট নেই। জাকাত বা ফিতরার অর্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে যতটুকু পৌঁছেছে, হাঁকডাক চোখে পড়েনি। কিন্তু এমন ঈদ কি আমরা চেয়েছিলাম?
ধর্ম ও সংস্কৃতির বাইরেও ঈদের মতো উৎসব আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলক। এবারের ঈদের চিত্র প্রমাণ করছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা স্থবির। এই পরিস্থিতি উৎসবের একদিন চলতে পারে, সংযমের এক মাসও চলতে পারে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মাসের পর মাস চলতে পারে না। জীবনে টিকে থাকতে হলে সতর্কতা ও সাবধানতা জরুরি; কিন্তু খোদ জীবনকেই স্থবির করে যে সতর্কতা, তা আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ জীবন মানে সচলতা, স্থবিরতার অপর নাম মৃত্যু। আর কে না জানে, দুর্যোগ মোকাবেলা মানে দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য।
লেখক ও গবেষক