জলবায়ু পরিবর্তন ও আম্পান
মো. শাহিন রেজা
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২০ | ০৭:১৮ | আপডেট: ২৭ মে ২০২০ | ১৩:৩৬
ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ছয়টি ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এখন আর দেখা মেলে না সবগুলোর। গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত দেখা দিলেও শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত নির্দিষ্ট মাসে দেখা দিচ্ছে না, যেন হারিয়ে গেছে ধরণী থেকে! আবার যে ঋতুগুলোর দেখা মেলে তাদেরও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শীতের তীব্রতা কমে গেছে, পরিবর্তন হয়েছে বৃষ্টি পাতের ধরনের আর দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসবের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ।
আইপিসিসি বলছে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি। পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণও হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদী ভাঙন, মাটির লবণাক্ততা ইত্যাদি প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা সহ উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব থেকে বেশি। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এ অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলছে। ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশর উপকূলীয় এলাকায় খুবই সাধারণ ঘটনা। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের বসবাসের এই এলাকাগুলো ওই সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের করণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুসারে ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি বড় সাইক্লোনের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এইসব অঞ্চলের মানুষ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও পুষিয়ে উঠতে পারিনি। সাম্প্রতিক অতীতে ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৮ সালের নার্গিস, ২০০৯ সালের আইলা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। প্রাণহানী ঘটে অনেক মানুষের, ধ্বংস হয় বাড়ি ঘর, ফসল, রাস্তা ঘাট ইত্যাদি, জনজীবনে যার প্রভাব ছিল অত্যাধিক। এর ওপর আঘাত হানলো আম্পান।
অন্যান্য দুর্যোগের কথাও বলতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তালিকায় ঝড়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। নদী বিধৌত দেশ বাংলাদেশ। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ছোট- বড় নদী আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলেছে। নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলো বেশি পরিমাণে বন্যার সম্মুখীন হয়। উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাত, মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাব রয়েছে বন্যা সৃষ্টিতে। প্রতি বছর জুন- সেপ্টেম্বরে ছোট থেকে মাঝারি আকারের বন্যা হয়। বন্যার ফলে ১৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।এর মধ্যে ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮৮,২০০৪, ২০১৭ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক, মানবসৃষ্ট ও জলবায়ুগত কারণেই বন্যা হয়ে থাকে।
দেশের উত্তর অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত নাম খরা । দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় খরার অন্যতম কারণ। প্রতি পাঁচ বছরে খরার কারণে বিপদে পড়ে মানুষ, উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। খরা কৃষিকাজের উপর প্রভাব ফেলে। যার কারণে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। ফলে দুর্ভিক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মানুষ কর্মের অভাবে কষ্টে জীবন যাপন করে।বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ইত্যাদি অঞ্চলের মানুষ কর্মের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আগমন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবনাক্ততার সমস্যার দেখা দিচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদন, মিঠা পানি ও জনজীবনের উপর প্রভাব পড়ছে।
আইপিসিসির একটি প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে সামনের দিনে মিঠাপানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এছাড়াও বরফ গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রের স্তর উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবন অবস্থিত। সুন্দরবন আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার পরম দয়া। কারণ এই বন উপকূলীয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে আমাদের দেশকে রক্ষা করে। এবারও আম্পানের সময় দেখা গেল এই বন কীভাবে আমাদের সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সুন্দরবনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জোয়ারের পরিধি বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণাঞ্চলে লবনাক্ততা বাড়ছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি কাজ ব্যাহত হবে, মিঠা পানির অভাব দেখা দিবে ও জীবনযাপনে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করবে। এছাড়াও নদী ভাঙন, শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, বজ্রপাত ইত্যাদি দুর্যোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের স্বভাবিক জীবনযাপন, প্রাকৃতিক পরিবেশ, মৎস সম্পদ, বনজ সম্পদ, স্বাস্থ্য, কৃষিকাজ ও অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। তাই দুর্যোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা। প্রকৃতির ক্ষতি করে, এমন সব কর্মকাণ্ড এখনই বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ সময় আসছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান সেই তাগিদই দিয়ে গেলো।
লেখক: শিক্ষক