মাকোন্দোবাসী হওয়াই কি নিয়তি?
হাসান ইমাম
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২০ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ২৭ মে ২০২০ | ১৩:৪৪
পাহাড়ের গা বেয়ে পড়া ঝরনা যেন জাদুর ছোঁয়ায় মুহূর্তে বরফে পরিণত। ঝরনার চলার ভঙিমা তাতে স্পষ্ট, কিন্তু নিশ্চল। এমনই এক বিহ্বলতায় থমকে আছে গোটা বিশ্ব। গোটা বিশ্বের মানুষ একই সমস্যায় আক্রান্ত, একই বিপন্নতায় ভারাক্রান্ত, একই অনিশ্চয়তায় ত্রাসিত।
আশার কথা এখানেই, ভরসার জায়গাও এটাই। সম্মিলিত লড়াইয়ে মানুষ পরাজিত হয় না কখনও, তা সে বিপক্ষে স্বয়ং মহাকাল দাঁড়াক না কেন! করোনার বিপক্ষে মানুষের জয় তাই অনিবার্য, প্রকৃতি-নির্ধারিত। হয়তো জীবনজয়ের সেই পথে যেতে পেছনে ফেলে যেতে হবে আরও কিছু অসময়ের অনাকাঙ্খিত মৃত্যু।
কিন্তু 'প্রকৃতি-নির্ধারিত' শব্দবন্ধ যেন 'প্রকৃতির দ্বারা নির্ধারিত' নয়; এর সাথে গায়ের জোরের যোগ আছে। অন্তত করোনাভাইরাসের উৎপত্তির প্রশ্নে প্রকৃতির সাথে মানুষের অন্যায্য আচরণের আভাস মোটামুটি স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে মানুষ যদি দোষী সাব্যস্ত নাও হয় তবু প্রকৃতির সাথে তার জোর-জবরদস্তির নয়া-পুরনো নজিরের অভাব পড়ে না। অনেকেই তাই করোনার প্রাদুর্ভাবকে দাগিয়ে দিচ্ছেন 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' হিসেবে।
তবে কথা আছে, প্রশ্ন আছে। ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে প্রকৃতিবিনাশি যে কর্মযজ্ঞের সূচনা, তার সাথে এই দক্ষিণ এশিয়ার একজন চাষি, জেলে বা আফ্রিকার একজন আদিবাসীর কতটা যোগ? একজন শহুরে মানুষের জীবনযাত্রায় যতটা কার্বন নিঃসরণের সম্পর্ক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজনের ততটাই সংস্রবহীন। উন্নত দেশগুলোর জ্বালানি-ক্ষুধার কাছে গরিব-গুর্বো দেশের চাহিদা নস্যিসমান। তাই 'কৃতকর্ম' কিছু মানুষের, ফল ভোগ করতে হচ্ছে কিনা সকলকে। 'মানুষ, মানে যারা মারণযন্ত্র, শেল তৈরি করতে পারে? তার চেয়ে যারা তালপাতার ব্যাগ তৈরি করতে পারে তারা বেশি মানুষ'-- জীবনানন্দ দাশের এই 'বেশি মানুষ' সংখ্যাও বেশি। এই বেশি মানুষেরাই আজ বেশি বিপাকে।
তবে ভাষার ভিন্নতা মানুষের উপলব্দিতে কিছুমাত্র ফারাক ঘটায় না। স্বজনের মৃত্যুশোক সকলের বুকেই সমান বাজে। করোনার হানায় তাই সকলেই সমান কমবেশি কাতর।
এই দুই কিসিমের কাতর মানুষের বিশ্বই ফিলহাল যেন 'মাকোন্দো'য় পরিণত। 'নিঃসঙ্গতার একশ বছর'-এর কল্পিত সেই জনপদের মানুষের মতো আমাদেরও কি তাহলে আনকোড়া কিছু অভ্যস্ত্মতা প্রাত্যহিকতায় পরিণত করতে হবে? দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হবে স্বাস্থ্যবিধি। মাস্কে ঢাকা মুখের মানুষকে চিনে নেব স্বাভাবিকতায়।
করোনাকে কয়েদ করার কায়দা কোনো কবচে মিলবে না, ছুমন্ত্মরেও নয়; বিজ্ঞানের বিশল্যকরণই ভরসা। তবে এ জন্য গবেষণানির্ভর যে পথ পাড়ি দিতে হবে, তাতে কাল ও কালঘাম-দুইই ঝরবে। আজ-কালের মধ্যে টিকা, ওষুধ আবিষ্কার হলেও ৮০০ কোটি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো কথার কথা নয়। হার্ড ইমিউনিটি বা দেহে ভাইরাস নিয়ে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি পর্যন্ত প্রাণহানির ব্যাপকতার ছবিও স্পষ্ট নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মিউটেশনের মাধ্যমে ভাইরাসটি আরও খুনি হয়ে উঠবে নাকি নির্বল হবে, তা বলারও সময় নাকি আসেনি। সুতরাং প্রতিরোধমূলক সতর্কতা বা স্বাস্থ্যবিধি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা ছাড়া দ্বিতীয় পথের দিশা আপাতত দৃষ্টির আড়ালে।
প্রশ্নটা হচ্ছে, 'আপাতত' মানে কতটা সময়? দুই-চার-দশ বছর নাকি আরও বেশি, গোটা একটি প্রজন্ম? কিংবা আরও বেশি অপেক্ষা?
তাহলে এত এত সময় ধরে মাস্ক পরার অভ্যাসের পর খালি মুখের আচরণে ফিরতে পারব তো আমরা? হাত মেলানোর সামাজিকতা কি মনে থাকবে আর? মাকোন্দোবাসীর মতো যদি স্মৃতিহীনতা গ্রাস করে আমাদেরও? তাহলে কি মেপে মেপে তিন ফুটের দূরত্বে থেকে মুখে মুখে কুশল বিনিময়ই হবে আমাদের 'নয়া অভিবাদন'?
বন্ধু, স্বজন, আপনজন ভুলে তেমন সামগ্রিক নিঃসঙ্গতাই যদি অবরুদ্ধ-পরবর্তী ভবিতব্য হয় আমাদের, তবে বিস্মৃত হওয়ার আগে আগে যেন স্বীকার করি, 'এ আমার এ তোমার পাপ।'
লেখক: সাংবাদিক