ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

ভেন্টিলেটরে বিনিয়োগ করুক বিশ্ব, ট্যাঙ্কে নয়

ভেন্টিলেটরে বিনিয়োগ করুক বিশ্ব, ট্যাঙ্কে নয়
×

মো. শরীফ হাসান

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২০ | ০৮:১০ | আপডেট: ২৭ মে ২০২০ | ১৪:১০

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রিয় "আমেরিকা ফার্স্ট" মন্ত্রটির মাধ্যমে যেন বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে মৃতের তালিকায় আমেরিকার শীর্ষে থাকার বিষয়টিই বিদ্রুপাকারে অনুরণিত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যতিক্রমবাদের উপর জোর প্রদান যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশেষে সেই ব্যতিক্রমী অবস্থানেই নিয়ে এসেছে। "আমেরিকা ফার্স্ট" এর অহংকার, যা ট্রাম্পকে প্যারিস জলবায়ু সংক্রান্ত চুক্তি, ইউনেস্কো, ইউএনএইচসিআর, ইউএনআরডব্লিউএ এবং অন্যান্য বিভিন্ন ছোটখাটো আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছিল, সেটি তাকে অনেক দিন ধরে দৃঢ বিশ্বাস রাখতে সাহায্য করেছিল যে চীনের করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হবেনা। তবে এখন যেমনটি দেখা যাচ্ছে যে, এটি একটি মারাত্মক ভুল ছিল।

যখন হোয়াইট হাউস অবশেষে বুঝতে পারল যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তখন তারা বিশ্বজুড়ে ভেন্টিলেটর খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং "দ্বিতীয় স্তরের দেশগুলিকে" মাস্কের শিপমেন্ট পাঠানোর জন্য অনুরোধ করছে। কারণ প্রতিদিন তাদের হাজার হাজার নাগরিক মারা যেতে শুরু করেছে। এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের গুরুতর প্রয়োজন ট্রাম্প প্রশাসনকে তার চীনবিরোধী বক্তব্যের হ্রাস টানতে এবং বেইজিংয়ের সাথে "সহযোগিতা" করার কথা বলতে বাধ্য করেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ভেন্টিলেটর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মেডিকেল সামগ্রী সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছে না। ইউরোপের সরকারগুলি স্থানীয় কারখানাগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব ভেন্টিলেটর উৎপাদন শুরু করতে বলেছে।

গড়ে ৫০ হাজার ডলারের এই মেডিক্যাল যন্ত্রটি এখন মিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক এবং রকেটের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কে ভাবতে পেরেছিল বিশ্ব রাজনীতিতে দেশসমূহের অস্তিত্ব রক্ষায় ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। ভেন্টিলেটরের এই কৌশলগত নতুন মূল্য অর্জন শতাব্দী ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী হুমকি ভিত্তিক ধারণার একটি বড় ত্রুটির দিকে নির্দেশ করছে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর অস্ত্রখাতে ব্যয় করা প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার কভিড-১৯ মহামারি থেকে দেশগুলিকে রক্ষা করতে কিছুই করেনি। এমনকি সীমান্ত সুরক্ষায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ও না। এই ভাইরাসের হুমকী ১৬৪৮ ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির পরে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের যে আধুনিক সীমানা চিহ্নিত হয়েছে এবং তারপরে রাষ্ট্রগুলির মাঝে সীমানা, কর্তৃত্ব, জাতীয়তাবাদ এবং বিশেষত সামরিক শক্তি নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তাকেও হারিয়ে দেয়।

কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব কোনও সীমানা, সার্বভৌমত্ব, বিশ্ব শক্তির শ্রেণিবিন্যাস, বা সামরিক অস্ত্রাগারগুলির শক্তি কোন কিছুকেই পরোয়া করে না । অথচ এগুলোই সর্বদা জাতীয় সুরক্ষার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। কৌশলগত প্রতিরক্ষার পরিকল্পনা সাধারণত সম্ভাব্য হুমকিরও সামান্য সম্ভাবনা উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। হবসিয়ান দৃষ্টিভঙ্গির "সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ" এর উপর ভিত্তি করে তৈরি এই পদ্ধতির ফলেই জ্যোতির্বিদ্যার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট অস্ত্র ক্রয়ের জন্য ববহৃত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতে শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশই দেওয়া হচ্ছে।

গত বছর, মার্কিন কংগ্রেস ২০২০ সালের জন্য জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিরক্ষার জন্য ৭৩৮ বিলিয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৩.৮ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। কিছু অনুমান অনুসারে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ভেন্টিলেটর রয়েছে যা কিনা দেশটি যদি মারাত্মক ভাইরাসের বিস্তার মুখোমুখি হয় তবে প্রয়োজনের তুলনায় ৫ লক্ষ ৮০ হাজার কম। প্রয়োজনীয় এই অতিরিক্ত ভেন্টিলেটরগুলি পেতে হলে প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ২৯ বিলিয়ন বা ৪ শতাংশ ব্যয় করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ নয় যার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সামরিক হুমকির বনাম অন্য সকল সম্ভাব্য ক্ষেত্রের বাজেটের জন্য এই অযৌক্তিক বৈষম্য রয়েছে। যদিও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছিল যে করোনোভাইরাস জাতীয় ভাইরাসজনিত জুনোটিক রোগের (এমন একটি রোগ যা প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রামিত হতে পারে)ক্রমাগত উত্থানের কারণে মহামারি হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর এর মত যাঁরা তাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছে তারা কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। এবং এটি কেবল মহামারিই নয় যেটি যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন আরেকটি। জাতিসংঘের মতে, আগামী ২০ বছরে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার আরও বৃদ্ধি বন্ধ করতে বিশ্বকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে; যা বিশ্বের ৬০ দিনের সামরিক ব্যয়ের সমান। ২০২০ সালের বাজেটে বিশ্বের ধনীতম দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিবেশগত কর্মসূচিতে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে যা তার প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ০.১ শতাংশ।

করোনাভাইরা্সের এই প্রাদুর্ভাব এবং ভেন্টিলেটরের জন্য আন্তর্জাতিক হাহাকার বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে বিশ্ব আন্তঃসম্পর্কের গভীরতা ও সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সম্পর্কে বিবেচনা করতে এবং সার্বভৌমত্বের গোঁড়া ধারণাটি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। এটি দেশসমূহ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে বর্তমান সংকীর্ণ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে হুমকির বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার জন্য বাধ্য করছে। এর অর্থ হল, পুরো পৃথিবী এবং এর বাসিন্দাদেরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ফেলতে পারে এমন হুমকির দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।

বর্তমান সংকেটে দেশগুলোর মাঝে উত্তেজনা এবং মরিয়া প্রতিক্রিয়াই বৈশ্বিক জরুরি অবস্থায় সম্মিলিত বৈশ্বিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের সরকারগুলোর এই বাস্তবতা জাগ্রত করা উচিত যে মানবতা বাস্তবতই গুরুতর এবং সম্মিলিত হুমকির সম্মুখীন হয় যেখানে ট্যাঙ্ক এবং যুদ্ধবিমানগুলি কেবল অকার্যকর।

এই মহামারি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় বাজেটের বিষয়টি ঢেলে সাজানোর একটি সুযোগ হওয়া উচিত যা সংকীর্ণ সংকীর্ণ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক স্বার্থের দিকে নয় বরং সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে।

লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×