লকডাউনে যেসব প্রশ্নের মিমাংসা নেই
সঞ্জয় দে
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০ | ০১:৪৪
'জীবন না জীবিকা'- এমন বিরোধার্থক ভঙ্গির শব্দগুচ্ছ ইদানিং সংবাদ মাধ্যম ও স্যোসাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অথচ জীবন ও জীবিকা মোটেই সংঘাতপূর্ণ কিছু নয়, উল্টো বেঁচে থাকার জন্যই মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।
বাস্তব পরিস্থিতিটি হলো, করোনাভাইরাস মানুষকে যতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, তারচেয়ে বহুগুণে বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে জীবিকার সঙ্কট। করোনা পরিস্থিতিতে এটি শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়, বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেখা যাচ্ছে জীবিকা কোনোভাবেই জীবনের বিরোধার্থক কিছু নয়, বরং মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনেই জীবিকার নিশ্চয়তা বজায় রাখা জরুরি।
করোনা সংক্রমণ শুরুর দিক থেকেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গোটা বিশ্বে একটি লকডাউন চাপিয়ে দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যে অল্পকিছু মানুষ এই কৌশলের বিরোধিতা করেছেন, তারা নিন্দিত-ধিকৃত হয়েছেন। তাদেরকে রীতিমতো ‘মানুষ হত্যাকারী’র সমতুল্য হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে যত দিন গেছে, প্রমাণিত হয়েছে, লকডাউন কার্যকর কোনো কৌশল তো নয়ই, উল্টো এতে আরো বহু সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে। লকডাউনের নামে এরই মধ্যে যে ক্ষতি বিশ্বের হয়েছে, মানুষকে তার মাসুল হয়ত গুণতে হবে সামনের বহু বছর ধরে।
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ফিলিপ থমাস গত ২৫ মার্চ একটি পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেখিয়েছিলেন, কার্যকর একটি টিকা উদ্ভাবন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য যদি ভাইরাস সংক্রমণের ধীরগতি রাখতে পাঁচ বছর লকডাউন বজায় রাখে, তাহলে এই সময়ে সেখানে কভিডে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যাবেন। তবে এই পাঁচ বছরে লকডাউনের প্রভাবে মারা যাবে আরো ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। আর যদি ভাইরাসকে স্বাভাবিক সংক্রমণের সুযোগ দেয়া হয় তাহলে ইম্পরিয়াল কলেজের হিসেবে- পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যে কভিডে মারা যেতে পারে সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ। তার মানে, লকডাউন একটি ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত এর ক্ষতির দিকটিই বেশি।
অধ্যাপক থমাস বলছেন, পোভারটি কিলস জাস্ট এজ সিওরলি এজ করোনাভাইরাস’। দ্য টেলিগ্রাফে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদের উদ্বেগ বেশ পরিষ্কার। তারা বলছেন, কভিডের মতো একটি বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতি কী করে মোকাবিলা করতে হবে সেটির রূপরেখা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের যৌথ সমন্বয়ে ঠিক করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জেমস পোটেরবা বলছেন, ‘এই সংকটে সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের যোগাযোগের মাত্রাটি ছিল খুবই সীমিত। অথচ এটি এমন পরিস্থিতি যেখানে নীতি কৌশল ঠিক করার ক্ষেত্রে অর্থনীতি একেবারে অপরিহার্য একটি বিষয়। সমাজ বিজ্ঞানীরা এমন কিছু দিক চিহ্নিত করতে সক্ষম, যেগুলো চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের রাডারে নাও থাকতে পারে।’
অন্যদিকে, লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ক্যারল প্রপার বলছেন, অর্থনৈতিক অভিঘাতের একটি স্বাস্থ্যগত প্রত্যাঘাতও রয়েছে। একটি গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলছেন, ‘কর্মসংস্থান এক শতাংশ কমে গেলে সেটি দুই শতাংশ হারে ক্রনিক রোগের বৃদ্ধি ঘটায়। আর এই ক্রনিক রোগের মধ্যে আছে, হৃদরোগ, অ্যাজমা ও মনোবৈকল্য।
প্রপার আরো ভয়ঙ্কর যে কথাটি বলছেন, তা হলো, ‘অতীতে বেশ কয়েকটি মন্দা তরুণ এবং বিশেষত শিশুদের প্রভাবিত করেছিল। এ ধরনের মন্দা শিশুর জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলে এবং মন্দার মধ্যে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম আয়ুপ্রাপ্ত হয়।’
করোনা নিয়ে গোটা বিশ্ব মাত্রাঅতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে কিনা- সেই প্রশ্ন দিনে দিনে বাড়ছে। এই অবস্থা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিজনিত বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করেনি, একই সঙ্গে নন-কভিড রোগীদেরও বিনা চিকিৎসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ চিত্র শুধু বাংলাদেশের নয়, বিদেশের পরিস্থিতিও হতাশাজনক। ক্যান্সার রিসার্চ যুক্তরাজ্য সতর্ক করে বলছে, বর্তমান সঙ্কটের কারণে কেবল এ বছরই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অতিরিক্ত ১৮ হাজার জন মারা যেতে পারেন। এর কারণ, ইংল্যান্ডে জরুরি সেবা ৬২ শতাংশ কমেছে এবং স্বাভাবিকের সময়ের তুলনায় মাত্র ৭০ শতাংশ কেমোথেরাপি দেয়া হচ্ছে।
তার মানে, করোনার দিকে সব মনোযোগ ঢেলে দেয়ায় কেবল যুক্তরাজ্যেই এ বছর ১৮ হাজার বেশি ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক নিউমোনিয়াসহ আর সব জটিল রোগের হিসাব ধরলে মৃত্যুটি কত হতে পারে- সেই হিসাব আমরা নিশ্চয়ই একদিন জানতে পারব। তবে এরপরেও বহু মানুষের গভীর ধারণা, লকডাউনই পারে মৃত্যু ঠেকাতে! আর এ ধারণাকে অব্যাহত রাখায় বড় ভূমিকা রাখাছে গোটা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমও।
যেখানে বিশ্বের প্রতিটি দেশে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ মাত্রায় নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমেও প্রকৃত আক্রান্তের মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ শনাক্ত করা গেছে, তারপরেও আমরা সবাই এক বাক্যে বলছি, পরীক্ষার মাধ্যমেই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব! সংবাদ মাধ্যম একবার বলছে, লকডাউন ও পরীক্ষার মাধ্যমেই ভিয়েতনাম করোনা মোকাবিলায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে, আবার সেই সংবাদ মাধ্যমেই জাপানের উদাহরণ দিয়ে দুদিন পর বলা হচ্ছে, লকডাউন ছাড়া কেবল থ্রি-সিতেই দেশটি সফল!! এই বৈপরীত্য কেন- তা কারণ খোঁজার দায়িত্ব ছিল মূলত সংবাদ মাধ্যমের। কিন্তু নেই প্রচেষ্টা এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং সংবাদ মাধ্যমের আগের মতোই অনেক বেশি মনোযোগী করোনায় মৃত ও আক্রান্তের নিয়মিত হিসাব-নিকাশ উপস্থাপনের দিকে।
করোনা নিয়ে জনমানসে যে বিপুল আতঙ্ক এবং এর সমাধান হিসেবে আরো ঝুঁকিপূর্ণ যেসব পথ গোটা বিশ্ব বেছে নিচ্ছে- তাতে সঙ্কট হয়ে উঠছে বহুমাত্রিক। ব্রিটিশ অধ্যাপক ফিলপস থমাসের ভাষায়, ‘বৈশ্বিকভাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতি মানব জাতির জন্য অনেক বেশি মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে। মানুষের ভবিষ্যতকে রক্ষা করার জন্য শেষপর্যন্ত হয়ত বর্তমান সময়ের আরো অনেকের জীবন বিপন্ন করে তুলতে হবে।’
লেখক: হেড অব ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন