করোনা রুখতে চাই ‘আগ্রাসী’ ভূমিকা
ডা. পলাশ বসু
ডা. পলাশ বসু
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০ | ০৩:০৫ | আপডেট: ১২ জুন ২০২০ | ০৫:৩৬
দেশে ক্রমবর্ধমান হারে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ঢাকার রাজাবাজারে লকডাউন শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে এটা পাইলট প্রজেক্ট। শুরুতে ১৪ দিনের জন্য লকডাউন দেওয়া হয়েছে। পরে যুক্তিপূর্ণভাবে নিশ্চয় বাড়াতে হবে এ সময়। কারণ ১৪ দিন পরে রাজাবাজার করোনামুক্ত হয়ে যাবে এটা চিন্তা করা বাতুলতামাত্র। আর এ সময়ে টেস্টের সংখ্যা বাড়ানোটা খুবই দরকার। প্রয়োজনে এক একটা বিল্ডিং ধরে ধরে তার সব বাসিন্দাদের স্যাম্পল একত্রে নিয়ে পিসিআর করা যেতে পারে। সেই স্যাম্পল পজিটিভ হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে এ বিল্ডিং এ করোনা আক্রান্ত এক বা একাধিক রোগী আছেন। পরে আলাদাভাবে আবার তাদের স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করে আক্রান্তদের আলাদা করা যেতে পারে।
খাবার সরবরাহ, চিকিৎসার প্রয়োজনীতাসহ জরুরি অনেক বিষয় সামনে আসবে বিধায় একটা নিবিড় সমন্বয় দরকার হবে আমাদের এসব করতে গেলে। একই সাথে এ পরিকল্পনা সারাদেশে বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। কারণ পুরো দেশকে করোনামুক্ত করার জন্য চেষ্টা চালাতে হবে। সেটা কঠিনই বটে। তবে আগ্রাসীভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার সবই কমবে। স্বস্তিতে থাকতে পারব আমরা।
হাসপাতালগুলোতে এখন যে অবস্থা তা চলমান থাকলে আগামী দুই সপ্তাহ পরে অবস্থা অনুমেয়৷ এজন্য হাসপাতালে করোনারোগী কারা ভর্তি হতে পারবেন তা ইমারজেন্সিতে আসলে রোগীর অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে বলতে হবে চিকিৎসকদের। কারণ যেসব রোগীর শ্বাসকষ্ট নেই বা কো-মরবিডিটি নেই তাদের হাসপাতালে ভর্তির কোন প্রয়োজন নেই। বাসায় আইসেলেশানে থাকা সম্ভবপর না হলে তাদের জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসোলেশান সেন্টার প্রস্তুত করে সেখানে রাখা যেতে পারে।
এখন একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, অধিক বিপদাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা শুধু হাই ফ্লো অক্সিজেন দিয়েই অনেক রোগীকে এ সময়ে সুস্থ করে তুলতে পারি। তাই সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। আমরা এভাবেই আমাদের স্থাপনাগুলো পরিকল্পনাহীনভাবে তৈরি করেছি। আর তার ফলাফল এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এদিকে পত্রিকায় দেখলাম, চট্টগ্রামে সিলিন্ডারের অক্সিজেনও পাওয়া যাচ্ছে না। অক্সিজেন শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশে দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিনই হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেখে সেখানে আবার লকডাউনের পরামর্শ দিয়েছে। জীবিকার কথা বলে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আগেই বলেছেন, লকডাউন আর পাকিস্তান নিতে পারবে না। ফলে সবকিছু খুলে দেওয়াতে সেখানে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। একটা জিনিস পরিষ্কার হওয়া দরকার আগে। সেটা হচ্ছে, আপনি করোনাকে না ঠেকিয়ে, টেস্টের সংখ্যা না বাড়িয়ে, আইসোলেশান, কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা না করে যদি লকডাউন তুলে নিয়ে অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা করেন, তাহলে তা হবে খুবই সাময়িক ব্যবস্থা। কারণ, এতে দীর্ঘমেয়াদে আপনি বিপদে পড়বেন। দেখুন, অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে গেলে এমনিতেই উৎপাদন, সাপ্লাই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সেই সাথে বাড়বে হাসপাতালের ওপর অকল্পনীয় চাপ। আর মৃত্যুর সংখ্যা তো নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। তাতে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়বে।
এ কারণে আমাদের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদের জন্য সচল রাখতে গেলে পরিকল্পিতভাবে তা করতে হবে। না হলে সবকিছু গুবলেট হয়ে যাবে। জীবন-জীবিকা দুটোই তখন হারাতে হবে। সে সময়ে লকডাউন দিয়েও আর কাজ হবে না। ফলে পাইলট প্রজেক্ট চলাকালীনই সারদেশ জুড়ে আমাদের করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য পরিকল্পনা নেয়া দরকার।
কঠোর লকডাউনের সাথে সাথে টেস্ট, আইসোলেশান, কোয়ারেন্টাইন আর হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে সহায়ক জনবলও বাড়াতে হবে। তাহলেই হয়ত আমরা কাঙ্খিত গন্তব্যে পোঁছতে পারব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- লকডাউন