করোনাকালে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার
সাদিয়া আফরিন
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ০৮:২৭ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ০৮:৫৮
যে কোন রোগের প্রাদুর্ভাবই ব্যক্তি, সমাজ এবং কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে নানাবিধ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর কভিড-১৯ বা করোনা রোগের প্রভাব বিষয়ক কোন গবেষণার তথ্য এখনও পর্যন্ত আমাদের হাতে নেই। তবে আমরা ধরে নিতে পারি যে করোনাকালে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন যেভাবে ‘ব্যাহত’ হচ্ছে বা হয়েছে। নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যও এর বাইরে নয়। যৌনতা ও পুনরুৎপাদন একটি চলমান প্রক্রিয়া। নববিবাহিত, গর্ভবতী অথবা সদ্যপ্রসূত মায়েদের মধ্যে যাদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির চাহিদা রয়েছে, প্রসবপূর্ব ও প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন রয়েছে তারা কভিড-১৯ দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত হতে পারেন। তাছাড়া যেসমস্ত গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েরা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের পরিস্থিতি কি হতে পারে তা এখন পর্যন্ত অনুমাননির্ভর।
বলা বাহুল্য যে কভিড-১৯ এর মত রোগের আকস্মিক আবির্ভাব বাংলাদেশের নারীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা ও সংকটের মুখোমুখি করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কভিড-১৯ এর মত জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতিহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার দ্বারাও নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য যে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে তার নজীর ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমদের চোখের সামনে আসতে শুরু করেছে।
তার বাইরেও হাজারো নারী ও বিবাহিত কিশোরী আমাদের দেশে রয়েছে যারা দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক নানাবিধ সংকটের মধ্যে বেঁচে থাকে। বিশেষত যারা শহরের বস্তি এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। ধারণা করা যায়, করোনা মহামারির মত নতুন একটি সামাজিক অভিজ্ঞতায় অর্থাৎ কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক দূরত্ব, গণপরিবহন ব্যবহার ও চলাচলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রস্তুতিহীনতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব প্রভৃতি নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর বিস্তৃত পরিসরে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কভিড-১৯ মহামারি কতটা প্রভাব ফেলেছে অথবা এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে তা এখনও পর্যন্ত আমাদের ধারণার বাইরে। তবে শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগ যেমন, মার্স ও সার্সের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে এই রোগগুলো গর্ভাবস্থায় খারাপ পরিণতি বয়ে আনে। যেমন, গর্ভনষ্ট হয়ে যাওয়া, অকালগর্ভপাত, ভ্রুণ বেড়ে না উঠা, এমনকি প্রসূতির মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যাতে করে বলা যায় যে গর্ভবতী মা’দের কভিড-১৯ ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চাইতে বেশি যেমনটা দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে। কভিড-১৯ এর মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের কি ধরণের পরিণতি হতে পারে বা মায়ের জরায়ুর মাধ্যমে ভ্রূণে কভিড-১৯ সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু সে সম্পর্কিত যথেষ্ট প্রমাণাদি এখনও আমাদের হাতে নেই।
একটা বিষয় অবশ্য জানা যে, গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন রকমের হরমোন নিঃসরণ হওয়ার ফলে নারীদের শারিরীক অবস্থা পরিবর্তিত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং শরীর নাজুক অবস্থায় থাকে। ধারণা করা যায় যে, গর্ভবতী নারীরা যদি করোনায় আক্রান্ত হন তাদের ক্ষেত্রেও এটি ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত গর্ভকালীন সেবার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অনুমান করা কঠিন নয় যে, কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক দূরত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কভিড-১৯ সৃষ্ট চাপের ফলে গর্ভকালীন সেবা নিতে না পারা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা (প্রেশার ও ডায়াবেটিস চেক আপ) করতে না পারা, জরুরি ওষুধপত্র সংগ্রহ ও গ্রহণ করতে না পারা, কভিড-১৯ কে ঘিরে হেনস্তা, সামাজিক অসমতা প্রভৃতি গর্ভাবস্থা ও প্রসবপরবর্তী নারীর স্বাস্থ্যকে মারাত্মক জটিল করে তুলতে পারে।
কভিড-১৯ নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনাও ব্যাহত করতে পারে। একটি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ করা। বিভিন্ন বয়সী নারীদের চাহিদা ও প্রেক্ষিতের উপর নির্ভর করে কার জন্য কোন ধরণের পদ্ধতি প্রয়োজন। যেমন সদ্যবিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী পদ্ধতি অধিক কার্যকর। কিন্তু দেখা যায় যে অল্পবয়সী বধূদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমিত অথবা একেবারেই নেই। এই দলভুক্তদের অনেকেরই হয়তো যে কোন পদ্ধতি গ্রহণের পূর্বে একজন স্বাস্থ্যকর্মী অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকে। যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণে কী কী পদ্ধতি রয়েছে। কোন কোন পদ্ধতি তাদের জন্য মানানসই। এই সমস্ত পদ্ধতি কোথায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে অনেকেই হয়তো কোন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন কিন্তু পদ্ধতিটি তাদের শরীরে মানাচ্ছে না। কোন পদ্ধতিটি তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সে বিষয়ে জানার থাকতে পারে। কিছু মা আছেন যারা সম্প্রতি বাচ্চা প্রসব করেছেন এবং যাদের এক বা একাধিক সন্তান বর্তমান তারাই বা কি ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করবেন? যারা কোন একটি দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতির মধ্যে রয়েছেন কিন্তু সেটি শরীরে অসুবিধার সৃষ্টি করছে সে বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে আলোচনা করতে চান অথবা খুলে ফেলতে চান। কারো কারো আবার মেন্সট্রুয়াল রেগুলেশন বা গর্ভপাত করার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্বের বাধ্যবাধকতায় উপরের যে কোন সমস্যাই প্রকট হয়ে উঠতে পারে। নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করে ফেলতে পারেন এইসব সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউনিসেফের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, করোনা মহামারি ঘোষণার পর থেকে পরবর্তী নয় মাসে বাংলাদেশে অন্তত ২৪ লাখ শিশু জন্ম গ্রহণ করবে, যা শুধু ব্যক্তি ও পরিবারের উপরই না দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। শিশুর এই অস্বাভাবিক জন্মহার বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রের উপর অত্যন্ত সুদূর প্রসারী প্রাভাব বিস্তার করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবিষয়টিকে কেন্দ্র করে ইউনিসেফ বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল রাষ্ট্রকে কিছু প্রয়োজনীয় বার্তা প্রদান করে।
এর মধ্যে রয়েছে, যেভাবেই হোক গর্ভবতী মায়েদেরকে গর্ভকালীন সেবা, দক্ষ হাতে প্রসবসেবা, প্রসবোত্তর সেবা এবং কভিড-১৯ সম্পর্কিত সেবা পেতে সহায়তা করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোষাক নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদেরকে কভিড-১৯ টেষ্ট ও ভ্যাক্সিনেশনের (যখনই পাওয়া যাবে) ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে করে তাঁরা গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে পারে।
এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে শিশুর জন্মের সময় এবং পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। যেসব এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ, সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিষ্কার বার্থ কিটের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা ও যোগান দিতে হবে যাতে করে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্তান প্রসব করাতে পারে।
অন্যদিকে ইউএনএফপিএ নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য মোকাবিলায় কিছু প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। যেমন শ্বাসতন্ত্রের রোগে ভোগা গর্ভবতী মাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে যাতে তাঁদের অবস্থা অনেকবেশি গুরুতর না হতে পারে। গর্ভকালীন, প্রসবোত্তর, নবজাতক এবং মায়েদের ইউনিটগুলোকে অবশ্যই কভিড-১৯ কেসগুলো থেকে আলাদা করে রাখতে হবে।
সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মিদের, বিশেষ করে মিডওয়াইফ, নার্স, অবস্ট্রেক্টিশিয়ান, এনেস্থিয়োলজিস্ট সবাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে যাতে করে তারা কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হতে না পারে কারণ তারাই জীবন রক্ষার মত জরুরি কাজগুলোতে নিয়োজিত এবং যদি তারা সরাসরি কভিড রোগীর পরিচর্যার কাজে যুক্ত থাকেন তাহলে তাদেরকে অবশ্যই ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোষাকের যোগান দিতে হবে।
মাতৃস্বাস্থ্য এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য ইউএনএফপিএ আরও কিছু সুপারিশ করেছে। যেমন কভিড-১৯ পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই হোক নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক পছন্দ এবং অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে। বিশেষ করে, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি, জরুরী গর্ভনিরোধক বড়ি, নিরাপদ গর্ভপাত এবং গর্ভপাত উত্তর স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি। চিকিৎসা সম্পদের ঘাটতি হলেও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসহ সকল স্বাস্থ্যসেবায় প্রাপ্যতা বজায় রাখতে হবে এবং বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে নাজুক জনগোষ্ঠীর গর্ভবতী নারীদের দিকে, যেমন, প্রতিবন্ধী, অন্য জাতিসত্বার জনগোষ্ঠী, জনগোষ্ঠী এবং হতদরিদ্র জনগণ।
দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংস্থা কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে গর্ভবতী ও প্রসূতি মা এবং সামনের সারির স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। গর্ভবতী নারীদের মধ্যে যারা কভিড আক্রান্ত তাদের শ্বাসতন্ত্রের চিকিৎসা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে বলা হচ্ছে কেননা তা না হলে গর্ভকালিন ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কভিড-১৯ দ্বারা নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য যাতে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়, গর্ভবতী মায়েরা যাতে নিরাপদে বাচ্চা প্রসব করতে পারে, নিয়মিতভাবে গর্ভ ও প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে, নবজাতককে বুকের দুধ পান করাতে পারে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উপরিউক্ত নির্দেশাবলী কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব?
ফলপ্রসূভাবে কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য একটি কর্মক্ষম এবং সক্ষম স্বাস্থ্যব্যবস্থা দরকার। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএ কতৃক মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সুপারিশগুলোর মধ্যে বলা আছে গর্ভবতী মায়েদের কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আলাদা, অথবা আক্রান্ত গর্ভবতী মাদেরকে আলাদা করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেমন কঠোর আইসোলেশন বজায় রাখা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে করে অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়াতে না পারে। কিন্তু যেসমস্ত দেশের সামর্থ্য কম বা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাদের পক্ষে এইসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা আসলে কতখানি সম্ভব?
কভিড-১৯ মহামারিতে স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য খাতের চাইতে জরুরি মা এবং প্রজনন সেবা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে প্রসবকালে নারী এবং নবজাতকের আইসোলেশনের রাখার মত এবং যত্ন পাওয়ার মত সুবিধাদি কম থাকার কারণে। সিজারিয়ান অপারেশন বা এবোরশনের ক্ষেত্রে জীবন রক্ষাকারী কৌশলগুলো বিলম্বিত হতে পারে কর্মীর স্বল্পতা এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে, যেমন- অপারেশন থিয়েটার বা সাধারণ ওয়ার্ড।
বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে পাবলিক হাসপাতালগুলোতে নারী রোগীদের সেরে উঠার জন্য ওয়ার্ডে থাকতে হয় এবং খাবার ও যত্নের জন্য আত্মীয়দের উপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণ ওয়ার্ডে নারীদের জন্য আইসোলেশন তৈরি করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন যা তাদের কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া গর্ভকালীন, প্রসবোত্তর সেবা, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির কাউন্সেলিং অথবা অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার জন্য জনাকীর্ণ জায়গায় লোকজনকে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয় যা নারীদের কভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেই নয় কভিড-১৯ কেন্দ্রিক সামাজিক বিযুক্তির ধারণা শহরের জনাকীর্ণ বস্তি কিংবা যে জায়গাগুলোতে অনেক লোকজন একঘরে ঠাসাঠাসি করে বসবাস করে সে-সমস্ত জায়গায় প্রয়োগ করার চিন্তা ইউটোপিয়া বৈ কিছু নয়।
প্রয়োজনীয় গর্ভকালীন সেবা গ্রহণ করা ছাড়াও গর্ভবতী মা’দের অত্যধিক রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অথবা অন্য কোন বিপদজনক উপসর্গ দেখা দিলে তাদের চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু বর্তমানে যেকোন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেই কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে কভিড-১৯ এর কারণে ঘোষিত সামাজিক দূরত্ব এবং লকডাউনকালে যেসমস্ত নারীদের সন্তান প্রসবের ক্ষণ নির্ধারিত ছিলো তাদের সকলেই নির্বিঘ্নে সন্তান প্রসবে সক্ষম হয়েছেন এমনটা ধারণা করা দুরূহ। কেননা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই বিভিন্ন ধরণের প্রসবকালীন জটিলতা, যেমন- দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা বা বিলম্বিত প্রসব, ভ্রূণ নড়াচড়া না করা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভফুল বের না হওয়া, জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়া, অত্যধিক জ্বর, অত্যধিক মাথাব্যাথা, খিঁচুনি এবং বাচ্চার হা-পা বের হয়ে আসা ইত্যাদি মায়েদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়।
আমরা জানিনা মহামারির এইসময়ে ঠিক কতজন মা এই ধরনের জটিলতা দেখা দেয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে ইউনিসেফ সুপারিশকৃত স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসবোত্তর সেবা প্রদান করা বাংলাদেশের মত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বাস্তবায়ন করা এক অলীক কল্পনা মাত্র। প্রশ্ন জাগে শুধুমাত্র টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নেয়ার বিষয়টিই বাংলাদেশে কতখানি বাস্তবায়ন করা সম্ভব? বিশেষ করে, শহরের বস্তি এলাকা, দুরবর্তী স্থান বা গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর পক্ষে। তবে সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোষাক প্রদান বা প্রাধিকারের ভিত্তিতে করোনা টেস্ট ও পরিচর্যা করা হয়তো সম্ভব ছিল কিন্তু এ-সংক্রান্ত অব্যাবস্থাপনা ও দুর্নীতি আমাদের স্বাস্থ্যনীতির ব্যার্থতাকে ইতিমধ্যে সামনে তুলে এনেছে।
যে কোন মহামারির লিঙ্গীয় প্রভাবও উপেক্ষা করার মত নয়। নারীর লিঙ্গীয় ভূমিকা গর্ভবতী ও প্রসূতি মা’দের অধিকতর কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে কারণ পারিবারিক পরিসরে নারীরাই মূলত শিশু, কিশোর, বয়স্ক ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। ফলে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের যথাসম্ভব পারিবারিক কাজের ভার কমিয়ে দিয়ে পরিবারের অন্যান্য লোকজনের মধ্যে ভাগাভাগি করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মত পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শে গৃহশ্রম বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এটি কতটা সম্ভব? এরইমধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে দেখা গেছে যে মহামারি ঠেকাতে বাধ্যতামূলক সামাজিক বিযুক্তি বরং গৃহস্থালীর সহিংসতা বাড়াতে অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে। তাছাড়া কভিড-১৯ সংক্রমণের সাথে সামাজিক হেনস্তার ভয়, আক্রান্ত গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের ‘একঘরে’ করে রাখা তাদেরকে আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে সে-সম্পর্কেও আমরা ধীরে ধীরে জানতে পারছি।
কভিড-১৯ মহামারির মাধ্যমে বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গীয় এবং সম্পদের অভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরি হতে পারে এবং তার নমুনা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি পাচ্ছি। আয়ের পথ বন্ধ হওয়া, দারিদ্র, ক্ষমতাহীন হওয়া, অসহিষ্ণুতা এই বিষয়গুলো মোটামুটিভাবে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং এ-বিষয়ক অধিকারের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। মানবাধিকার বিষয়ক নীতিমালা আমাদের এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষত মহামারি রেসপন্স এর ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও সমতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে; স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্যতা, সহজলভ্যতা এবং মান নিশিচতকরণের মাধ্যমে; স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে।
আমাদের এসময় বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিতে হবে যে কিভাবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিতভাবে এই সমস্যাকে মোকাবিলা করা যায়। তবে সবার আগে প্রয়োজন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর সদিচ্ছা।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক