ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

আমাদের আরেকটি পৃথিবী নেই

আমাদের আরেকটি পৃথিবী নেই
×

শফিকুল আলম

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০ | ০৭:০৯ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২০ | ০৯:৩৮

নিঃসন্দেহে পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা সম্পর্কে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে আমরা বেশি অবগত। পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের জানার ব্যাপ্তি ও পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। তবে এতকিছুর পরও মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, আমরা কি ব্যক্তিগত জায়গাতে পরিবর্তিত হয়েছি? শুধুমাত্র ভাবনা ও সক্ষমতায় পরিবর্তন আসলেই হবে না। শেষ কবে পরিবেশ সুরক্ষায় আমরা কিছু করেছি?

বরং জেনে বুঝেও আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করে যাচ্ছি যা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।ছোট কাগজের টুকরো থেকে শুরু করে আমাদের হাতে যাই থাকে তা আমরা রাস্তায় ফেলে পরিবেশকে নষ্ট করি । কিন্তু সমানেই হয়তো রয়েছে ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান সেদিকে খেয়ালই নেই।

পরিবেশ সংরক্ষণকে অধিকাংশ সময় অনেক কঠিন কাজ হিসেবে মনে করে আমরা ভুল করি। প্রত্যেকেই আমরা সহজে বাস্তবায়নযোগ্য কিন্তু কার্যকরী অনেক পদক্ষেপ জানি। আর বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু হয়।  যেমন পানি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ কিন্তু আমরা এর শুধু অপচয় নয় একে মারাত্মকভাবে দূষিতও করি। পানি উত্তোলন, পরিশোধন ও সরবরাহ প্রক্রিয়াতে যথেষ্ট পরিমান জ্বালানি খরচ হয়। এ পানি অপচয় বা দূষিত করা হলে শুধু জ্বালানির খরচ বাড়ে তা কিন্তু নয়; প্রচুর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয় যা জলবায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতি ককর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সাথে মিষ্টি পানির বৈশ্বিক চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন দেশ এই পানি সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে নানামুখী সমস্যায় পড়ছে। 

ওয়ার্ল্ড ভিশনের তথ্যঅনুযায়ী বিশ্বে ৮৪ কোটির ও বেশি মানুষ পরিস্কার খাবার পানির অভাবে ভোগে। অনেক দেশেই মহিলা ও কম বয়সী মেয়েদের পানি সংগ্রহে প্রতিদিন বেশ দূরের পথ হাঁটতে হয় এবং এতে করে অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয় - সিডর ও আইলা আক্রান্ত উপকুলীয় অঞ্চলের দিকে তাকালেই তা পরিস্কার হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা এবং বর্ষার সময় ও স্থায়িত্বে পরিবর্তন আসায়, মিষ্টি পানির সংকট ভবিষ্যতে আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হয়ে, এ সমস্যা সমাধানে নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখা যেতে পারে।

আমাদের বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেই ভূমিকা রাখেনা; এ খাতে চল্লিশ লক্ষের ও বেশি মানুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বস্ত্র শিল্পের কারখানাগুলোতে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাস্থাপন ও পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক, যাতে করে রাসায়নিকসমৃদ্ধ (প্রক্রিয়াজাত) পানি নিকটবর্তী নদী বা জলাধারে ফেলার পূর্বে পরিশোধিত করা হয়। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপে কিংবা পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে হোক, অনেক কারখানা বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাস্থাপন করলেও দুঃখজনক যে, কিছু কারখানা বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিচালনা না করে দূষিত পানিকে নদী বা জলাধারে ছেড়ে দিয়ে নদী বা জলাধারের বাস্তুসংস্থানে অপূরণীয় ক্ষতি করছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্কাশন ব্যবস্থা লোক দেখানোর জন্য বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।

এ কথা সত্য, এ ধরণের কোম্পানিগুলো সঙ্গত কারোনেই সর্বোচ্চ মুনাফার লক্ষে পরিচালিত হয়ে থাকে; তবু পরিবেশ দূষণের খরচ ও দায়-ভারতাদেরকেই নেয়া উচিত। এরা পরিবেশেরযে ক্ষতি করছে তার মূল্য হিসেবে নেয়া হলে, যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমরা দেখি তা বাস্তবে কমে যাবে। একারণে, কারখানাগুলোতে পরিবেশবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়নে, পরিবেশ অধিদপ্তর আরো কঠোর হতে পারে। সেই সাথে, বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ কারখানাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেযে প্রনোদনা রয়েছে তা বাড়ানো যায় কিনা খতিয়ে দেখতে পারে।

আর কিছু না হলেও, আমরা কিন্তু গাছ লাগাতে পারি। যদিও ঢাকায় গাছ লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা পাওয়া কষ্ট সাধ্য, তথাপি শহরগুলোতে আরো বেশি গাছ লাগানো সম্ভব এবং বিশেষ করে গ্রামে রাস্তার ধারে তো এটা করাই যায়। স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছরোপনের সুবিধা ও সহ-সুবিধা অনেক।  সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি, প্রাকৃতিকভাবে বায়ু পরিশোধন করে গাছ পরিবেশ দূষন কমায়।  ভারী বর্ষণ এবং বন্যায় ভূমি ক্ষয়রোধে ও গাছগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে কার্বন শোষণ করে বিধায়,  বেশি গাছলাগাতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনেতার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে ।

সম্প্রতি উদযাপিত পরিবেশ দিবসের এ বছরেরর প্রতিপাদ্য ছিল 'সময় এখন প্রকৃতির'।  প্রতিবছর প্রতিপাদ্যে পরিবর্তন আসলেও, পরিবেশ দিবস পালনের উদ্দেশ্য একই –  পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করা যাতে আমরা এই ধরণীকে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বসবাসের উপযোগী করতে পারি।  করোনার এই সংকটময় সময়ে, অন্নান্য বছরের মতো সুযোগ না থাকায়, এ দিবস সীমিত পরিসরে মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে আলোচনা ও কর্মশালার মধ্য দিয়েই বিভিন্ন দেশে পালিত হয়েছে।  পরিবেশ দিবসের পাশাপাশি বছরব্যাপী নানা প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং আলোচনা সভা বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে,  প্রতিবছর পরিবেশ দিবস উদযাপন এবং বিভিন্ন পরিবেশ সংক্রান্ত উদ্যোগ নেয়ার পরও, আমরা পরিবেশ রক্ষায় খুব সহজ ও সাধারণ পদক্ষেপ নিতে এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। 

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন অনেকটা আক্ষেপের সুরেব লেছেন- 'আমরা এমনভাবে সম্পদ ব্যবহার করছি যেন আমাদের দুটো পৃথিবী রয়েছে!' আমাদের একটিই পৃথিবী সাথে রয়েছে সম্পদের সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্যভাবে বললে দ্বিতীয় কোনো পৃথিবীতে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিবেশের যত্ন আমাদেরকেই নিতে হবে এবং কমপক্ষে আমাদের সাধ্য ও নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলি বাস্তবায়নে মনযোগী হতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষুদ্র পদক্ষেপ যেমন একটি গাছ লাগানো অথবা সম্পদের অপচয় রোধ সামষ্টিকভাবে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: প্রকৌশলী ও পরিবেশ অর্থনীতিবিদ; সিনিয়র এডভাইজর হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক কসংস্থায় কর্মরত




আরও পড়ুন

×