ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভাষা

শব্দের শক্তি এবং জাতির অস্তিত্ব

শব্দের শক্তি এবং জাতির অস্তিত্ব
×

খোন্দকার কাওসার আহমেদ

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ২০:৩৭

ভাষারও আছে বংশপরিচয়! পৃথিবীতে থাকতে পারে শতাধিক ভাষা-বংশ। বড় একটা ভাষা-বংশের নাম ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’। এই বংশের ভাষায় অতীতে যাঁরা ভারতবর্ষে কথা বলতেন, তাঁরা পরিচিত ছিলেন ‘আর্য’ নামে। তাই আর্যদের ভাষাকে বলা হয় ‘ইন্দো-আর্য’।

ভারতীয় ইন্দো-আর্য ভাষার প্রাচীন রূপের বেশ কটি শাখা ছিল, তার একটির নাম ‘বৈদিক ভাষা’; এই ভাষায় পবিত্র গ্রন্থ ‘বেদ’ রচিত হয়েছিল বলে এমন নামকরণ হতে পারে। বৈদিক ভাষার ছিল কথ্যরূপ; যে রূপে কথা বলতে পারত সাধারণ মানুষ।

সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ভাষার আদল ও অর্থ বদলে যায়; বৈদিক ভাষাও বদলে যাচ্ছিল। ফলে সেই সময়ের বিখ্যাত পণ্ডিত পাণিনি ব্যাকরণগত দিক থেকে বৈদিক ভাষাকে সংস্কার করে তার একটা স্থায়ী রূপের ব্যবস্থা করেন। সংস্কারকৃত বলে এই স্থায়ী রূপের নাম দেওয়া হয় ‘সংস্কৃত’ তথা সংস্কৃত ভাষা।

পাণিনি অজস্র সূত্র প্রয়োগ করে সংস্কৃত ভাষাকে এনেছিলেন গাণিতিক কাঠামোয়। গাণিতিক কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে বলা যায়: আধুনিক বিশ্বে নানা লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে যে কাজটা নোয়াম চমস্কি করেছিলেন, ভাষা নিয়ে প্রায় অনুরূপ গবেষণা কর্ম পরিচালিত হয়েছিল মহান ভাষাতাত্ত্বিক পাণিনি কর্তৃক আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে। ভাবা যায়!

০২.
ভাষাবিদগণ ভাষাকে তুলনা করেছেন প্রবহমান নদীর সাথে। নদী যেমন বাঁক বদল করে নতুন নতুন ধারার সৃষ্টি করে, ভাষাও তেমনি মানুষের মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে নতুন নতুন ভাষার জন্ম দেয়।

সংস্কৃত ভাষার গাঁথুনি কখনোই এমন ছিল না যে, তা কাঠামোর বাইরে এসে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হতে পারে। ফলাফল, সংস্কৃত ভাষা নতুন কোনো ভাষার জন্মই দিতে পারেনি। পাণিনির ব্যাকরণিক সূত্রগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে, তাতে ‘সংস্কৃত ভাষা’ স্থির ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে; একেবারে বদ্ধ জলাশয়ের মতো। জল শুকোয় না বটে, কিন্তু নতুন কোনো ধারাও তৈরি করতে পারে না। বন্ধ্যা! সম্ভ্রান্ত, পণ্ডিত, ধর্মগ্রন্থ ও লেখনীতেই সংস্কৃত ভাষা ছিল সীমাবদ্ধ।

কিন্তু বৈদিক ভাষার কথ্যরূপ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ভারতের নানা অঞ্চলে নানা রূপে পরিবর্তিত হতে পেরেছিল। এই পরিবর্তনের স্তরবিন্যাস দেখাতেও সক্ষম হয়েছিলেন ভাষাবিজ্ঞানীরা, এবং তাঁরা একেকটি স্তরের নামকরণও করেছিলেন। যেমন: বৈদিকের কথ্যরূপের পরিবর্তিত স্তরের নাম ‘প্রাকৃত’। প্রাকৃতের পরের পরিবর্তিত স্তরের নাম ‘অপভ্রংশ’। এই অপভ্রংশকেও আবার ভাষাবিজ্ঞানীরা অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন।

পূর্ব ভারত ও আশপাশের অঞ্চলে প্রচলিত ছিল ‘মাগধী অপভ্রংশ’; মাগধী অপভ্রংশ থেকেই জন্ম হয়েছিল আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষার। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে: বৈদিক = হস্ত, প্রাকৃত = হত্থ, অপভ্রংশ = হত্থু/হথ, বাংলা ভাষা = হাত।

০৩.
বাংলা ভাষার মূল ভিত্তি বা জেনেটিক কোর হলো ‘তদ্ভব শব্দ’; যেগুলো বাংলায় এসেছে বৈদিক ভাষা থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। বাংলা ভাষাকে যদি মূল ভিত্তি বা তদ্ভব শব্দের মধ্যেই আটকে রাখার ব্যবস্থা হতো, এবং বিবিধ উৎস থেকে বিচিত্র শব্দ আগমনের দুয়ারে কষে খিল এঁটে দেওয়া হতো; তাহলে কী হতো? এর সরল জবাব হচ্ছে: বাঙালির জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ বলে আজ স্বতন্ত্র কিছুর অস্তিত্ব থাকত না। 

জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ গঠনের অন্তরালে অশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি; এসব চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারের।

মানুষ যখন ভাবে, চিন্তা ও কল্পনা করে—তখন সেই চিন্তা, ভাবনা ও কল্পনার জগতেও শব্দরা সক্রিয় থাকে। যার শব্দভাণ্ডার যত বেশি সমৃদ্ধ—তার চিন্তা, ভাবনা ও কল্পনাশক্তিও তত বেশি সমৃদ্ধ। এই বিষয়টিকে ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘লিঙ্গুইস্টিক ডিটারমিনিজম’ বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে ‘স্যাপির-হুইর্ফ হাইপোথিসিস’।

একজন বিখ্যাত দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক, লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন; তিনি তাঁর রচিত বইতে উল্লেখ করেন, আমার ভাষার সীমাই হলো আমার জগতের সীমা।

শব্দ হলো ক্যানভাসের রঙের মতো। রঙ যত বেশি, ছবি তত নিখুঁত। শব্দভাণ্ডার যত সমৃদ্ধ, মস্তিষ্ক তত জটিল ও সূক্ষ্ম কল্পনা করতে সক্ষম; ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও হয় দুর্দান্ত।

শুধু তদ্ভব শব্দভাণ্ডারে বাঙালির প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড হয়তো বাধাগ্রস্ত হতো না; কিন্তু তা দিয়ে জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ গঠনের জন্য উপযুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হতো না। ফলে রাষ্ট্রভাষা তো দূরের কথা, বাংলা হতো একটা প্রান্তিক উপভাষা আর বাঙালিদের টিকে থাকতে হতো উপজাতির ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে!

সুতরাং একথা বলতে আর দ্বিধা নেই যে, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন উৎস থেকে বিচিত্র শব্দ আগমনের বিষয়টি বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির জন্য এক মহা-আশীর্বাদ!

০৪.
বাংলা ভাষাকে একটি গাছের সাথে তুলনা করলে, এর লতাপাতা হলো তদ্ভব শব্দ আর সেই গাছের গোড়ায় বাইরে থেকে যে জল ও সার ছিটানো হয়; সেগুলো হলো আরোপিত শব্দ।

ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর উদ্দেশ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা গদ্য রচনার জন্য বাঙালি পণ্ডিতদের নিয়োগ দেয়। তৎকালীন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ জনমানসে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দগুলো সচেতনভাবে পরিহার করে বাংলা গদ্যে ব্যাপকভাবে আরোপ করেন সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ। তাছাড়া তাঁরা সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসরণ করে অনেক নতুন শব্দও তৈরি করেন, যা বাংলা গদ্যের একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে। মূলত সেই ভিত্তিকে অবলম্বন করেই বাংলা গদ্যের সফল অগ্রযাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ, পণ্ডিতদের আরোপিত সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ এবং উদ্ভাবিত সংস্কৃতজাত শব্দের সুসমন্বয়েই আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলা গদ্য গড়ে উঠতে পেরেছিল। এর ফলে বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতি চর্চায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটে; তাই মূলত বাঙালির নবজাগরণ বা রেনেসাঁসের পথ প্রশস্ত করেছিল। এজন্যই, আবারও বলছি: কোনো ভাষায় আগত শব্দ, আরোপিত শব্দ ও উদ্ভাবিত শব্দ—সেই ভাষা ও ভাষাভাষীদের গতিশীলতার জন্য মহা-আশীর্বাদ!

‘মহা-আশীর্বাদ’—ঠিক আছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে ভাষা কেবল ভাব প্রকাশেরই বাহন নয়; ভাষা একটা জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদিরও ধারক। এখন ভিন্ন কোনো এক উৎস থেকে এমন কতক শব্দ এলো, যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না; সেসব শব্দও হতে পারে জাতির জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে মহা-সর্বনাশের কারণ! যেমন: ক্রাশ, রিলেশনশিপ, বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড ইত্যাদি শব্দগুলোর ক্রমাগত ব্যবহার আমাদের প্রজন্মকে বাংলার আবহমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রবাহ থেকে দুঃখজনকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে!

আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক বা বিয়েকে দেখা হয় পরম পবিত্র ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধন হিসেবে। কিন্তু ওইসব ইংরেজি শব্দ তরুণ-তরুণীদের বিবাহ-পূর্ব সাময়িক বা অস্থায়ী সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার অবাঞ্ছিত পটভূমি তৈরি করছে, যা পাশ্চাত্য ‘ক্যাজুয়াল’ সংস্কৃতিরই অংশ। এই সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির পারিবারিক ঐতিহ্যের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাও একদিন তছনছ করে ছাড়বে; ইতোমধ্যে যার আলামত স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলা নাটক ও বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপে শব্দগুলো হামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই। অথচ অভিযোগ তোলা হচ্ছে বাংলা ভাষার তথাকথিত ‘ইসলামিকরণ’ নিয়ে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর স্যার বোঝানোর চেষ্টা করছেন: ইনসাফ, আজাদী, ইনকিলাব, জালেম, মজলুম বা ফয়সালা ইত্যাদি শব্দগুলো নাকি জাতিকে বিভাজিত করবে! অথচ বিগত চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে এই শব্দগুলোই ছিল জাতির ঐক্য ও সংগ্রামের মূল প্রেরণা।

আফগান কিংবা তালিবানদের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। পরাশক্তিগুলো তাদের পদানত করতে না পারার অন্যতম কারণ হলো তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির (তা যেমনই হোক) প্রতি আপসহীন আনুগত্য। টি-শার্ট, জিন্স, বার্গার, স্যান্ডউইচ, গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড, ব্রেকআপ ইত্যাদি; মোটকথা তাদের যদি পাশ্চাত্য ভোগবাদী সংস্কৃতি ও জীবনধারায় অভ্যস্ত করা যেত, তবে হয়তো তাদের ইতিহাস আজ পরাধীনতার নিকষ আঁধারে ঢেকে থাকত।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলিম, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে মিশে থাকা ইসলামি শব্দগুলোর ব্যবহার অত্যন্ত স্বাভাবিক। এবং এখন যদি ইসলামি শব্দের আরোপনও ঘটে থাকে, তাতেও দোষের কিছু নেই। আমাদের বিচার করা উচিত; আগত শব্দগুলো বাঙালি মুসলিমদের মজ্জাগত মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সাথে কতটুকু সংগতিপূর্ণ।

০৫.
ভাষারও আছে একটা মাতৃরূপ। ভাষা হলো মায়ের মতো। আমরা বলি ‘মাতৃভাষা’। অজ্ঞতা বা বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া মা যেমন কখনো তাঁর সন্তানের অকল্যাণ করেন না, মাতৃভাষাও তেমনি সন্তানের জন্য যা কল্যাণকর; তা-ই গ্রহণ করে থাকে।

বাংলা ভাষা অদ্যাবধি তার ভাষাভাষী সন্তানদের প্রয়োজনে, বিশেষ করে জালিমদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার জন্য যখন যে শব্দবন্ধের প্রয়োজন হয়েছে; তা-ই সাদরে গ্রহণ করেছে। কখনো ‘জিন্দাবাদ’, কখনো ‘জয় বাংলা’, কখনো ‘আজাদী’ কিংবা ‘ইনকিলাব’; মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠে এসব শব্দ তুলে দিতে আমাদের বাংলা ভাষা কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি। এই শব্দগুলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে ‘হিন্দুয়ানি’ কিংবা ‘ইসলামি’ তকমা দিয়ে বিভাজন করাটা মূলত ভাষাতাত্ত্বিকভাবে অনর্থক।

সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েল তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’-তে ভাষাবিজ্ঞানের একটি ভয়ংকর দিক তুলে ধরছেন। তিনি দেখান যে, স্বৈরশাসকরা ডিকশনারি থেকে শব্দ কমিয়ে দিয়ে মানুষের ‘চিন্তা করার ক্ষমতা’ কেড়ে নিতে চায়। কারণ, কোনো বিদ্রোহের নাম বা ধারণা যদি জনগণের শব্দভাণ্ডারে না থাকে; তাহলে তারা সেই বিদ্রোহের কথা চিন্তাই করতে পারবে না।

সুতরাং, এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন জাগে; কারা বাংলা ভাষায় শব্দ-আত্তীকরণে ভয় পায়? তাদের এই ভয় কি আসলে ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে, নাকি মানুষের চিন্তার বিস্তার ও দ্রোহের শক্তিকে রুখে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনা? এই প্রশ্নের উত্তর জাতির জানা উচিত।

খোন্দকার কাওসার আহমেদ: সহকারী শিক্ষক (বাংলা); পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, পাবনা

আরও পড়ুন

×