খাদ্যে ভেজালে নীরব হত্যা
কাজী মাহমুদুর রহমান
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০২
বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল আর শুধু একটি অনিয়ম নয়—এটি আজ এক ভয়াবহ সামাজিক অপরাধে রূপ নিয়েছে, যা প্রতিনিয়ত হাজারো মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিষাক্ত রাসায়নিক, ফরমালিন, রং, শিল্পকারখানার বর্জ্য-এসব এখন আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার অংশ। আমরা যা খাচ্ছি, তা আর খাবার নয়; যেন ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করা এক নীরব বিষ।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই নীরব হত্যাযজ্ঞের দায় কার? আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে, মোবাইল কোর্ট আছে—তবুও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই ভয়াবহ অপরাধ? বাস্তবতা হলো, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং শাস্তির অপ্রতুলতা ভেজালকারীদের সাহস জুগিয়েছে। তারা জানে, ধরা পড়লেও সর্বোচ্চ কয়েক বছরের জেল বা অর্থদণ্ড, যা তাদের অবৈধ আয়ের তুলনায় কিছুই নয়।
একজন ভেজালকারী যখন দুধে বিষ মেশায়, ফলে ফরমালিন দেয়, মশলায় রং মেশায়, তখন সে শুধু প্রতারণা করছে না; সে একটি শিশুর কিডনি নষ্ট করছে, একজন মায়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, একজন বৃদ্ধকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি কি হত্যার শামিল নয়?
যদি কেউ সরাসরি কাউকে হত্যা করে, তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে-তাহলে যারা পরিকল্পিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের সঙ্গে খেলছে, তাদের ক্ষেত্রে কেন একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে না? অনেকে যুক্তি দেন—মৃত্যুদণ্ড কঠোর শাস্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অপরাধের ভয়াবহতার তুলনায় শাস্তি কি যথেষ্ট কঠোর? খাদ্যে ভেজালকারীরা যে ক্ষতি করছে তা তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়ংকর। এটি এক ধরনের ‘স্লো পয়জনিং’—যা আসলে একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অপরাধ একা কেউ করে না। এর সঙ্গে জড়িত থাকে একটি চক্র—উৎপাদক, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী, এমনকি কখনো কখনো প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ও। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং একটি সংগঠিত অপরাধ।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এখন সময় এসেছে কঠোর বার্তা দেওয়ার। খাদ্যে ভেজালকারী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান শুধু প্রতিশোধ নয়-এটি প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে। ইতিহাস বলছে, যেখানে শাস্তি কঠোর এবং প্রয়োগ নিশ্চিত, সেখানে অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
তবে শুধু আইন করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচার হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ নিজেরাই ভেজাল পণ্য বর্জন করে এবং অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই নীরব মৃত্যুকে মেনে নেব, নাকি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করব?
খাদ্যে ভেজাল আর সহ্য করার মতো কোনো অপরাধ নয়। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হওয়া উচিত সর্বোচ্চ।
কাজী মাহমুদুর রহমান: ভোরের সাথী শরীর চর্চা সংগঠন, আফতাব নগর, ঢাকা
- বিষয় :
- খাদ্য সংকট
