মে দিবস
শ্রমিকের অধিকার কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ?
আকাশ চৌধুরী
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ১৭:১২ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ১৮:১২
প্রতিবছর মে দিবস এলে আমরা নতুন করে শ্রমিকদের কথা বলি। তাদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ– সবকিছু নিয়েই নানা আলোচনা হয়। রাষ্ট্র, রাজনীতি, সামাজিক সংগঠন–সবার মুখেই তখন শ্রমিকবান্ধব অবস্থানের কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দিনটি চলে যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির অনেকটাই হারিয়ে যায় দৈনন্দিন ব্যস্ততার ভিড়ে। প্রশ্ন জাগে– মে দিবস কি শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি সত্যিই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে?
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে তাদের ঘাম ও পরিশ্রম জড়িয়ে আছে। গার্মেন্টস শিল্প, নির্মাণ খাত, কৃষি কিংবা পরিবহন– সবখানেই শ্রমিকরা মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। অথচ এ মানুষগুলোর একটি বড় অংশ এখনও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য মজুরি পায় না, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব থাকে, এমনকি দুর্ঘটনার শিকার হলেও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ মেলে না।
শ্রমিকদের এই বাস্তবতা আমাদের উন্নয়নের চিত্রকে আংশিক করে তোলে। কারণ কোনো দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না, যদি শ্রমিকদের জীবন অনিরাপদ ও অনিশ্চিত থেকে যায়।
বর্তমান সময়ে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর নতুন একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই পরিবর্তন দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। শ্রমিকরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা আশা করছে– এই সরকার তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করবে, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে এবং একটি মানবিক কর্মপরিবেশ তৈরি করবে। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, শ্রম আইন বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শৈথিল্য রাখা যাবে না। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই– এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বিপদের সময় রাষ্ট্রের সহায়তা পায়। তৃতীয়ত, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এতে শুধু শ্রমিকদের ব্যক্তিগত উন্নয়নই হবে না, দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট– শ্রমিকদের উন্নয়ন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষকেই এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। শ্রমিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা– এসবই একটি মানবিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।
মে দিবস আমাদের সেই দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি কেবল অতীতের শ্রমিক আন্দোলনের স্মরণ নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি দিকনির্দেশনা। আমরা যদি সত্যিই এই দিনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে চাই, তাহলে আমাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতে হবে।
আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার– আমরা কি সত্যিই শ্রমিকদের জন্য কিছু করতে পারছি, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছি? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে মে দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
অতএব, এবারের মে দিবসে প্রত্যাশা একটাই– নতুন সরকার ও সমাজের সব স্তরের মানুষ একসঙ্গে কাজ করে শ্রমিকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে। কারণ শ্রমিকের হাসিই একটি দেশের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় সূচক। তাদের জীবনমান উন্নত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক
[email protected]
- বিষয় :
- শ্রমিক
