ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

আইভিএফে নিঃসন্তান দম্পতিদের আশা

আইভিএফে নিঃসন্তান দম্পতিদের আশা
×

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

রাশিদা বেগম

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪২ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪৬

২৫ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আইভিএফ দিবস। ১৯৭৮ সালের এই দিনে পৃথিবীর প্রথম আইভিএফ শিশু লুইস ব্রাউন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী সাফল্যই নয়, নিঃসন্তান দম্পতিদের জন্য নতুন আশার দ্বারও উন্মুক্ত করেছিল। এ বছর এই ঐতিহাসিক অর্জনের ৪৮ বছর পূর্ণ হচ্ছে। লুইস ব্রাউনের মায়ের উভয় ডিম্বনালি বন্ধ ছিল। প্রথম দিকে আইভিএফ করার একমাত্র কারণ ছিল উভয় ডিম্বনালি বন্ধ বা নষ্ট হয়ে যাওয়া। মানুষের ক্ষেত্রে আইভিএফ নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কাজ ১৯৬০-এর দশকে শুরু হয়।

১৯৬৯ সালে প্যাট্রিক স্টেপটো ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে রবার্ট এডওয়ার্ডের কাছে পাঠালে এডওয়ার্ড পরীক্ষাগারে প্রথম সফলভাবে মানব ডিম্বাণুর নিষেক ঘটান। পরবর্তী সময়ে তারা এম্ব্রায়ো ট্রান্সফার শুরু করেন ১৯৭২ সালে। টানা ১০১টি ট্রান্সফারে সফলতা পাননি। ১৯৭৬ সালে ১০২ নাম্বার ট্রান্সফারে প্রেগন্যান্সি হলেও সেটি ছিল এক্টোপিক। বারবার ইমপ্লান্টেশন ফেইলিউর এবং ইমপ্লান্টেশন হওয়ার পর আবার এক্টোপিক! ওভাম তৈরির জন্য ড্রাগ ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত হরমোনের জন্য এমন হয় কিনা চিন্তা করে তারা লুইসের মা লেসলি ব্রাউনের ক্ষেত্রে কোনো ওষুধ ব্যবহার করেননি। ন্যাচারাল সাইকেলে যে ডিম্বাণু তৈরি হয় সেটি সংগ্রহ করে নিষেক ঘটান এবং সেটিই প্রথম সফল প্রেগন্যান্সি, যা লেসলি ব্রাউনের প্রথম এটেম্পট ছিল। 

লেসলি ব্রাউনের গর্ভধারণের খবর ফাঁস হওয়ার পর সাংবাদিকরা তাঁকে ক্রমাগত অনুসরণ করছিলেন। সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের তীব্র নজর এড়ানোর জন্য প্রায় গভীর রাতে  সিজারিয়ান করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের প্রথম আইভিএফ জন্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য অপারেশনটি ভিডিও করে রাখা হয়। ১৯৭৭ সালে এম্ব্রায়ো ট্রান্সফার করা হয় এবং ১৯৭৮ সালের জুলাইয়ের ২৫ তারিখে তার জন্ম হয়। 

নয় বছর আগে লুইস ব্রাউন যখন ৪০-এ পদার্পণ করেন, তখন এই ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে লুইস দর্শনের ব্যবস্থা করেছিল এএসআরএম (আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন), সেই ইতিহাসের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম আমি এবং হোসনে আরা বেবী। 
বন্ধ্যত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি নারী অথবা পুরুষ উভয়েরই হতে পারে এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় বন্ধ্যত্বের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। আইভিএফ ও অন্যান্য সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বর্তমানে অসংখ্য দম্পতির সন্তান লাভের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। 

তবে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, সামাজিক কুসংস্কার, মানসিক চাপ এবং মানসম্মত সেবার সীমিত প্রাপ্যতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই বিশ্ব আইভিএফ দিবস শুধু সাফল্য উদ্‌যাপনের দিন নয়; এটি বন্ধ্যত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করা এবং সবার জন্য নিরাপদ, নৈতিক, সহানুভূতিশীল ও সাশ্রয়ী প্রজননসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান।

সর্বোপরি বাংলাদেশের মতো যেসব দেশে আইভিএফের নীতিমালা নেই, সেখানে রোগী যাতে প্রতারিত না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা। আইভিএফ কারও কারও জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা হতে পারে কিন্তু সবার জন্য অবধারিত নয়। মাত্র ১০ শতাংশ ইনফার্টাইল দম্পতির আইভিএফ প্রয়োজন হয়। নব্বই শতাংশের জন্য আছে নানা চিকিৎসা; যা একজন দক্ষ গাইনোকলজিস্ট এবং একাধারে একজন গাইনোকলজিস্ট ও ফার্টিলিটি স্পেশালিষ্ট ছাড়া জানেন না। কিন্তু অনেকেই গাইনোকলজিস্ট নয়, অথচ পেশেন্টকে আইভিএফ করছে। যেখানে কখনোই পেশেন্ট সিলেকশন সঠিক হয় না। ফলে অনেকেরই অকারণে আইভিএফ হচ্ছে। আইভিএফে প্রেগন্যান্সির নিশ্চয়তা দিতে পারবে এমন গাইনোকলজিস্টের অস্তিত্ব নেই। তাই রোগীর উচিত খোঁজখবর নিয়ে সঠিক জায়গায় চিকিৎসা নেওয়া।

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম: ইনফার্টিলিটি ও আইভিএফ বিশেষজ্ঞ, চিফ কনসালট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার

আরও পড়ুন

×