ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মাদক নিয়ন্ত্রণে বিজিবি এবং নতুন আইনি ভিত্তি

মাদক নিয়ন্ত্রণে বিজিবি এবং নতুন আইনি ভিত্তি
×

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)

সাঈফ ইবনে রফিক

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ২০:০০

মাদক নিয়ন্ত্রণ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রথম বা প্রধান দায়িত্ব নয়। একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে বিজিবির মূল দায়িত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা। কিন্তু সীমান্ত যখন আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের প্রধান প্রবেশপথ, তখন মাদক প্রতিরোধও সীমান্ত নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ফলে মাদকবিরোধী লড়াইয়ে বিজিবি কোনো পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও বিজিবির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকে পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেছে। আর সদ্য পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ সীমান্তে বিজিবির সেই ভূমিকাকে আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দুটি বৃহৎ মাদক বলয়–গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের প্রভাববলয়ের কাছাকাছি অবস্থিত। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ, ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন এবং আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে কোকেনসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ খুব কম।

২০২৫ সালে বিজিবি এক হাজার ৯০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য ও মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে। তবে প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় জাতীয় পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে। দেশে জব্দ হওয়া মোট কোকেনের ৯৩ দশমিক ১৫ শতাংশ, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের ৫০ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ইয়াবার ৩৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ বিজিবি একাই জব্দ করেছে। অর্থাৎ সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট-নিয়ন্ত্রিত মাদকগুলোর ক্ষেত্রেই বিজিবির জব্দের হার সবচেয়ে বেশি– এটাই বলে দেয়, সীমান্তে প্রতিরোধ যতটা কার্যকর হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ভাঙা ততটাই কঠিন থেকে যায়। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও নেশাজাতীয় ইনজেকশন উদ্ধার করেছে এবং দুই হাজার ৩৩৪ জনকে আইনের আওতায় এনেছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু সফল অভিযানের হিসাব নয়; এগুলো দেখায়, দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিপুল পরিমাণ মাদক সীমান্তে আটকে যাচ্ছে।
তবে আরেকটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ডিএনসির তথ্য বলছে, ইয়াবার একটি বড় অংশ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সংস্থার হাতে জব্দ হয়েছে। অর্থাৎ কিছু মাদক সীমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হচ্ছে। এখান থেকেই অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয় যে দেশে মাদক পাওয়া মানেই বিজিবির ব্যর্থতা। বাস্তবতা এত সরল নয়।
বিজিবির দায়িত্ব সীমান্ত ও সীমান্তবর্তী নির্ধারিত এলাকায়। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে একটি চালান যখন বরিশালের কোনো চর, রাজবাড়ীর কোনো গ্রাম কিংবা ঢাকার কোনো আবাসিক এলাকায় পৌঁছে যায়, তখন সেটি আর শুধু সীমান্তের বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভ্যন্তরীণ পরিবহন, গুদামজাতকরণ, অর্থায়ন, খুচরা সরবরাহ এবং মাদকের চাহিদা। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি বহুস্তরীয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সীমান্তে বিজিবি, দেশের ভেতরে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র‍্যাব, কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই যুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য সম্ভব নয়।
এ কারণেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ১৩গ ধারায় সীমান্তবর্তী এলাকা, স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিশেষ নজরদারি, তল্লাশি, স্ক্যানার, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক প্রতিরোধ এখন আর কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, আইনি বাধ্যবাধকতা।
একই সঙ্গে নতুন ১৩ক ধারায় একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা তথ্যভান্ডার গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে ডিএনসি, বিজিবি, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, র‍্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তথ্য বিনিময় করবে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ঘাটতি মাদকবিরোধী অভিযানের বড় দুর্বলতা ছিল। এই তথ্যভান্ডার কার্যকর হলে সীমান্তে পাওয়া তথ্য দেশের ভেতরের তদন্তে এবং দেশের ভেতরে পাওয়া তথ্য সীমান্ত অভিযানে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন মনো-সক্রিয় মাদক শনাক্তে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং জব্দকৃত মাদক দ্রুত ধ্বংসের বিধানও আইনে যুক্ত হয়েছে।
পাচারের রুট শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এটাও নতুন আইনে স্বীকৃত। সংযোজিত ৩৫ক ও ৩৬ক ধারায় প্রথমবারের মতো সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক লেনদেনকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে– ডার্ক ওয়েব, সামাজিক মাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিজ্ঞাপন এখন থেকে সমান দণ্ডযোগ্য, আর সংঘবদ্ধ বা আন্তর্জাতিক চক্রের ক্ষেত্রে সাজা আরও কঠোর। পাচারকারীরা যেভাবে ভৌত সীমান্তের পাশাপাশি ডিজিটাল রুট ব্যবহার শুরু করেছে, আইনের এই অংশটি তারই স্বীকৃতি ও জবাব।
তবে আইনই শেষ কথা নয়। স্ক্যানার, ড্রোন, ডগ স্কোয়াড, আধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। একইভাবে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কাগজে নয়, মাঠে কার্যকর করতে হবে। পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত রুট ও কৌশল বদলাচ্ছে; রাষ্ট্রকে প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় তাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে।
আরও একটি সত্য মনে রাখা জরুরি। কোনো দেশ শুধু সীমান্তে মাদক আটকিয়েই মাদকমুক্ত হতে পারেনি। যতদিন চাহিদা থাকবে, ততদিন নতুন রুটও তৈরি হবে– তা সড়কপথে হোক বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। তাই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনসচেতনতা, আসক্তদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং তরুণদের মধ্যে মাদকের চাহিদা কমানোর উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান দেখিয়েছে, সীমান্তে বিজিবি দেশের জন্য একটি কার্যকর নিরাপত্তা ছাঁকনি। ২০২৬ সালের সংশোধিত আইন সেই বাস্তবতাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন প্রয়োজন আইনটি দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার এবং সীমান্ত নিরাপত্তাকে আধুনিকায়ন করা। কারণ মাদক আজ শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে এক নীরব আগ্রাসন। সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সীমান্তে বিজিবির প্রতিটি সফল অভিযান কেবল মাদক জব্দ নয়, রাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সাঈফ ইবনে রফিক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×