ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

রেমিট্যান্স

প্রবাসীদের ঘামে গড়ে উঠুক নতুন কর্মসংস্থান

প্রবাসীদের ঘামে গড়ে উঠুক নতুন কর্মসংস্থান
×

মোস্তাফিজুর রহমান

মোস্তাফিজুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:১৩

বাংলাদেশে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অর্থাৎ প্রায় চার লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রবাসীরা এক বছরে দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৭.৪ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার জন্য এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে নীতিগত আলোচনায় এখন শুধু কত রেমিট্যান্স এসেছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা যথেষ্ট নয়; বরং বিবেচনা করা প্রয়োজন এই অর্থ কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে এবং দেশে ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করছে।

১২টি দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স নিয়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা, দ্বিপক্ষীয় বিনিময় হার এবং সরকারি প্রণোদনা আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। করোনাকালে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রবাসীরা সংকটে থাকা পরিবারকে সহায়তা করতে চেয়েছেন, হুন্ডি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়েছিল এবং সরকারি প্রণোদনা বৈধ পথে অর্থ পাঠানোকে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে আসে। সেখানে দেখা যায়, অভিবাসীর সংখ্যা, বিনিময় হার ও সরকারি প্রণোদনা রেমিট্যান্স প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রণোদনার ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট।

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ২.৫ শতাংশ নগদ রেমিট্যান্স প্রণোদনা বহাল রেখেছে। এটি হঠাৎ বন্ধ করা উচিত হবে না। আকস্মিকভাবে প্রণোদনা প্রত্যাহার করলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ও হুন্ডির মধ্যকার আর্থিক ব্যবধান আবারও বাড়তে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সবার জন্য একই হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া সরকারের জন্য ব্যয়বহুল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা হিসাব করলে এর ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।

তাই প্রণোদনা বাতিল নয়, বরং এর কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন। একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে নগদ প্রণোদনার একটি অংশ এমন সুবিধায় রূপান্তর করা যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

বাস্তবসম্মত রূপান্তর পরিকল্পনায় প্রথম পর্যায়ে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখা যেতে পারে। এরপর তিন বছরের পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে একে ধীরে ধীরে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১ শতাংশ সরাসরি নগদ প্রণোদনা, ০.৭৫ শতাংশ অর্থ পাঠানোর ফি কমাতে এবং অবশিষ্ট ০.৭৫ শতাংশ একটি ঐচ্ছিক দীর্ঘমেয়াদি প্রবাসী সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এসব হার রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, পরীক্ষামূলক ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত।

হুন্ডি ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ লেনদেন ফি, এই ফি কমানো হুন্ডি মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে। সব রেমিট্যান্সে একই হারে নগদ অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে সরকার নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ফি বহন করতে পারে। নিম্ন আয়ের কর্মী এবং যেসব দেশ থেকে বৈধভাবে অর্থ পাঠানো তুলনামূলক ব্যয়বহুল, সেসব করিডোরকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। অর্থ পাঠানোর আগে প্রবাসী যেন স্পষ্টভাবে জানতে পারেন– বিনিময় হার কত, মোট ফি কত, সরকারি সহায়তা কত এবং দেশে তাঁর পরিবার ঠিক কত টাকা পাবে।

প্রণোদনার দীর্ঘমেয়াদি অংশ ঐচ্ছিক ‘প্রবাসী ভবিষ্যৎ হিসাব’-এ জমা হতে পারে। নিয়মিত বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো কর্মীদের জন্য সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ সঞ্চয় যোগ করতে পারে। দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসা, অবসর গ্রহণ, স্থায়ী অক্ষমতা অথবা নির্দিষ্ট সময় বিদেশে কাজ করার পর সেই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এই হিসাব থেকে পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা, সন্তানের শিক্ষা, পুনঃদক্ষতা প্রশিক্ষণ অথবা দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করার সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ফলে প্রতিবার অর্থ পাঠানোর ক্ষুদ্র নগদ সুবিধার পরিবর্তে কর্মজীবন শেষে একটি অর্থবহ নিরাপত্তা তহবিল গড়ে উঠবে।

আরেকটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হতে পারে নিয়ন্ত্রিত ‘রেমিট্যান্স বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তহবিল’। প্রবাসীরা চাইলে তাদের রেমিট্যান্সের একটি অংশ পেশাদারভাবে পরিচালিত বিনিয়োগ তহবিলে রাখতে পারবেন। পুরো ২.৫ শতাংশ নগদ দেওয়ার পরিবর্তে সরকার তাদের বিনিয়োগের একটি অংশের সঙ্গে সমপরিমাণ অর্থ যোগ করতে পারে।

এই তহবিল নিরীক্ষিত গ্রামীণ উদ্যোগ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গুদাম, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং ক্ষুদ্র উৎপাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারে। এতে প্রবাসী ও তার পরিবার বিনিয়োগের মালিকানা ও লভ্যাংশ পাবেন, পাশাপাশি দেশে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

দেশে শূন্য-জমার ডিজিটাল রেমিট্যান্স হিসাব চালু করা যেতে পারে। দেশে থাকা প্রাপক এনআইডি, মোবাইল নম্বর ও চেহারা যাচাইয়ের মাধ্যমে এবং বিদেশে থাকা কর্মী এনআইডি, পাসপোর্ট ও বিএমইটি নিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অনলাইনে হিসাব খুলতে পারবেন। প্রাথমিক জমা, পরিচয়দানকারী ব্যক্তি বা ব্যাংক শাখায় উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। সাধারণ গ্রাহকের হিসাব খোলার পুরো প্রক্রিয়া ১০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

একবার পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হলে হিসাবটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রাপক তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ গ্রহণ, উত্তোলন, বিল পরিশোধ, সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করতে পারবেন। অতিরিক্ত কাগজপত্র কেবল তখনই চাওয়া উচিত, যখন লেনদেন অস্বাভাবিক বড় বা সন্দেহজনক হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট সেবামান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স একই দিনে জমা দিতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাপকের হিসাবে পৌঁছানো উচিত। সরকারি প্রণোদনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে এবং অভিযোগের প্রাথমিক জবাব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে।

প্রতি তিন মাসে প্রতিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গড় ফি, বিনিময় হারের ব্যবধান এবং অর্থ পৌঁছানোর সময় প্রকাশ করা যেতে পারে। কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলে তা শুধু হুন্ডি ব্যবহার না করার আহ্বানের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে।

অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রেরণকারীদের স্বাধীনভাবে হিসাববহির্ভূত লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তবে ছয় মাসের একটি রূপান্তরকালীন সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, যাতে যোগ্য অপারেটররা ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ হাউস বা মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেন।

২.৫ শতাংশ প্রণোদনার কাঠামো পরিবর্তনের আগে নির্বাচিত রেমিট্যান্স করিডোর ও কয়েকটি গ্রামীণ জেলায় এসব উদ্যোগ পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা উচিত। মূল্যায়নে দেখা হবে– সরকারি ব্যয়ের প্রতি টাকায় কত অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স এসেছে, লেনদেনের সময় কত কমেছে, পরিবারগুলোর সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কত বেড়েছে, কতটি নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, ঋণ পরিশোধের হার কী এবং প্রবাসীদের সন্তুষ্টি কতটা বেড়েছে।

নীতির মূল লক্ষ্য শুধু ভর্তুকির ব্যয় কমানো হওয়া উচিত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত সাময়িক নগদ সহায়তাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্যে রূপান্তর করা। কম লেনদেন ব্যয়, সহজ ডিজিটাল হিসাব, কর্মজীবন-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা, সরকারি সঞ্চয় সহায়তা এবং স্বেচ্ছামূলক বিনিয়োগ– এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমনি দেশে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানও বাড়বে।

মোস্তাফিজুর রহমান: গবেষণা কর্মকর্তা, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

[email protected]

আরও পড়ুন

×