ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিতে চাই একাডেমিক সুপারভাইজার

আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিতে চাই একাডেমিক সুপারভাইজার
×

মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:১৯

শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি ভেঙে একটি যুগোপযোগী, আনন্দময় ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে আনন্দের সঙ্গে শেখার পরিবেশ তৈরি করা, মুখস্থনির্ভরতার বদলে অভিজ্ঞতা ও প্রয়োগভিত্তিক শিখন নিশ্চিত করা এবং প্রতিভার বিকাশ ঘটানোই হওয়া উচিত আমাদের কারিকুলাম ও শিক্ষাদানের মূল দর্শন।

তবে শুধু নীতি কিংবা কারিকুলাম আধুনিক করলেই হবে না, কারণ তার আসল প্রতিফলন ঘটে বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরে। সেখানে এই আনন্দময় ও কার্যকর শিক্ষার বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করে শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, পাঠদান কৌশল, আনন্দময় শিখন সামগ্রী ব্যবহার এবং কার্যকর মূল্যয়নের ওপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পাঠ পর্যবেক্ষণ ও ফিডব্যাক দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই ইন্সট্রাক্টর, ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর, নেপসহ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে একাডেমিক পর্যবেক্ষণ আকাশকুসুম কল্পনা। এই শূন্যতা পূরণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবিলম্বে একাডেমিক সুপারভাইজার পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ আবশ্যক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক (একাডেমিক) পদ এবং কলেজে উপাধ্যক্ষ (একাডেমিক) পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। 

বর্তমানে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষদের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয় প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন তদারকি, উপবৃত্তি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক হিসাবরক্ষণ, সরকারি দপ্তরে রিপোর্ট প্রদান, পরিচালনা কমিটির সভা কিংবা নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কার্যক্রম সামলাতেই তাদের সারাদিন কেটে যায়। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষে কী পড়ানো হচ্ছে, শিক্ষকরা লেসন প্ল্যান অনুসরণ করছেন কিনা কিংবা কোনো শিক্ষক একপক্ষীয় লেকচার পদ্ধতিতে পড়াচ্ছেন কিনা, তা নিয়মিত তদারক করার সময় পান না। পাঠদানের গুণগত মান যাচাই এবং শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্ধারিত ‘একাডেমিক লিডার’ না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম একটি গতানুগতিক রুটিনে আটকে গেছে।

উন্নত দেশগুলোতে (যেমন– ফিনল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া) প্রশাসনিক নেতৃত্ব এবং একাডেমিক বা ইনস্ট্রাকশনাল নেতৃত্বকে স্পষ্টত দুটি পৃথক ধারায় ভাগ করা হয়। সেসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলের প্রধান বা প্রিন্সিপালের পাশাপাশি ‘ইনস্ট্রাকশনাল কোচ’, ‘প্যাডাগজিক্যাল লিডার’ অথবা ‘ভাইস প্রিন্সিপাল (একাডেমিক)’ থাকেন। তাদের প্রধান কাজই হলো নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইনস্ট্রাকশনাল কোচ’ শিক্ষকের বিচারক হিসেবে বা শুধু ভুল ধরতে শ্রেণিকক্ষে যান না, বরং একজন পরামর্শক হিসেবে যান। শ্রেণি কার্যক্রমের পর তারা শিক্ষকের সঙ্গে একা বসেন, ক্লাসের গুণগত দিক বিশ্লেষণ করেন এবং কীভাবে পাঠদানকে আরও আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক করা যায় তার ফিডব্যাক দেন। এমনকি প্রয়োজনে ওই বিশেষজ্ঞ নিজে ক্লাসে একটি ‘ডেমো ক্লাস’ নিয়ে শিক্ষককে দেখিয়ে দেন কীভাবে পাঠদান কার্যক্রম আরও আনন্দময় ও কার্যকর করা যায়। 

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে ‘প্রফেশনাল লার্নিং কমিউনিটির (পিএলসি)’ ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন একাডেমিক সুপারভাইজারের নেতৃত্বে শিক্ষকরা সপ্তাহে বা মাসে অন্তত একবার নিজেরা বসে নিজেদের পাঠদান কৌশল পর্যালোচনা করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পদে তাদেরকেই বসানো হয়, যাদের শিক্ষাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণা রয়েছে।

শুধু বয়সের জ্যেষ্ঠতা বা কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা একজন শিক্ষককে ভালো একাডেমিক তদারককারী বানানোর জন্য যথেষ্ট নয়। শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ, কারিকুলাম ম্যাপিং, আধুনিক অ্যাসেসমেন্ট রুব্রিক্স বোঝা কিংবা শিখন মনোবিজ্ঞান জানার জন্য শিক্ষাবিজ্ঞানের ডিগ্রি ও বিশেষায়িত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান থাকা জরুরি।

শিক্ষাবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী সহকারী প্রধান শিক্ষক (একাডেমিক) বা উপাধ্যক্ষ (একাডেমিক) নিশ্চিত করবেন যে ক্লাসে শিক্ষক কেবল তথ্যের জোগান দিচ্ছেন না, বরং শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে প্রশ্ন করতে পারছে, দলগত কাজ করছে এবং নিজেদের চিন্তা প্রকাশ করতে পারছে।

যদি প্রতিটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজে এই বিশেষায়িত পদটি কার্যকর করা যায়, তবে তাদের প্রধান কাজগুলো হবে: লেসন প্ল্যান ও কারিকুলাম তদারকি, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ ও গঠনমূলক ফিডব্যাক,  ইন-হাউস প্রশিক্ষণ ও ডেমো ক্লাস, শিখন-ঘাটতি ও ডেটা বিশ্লেষণ এবং সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনা।

স্কুল পর্যায়ে একজন নিবেদিত একাডেমিক তদারককারী থাকলে দেশের শিক্ষা খাতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এতে শিক্ষকদের দক্ষতার স্থায়ী উন্নয়ন হবে, আনন্দময় ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হবে, পরীক্ষানির্ভরতা থেকে মেধা বিকাশ হবে এবং সর্বোপরি জাতীয় কারিকুলামের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে।

আনন্দময় ও রূপান্তরমূলক শিক্ষা কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের শেখায় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষা প্রক্রিয়ার মান উন্নত না করলে শিক্ষার সামগ্রিক মান বৃদ্ধি অসম্ভব। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে আনন্দময়, আধুনিক ও কার্যকর করতে হলে প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজের বাইরে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে একজন একাডেমিক সুপারভাইজার পদ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

নীতিনির্ধারকদের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ অবিলম্বে গ্রহণ করা উচিত। নতুবা যতই উন্নত শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম প্রস্তুত করা হোক না কেন, প্রত্যন্ত পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন হবে না। 

মেহেদী হাসান: এডুকেশন প্রফেশনাল

আরও পড়ুন

×