স্যার ফজলে হাসান আবেদের বংশধারার গৌরবগাথা
ফাইল ছবি
সৈয়দ কামালউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২০ | ১০:৫৬ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২০ | ১০:৫৯
স্যার ফজলে হাসান আবেদের রক্তধারায় পূর্ববর্তী সপ্তম পুরুষ থেকে বংশ পরম্পরায় সিপাহসালার শাহ সৈয়দ নাসিরউদ্দিন (র.) বংশীয়দের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। ভারত উপমহাদেশে সচরাচর এমন পরিবারের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয় না। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এরূপ আত্মীয়তার বন্ধন হয়ে এসেছে, সেহেতু এসব আত্মীয়তার যোগসূত্র অনুসন্ধানপূর্বক। তাদের পরিবার কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে হবিগঞ্জ জেলায় স্থানান্তরিত হওয়ার প্রেক্ষাপটেও অনেক কাহিনি নিহিত রয়েছে। তার পূর্বপুরুষরা মূলত কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার অন্তর্গত জোয়ানশাহী পরগনার দিলালপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাহেরনগর গ্রামের বাসিন্দা।
বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বাজিতপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাহেরনগর নিবাসী কাজি (বিচারক) মৌলভী আমজাদ-উল-হাসান সাহেবের পুত্র তৎকালের প্রখ্যাত আলেম মৌলভী আনিস-উল-হাসান হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মীর মহল্লা সাহেব বাড়ি নিবাসী কথিত বানিয়াচং রাজ্যের কাজি-উল কোজাত (প্রধান বিচারপতি) মৌলভী সৈয়দ ওয়াজিহ্ উদ্দিন এবং দেওয়ান আসমা বানুর ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা নসিবা বানুর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। এক শুভলগ্নে এই সুখী-সমৃদ্ধশালী দম্পতির ঔরসজাত এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় মৌলভী উবেদুল হাসান। শিশুকালে এই উবেদুল হাসান ধনীর দুলাল হিসেবে হেসে-খেলে বেড়ে উঠতে থাকেন। কিছুকাল যেতেই এই শিশুর জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তার বাবা হঠাৎ নিখোঁজ। জানা যায়, তার বাবা মৌলভী আনিস-উল-হাসান ইসলামের খেদমতে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে একদা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বহুদিন অতিবাহিতের পরও তিনি আর নিজ পরিবারে ফিরে আসেননি। দেখতে দেখতে অবোধ বালক উবেদুল হাসানের তিন বছর পেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যে শোকাহত মা এবং অবোধ পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও একটি মর্মান্তিক-অসহনীয় ঘটনার অবতারণা হয়। এ প্রসঙ্গে জানা যায়, নিখোঁজ মৌলভী আনিস-উল-হাসানের এক বোন ছিলেন। তার নাম ছিল হাজেরা বানু বিবি। তার বাবা তাদের বিষয়-সম্পত্তি এবং অদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একজন খানেদামান্দ বা ঘরজামাই খুঁজছিলেন। এ প্রসঙ্গে চতুর্দিকের লোকজন লাগিয়ে অনুসন্ধান করতে থাকেন। অনেক দিন খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে সব দিক দিয়ে উপযুক্ত এবং মনমতো এক পাত্রের সন্ধান পেলেন। তিনি হলেন কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত পাকুন্দিয়া উপজেলার পুলেরঘাট বাজার সংলগ্ন কালিয়াচাপড়া গ্রাম নিবাসী। শিক্ষিত-মার্জিত এক সল্ফ্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তার নাম মৌলভী মোহাম্মদ সাদী। তৎসময়ে তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্গত শেরপুর দেওয়ানি আদালতের মুনসেফ। অবশেষে হাজেরা বানু বিবিকে শর্তসাপেক্ষে তার কাছে বিয়ে দিলেন। তাকে খানেদামান্দ করে বাহেরনগর এনে তার পরিবারভুক্ত করেন। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার পরও যখন নিখোঁজ ভাই ফিরে এলেন না, তখন হাজেরা বিবি ভাইকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। শরিয়াহ মোতাবেক সব সম্পত্তির তিনিই একক মালিক বলে দাবি করেন। কোনো রকমে দিনযাপন করছিলেন নসিবা বানু। এমতাবস্থায় বঞ্চিতা সৈয়দা নসিবা বানু তার পিত্রালয় বানিয়াচংয়ের মীর মহল্লায় চলে আসেন।
কিছুদিন পর সৈয়দা নসিবা বানুর বাবার মৃত্যুর পর তার সহোদর ভ্রাতা মীর সৈয়দ গোলাম হাফেজ বোন-ভাগ্নের দায়িত্ব সাদরে গ্রহণ করেন। তখন তিনি করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্গত লাতু মুনসেফি কোর্টের প্রধান মুনসেফ ছিলেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে বিবাহিত এবং এক পুত্রসন্তানের জনক ছিলেন। তার পুত্রের নাম ছিল সৈয়দ গোলাম ইমাম। ভাগ্নে মৌলভী উবেদুল হাসানের বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ায় পরম হিতৈষী এই মহান ব্যক্তি তাকে পিতৃস্নেহসহ আদর-সোহাগ দিয়ে লালন-পালন করতে থাকেন। তার পুত্র ও ভাগ্নে প্রায় সমবয়সী হওয়ায় দু'জন একসঙ্গেই মক্তব-স্কুলে যাতায়াত করতেন। তিনি স্নেহের পুত্র এবং ভাগ্নেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়াসে লেখাপড়া করার জন্য তাদের কলকাতা শহরে পাঠিয়ে দেন। ইতোমধ্যে মুনসেফ সাহেবের পরপর দু'জন কন্যাসন্তানও জন্মগ্রহণ করেন। ফুফাতো-মামাতো ভাইয়েরা পরস্পরে মিলেমিশে কলকাতা শহরে লেখাপড়া নিয়ে ঈপ্সিত লক্ষ্য অভিযোজনে মনোনিবেশ দান করেন। অতীব মনযোগ সহকারে লেখাপড়া করে দু'জনেই উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করতে সক্ষম হন। এক পর্যায়ে মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের পিতামহ নাতিকে দেখার জন্য বানিয়াচংয়ের মীর মহল্লা সাহেব বাড়িতে বেড়াতে আসেন।
মৌলভী উবেদুল হাসান তার আপন মামা বানিয়াচংয়ের মীর মহল্লা নিবাসী মুনসেফ মীর সৈয়দ গোলাম হাফেজ এবং দেওয়ান নূরচান্দ বানুর কন্যা সৈয়দা আলীমা বানুকে বিয়ে করেন। সৈয়দা আলীমা বানুর মাতামহ ছিলেন দেশ বিখ্যাত বানিয়াচং রাজ্যের রাজা বাহাদুর দেওয়ান উমেদুর রাজা। তাদের ঔরসজাত এক পুত্র ও এক কন্যা ছিলেন। সৈয়দা আলীমা বানুর ছোট বোন সৈয়দা সফিনা বানুর বিয়ে হয় রাজবাড়ির দেওয়ান আমান রাজার সঙ্গে। সেমতে দেওয়ান আমান রাজা মৌলভী উবেদুল হাসানের সম্পর্কে ভায়েরা ভাই হন। মার্টিন লুথারের সঙ্গে মৌলভী উবেদুল হাসান দীর্ঘকাল কাজ করার ফলে পরস্পরে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এমনিভাবে বেশ কিছুদিন অতিক্রান্তের পর একসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মার্টিন লুথারকে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে বদলি করা হয়। মৌলভী উবেদুল হাসানের সঙ্গে মার্টিন লুথারের গভীর সম্পর্ক থাকায় লুথার উবেদকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা ছেড়ে নতুন কর্মস্থল মুর্শিদাবাদ চলে যান। ইতোমধ্যে উবেদুল হাসানের সহধর্মিণী সৈয়দা আলীমা বানু পরলোকগমন করেন। এ সংবাদ পেয়ে খুবই মর্মাহত হন উবেদুল হাসান। শোকাহত উবেদুল হাসান লুথারকে সঙ্গে নিয়ে বানিয়াচং যান। প্রিয় সহধর্মিণীর কবর জিয়ারত করেন। একজন সল্ফ্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে লুথার মৌলভী উবেদুল হাসানকে নবাব আলীবর্দী খানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মুর্শিদাবাদে কিছুদিন অবস্থানের পর মৌলভী উবেদুল হাসানের জ্ঞান-গৌরবের প্রদীপ আরও প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। তৎকালে একদা হায়দরাবাদের নিজাম (অধিপতি) নবাব মীর হায়দর আলী কর্তৃক মুর্শিদাবাদের নবাব আলীবর্দী খান বরাবরে একখানা পত্র পাঠানো হয়। মজার ব্যাপার হলো, খামের ওপরে প্রাপক ও প্রেরকের নাম-ঠিকানা ফার্সি ভাষায় যথাযথভাবেই লেখা ছিল। কিন্তু খামের ভেতরের মূল পত্রখানা ছিল সাদা। এই রহস্যাবৃত পত্র খানার বিষয়-বৃত্তান্ত কারও বোধগম্য হচ্ছিল না। নবাব সাহেবের সভাসদসহ অনেক জ্ঞানী-গুণীজন কোনো রকম কূলকিনারা করতে পারলেন না। এক পর্যায়ে এই তাৎপর্যপূর্ণ বা দুর্বোধ্যতায় আচ্ছন্ন পত্র খানার মর্মোদ্ধার কিংবা এমন দুর্বোধ্য লেখা পাঠোদ্ধারের নিমিত্তে নবাব সাহেব সব বিষয়ে পারদর্শী মৌলভী উবেদুল হাসানের সাহায্য কামনা করেন। পরিশেষে, এই পত্রখানা মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের কাছে হস্তান্তর করা হলো। অতঃপর সৌভাগ্যশালী মৌলভী উবেদুল হাসান এই অদ্ভুত পত্র খানা নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন, না ভয় পাওয়ার মতো এখানে তেমন কিছুই নেই। ফের বাতি নিভিয়ে তীক্ষষ্ট দৃষ্টিদান করে বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন- দেখলেন ওই রহস্যাবৃত পত্র খানা ঝলমল করছে। কী আশ্চর্য! ঘোর অন্ধকারে স্পষ্টভাবে অক্ষরগুলো ভেসে উঠেছে। এ যেন আবৃত রহস্যের আবরণ সরে গিয়ে উন্মোচিত হলো সেই 'চিচিং ফাঁক'-এর মতো গুপ্তধন ভাণ্ডার। রাতের ঘনঘোর অন্ধকারে ওই পত্র খানার আগাগোড়া পাঠ করতে সমর্থ হলেন বিজ্ঞ উবেদুল হাসান। এমন আজব চিঠি কী করে, কোন পদার্থের সাহায্যে লেখা হলো। সেসব নিয়ে আবার অনুসন্ধান শুরু করলেন। দেখা গেল অতি নগণ্য বা তুচ্ছ একটি কীট। যাকে কেঁচো আবার গ্রাম্য ভাষায় জির বলা হয়। এটা সাধারণত ভূমিমধ্যস্থ কৃমি জাতীয় কীট বিশেষ বা কৃমিসদৃশ পোকা।
অতঃপর আর কোনো রকম অস্বস্তিকর ঝঞ্ঝাট হলো না। নবাব মীর হায়দার আলী খান কর্তৃক প্রেরিত পত্র খানার বিস্তারিত অবগত হয়ে নবাব সাহেবের সম্মতিক্রমে প্রেরকের কাছে যথাযথভাবে জবাব লিখে পাঠালেন। নবাব আলীবর্দী খান এই কাজে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। তখন নবাব সাহেব বুঝতে পারলেন, স্বভাবসুলভভাবেই দূরদর্শিতা-বুদ্ধিমত্তা-বিচক্ষণতা বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের কথা কখনও চাপা থাকে না।
বানিয়াচংয়ের ঐতিহ্যবাহী মীর মহল্লা সংলগ্ন ঐতিহাসিক কামাল খানী 'মৌলভীবাড়ি'র প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী মির্জা ইমানী বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে বানিয়াচং নিয়ে আসার আগে একটি সুবৃহৎ নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল। আমার ধারণা, আত্মীয়তার বন্ধন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিজ্ঞ মৌলভী উবেদুল হাসান বহুদিন আগেই একাগ্রচিত্তে এ বিষয়ে মনস্থ করেছিলেন। সময়-সুযোগ হলে মামা বাড়ির সন্নিকটে নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মনোমুগ্ধকর বাড়ি নির্মাণ করবেন। ওই সব এলাকা নিম্নাঞ্চল হওয়ায় এ যাবৎ হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণের টাকাপয়সা না থাকায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটি বাড়ি তৈরি করার ভরসা পাননি। বহুকাল প্রতীক্ষার পর প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানের নিমিত্তে অবশেষে দ্বৈবাৎ একটি ঘটনা ঘটে। বাড়ি নির্মাণে পর্যাপ্ত পরিমাণের অর্থকড়ি হাতে ধরা দেওয়ার পেছনেও একটি সালিশির কাহিনি রয়েছে। মৌলভী উবেদুল হাসান যখন নবাব মীর হায়দার আলী বাহাদুরের মীর মুন্সি বা চিফ সেক্রেটারি এবং তার পুত্রদ্বয়ের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। কিছুদিন পর আকস্মিকভাবে নবাব মীর হায়দার আলী খানের মৃত্যু হয়। তখন পুত্রদ্বয়ের মধ্যে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন, এ নিয়ে ভ্রাতৃদ্বয়ের মাঝে মনোমালিন্যতাসহ বিবাদ শুরু হয়। এ ব্যাপারে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অনেকেই এগিয়ে আসেন। কিন্তু কারও দ্বারা মীমাংসা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পরিশেষে ভ্রাতৃদ্বয়ের গৃহশিক্ষক, হাদরাবাদের মীর মুন্সি, মীমাংসা দর্শনে পণ্ডিত ব্যক্তি মৌলভী উবেদুল হাসানকে সালিশ নিযুক্ত করা হয়।
প্রারম্ভেই সালিশির রায়ই চূড়ান্ত বলে মেনে নেবেন, এই মর্মে ভ্রাতৃদ্বয়ের একটি অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করান। হায়দরাবাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উভয় ভ্রাতার কাছে উপস্থাপন করেন। তাদের মধ্যে কার দ্বারা হায়দরাবাদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে, সেদিকগুলোও আলোকপাত করেন। ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে কে এবং কেন নিজাম বা অধিপতি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। সে বিষয়ে বিবরণী ব্যক্ত করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হন। পরিশেষে বড় ভাই মীর ফতেহ আলী টিপু সুলতানই তার সালিশিতে নিজাম পদে নির্বাচিত হলেন। ছোট ভাই সন্তুষ্টচিত্তে ন্যায়বিচার হয়েছে বলে সালিশির রায় মেনে নিলেন। ন্যায়পরায়ণ সালিশির পারিতোষিক হিসেবে হায়দরাবাদের নবনিযুক্ত নিজাম দু'ঘণ্টার জন্য রাজ কোষাগার উন্মুক্ত করে দিলেন। ন্যায়বিচারক মৌলভী উবেদুল হাসানের প্রতি অনুরোধ রইল যেন এই দু'ঘণ্টা সময়ের ভেতর কোষাগার থেকে যা কিছু মন চায়, নিজের জন্য নিয়ে যেতে পারবেন। জ্ঞানপিপাসুদের জ্ঞানভাণ্ডার পরিপূর্ণ করার লিপ্সায় কোষাগার থেকে প্রথমত অমূল্যরত্ন হিসেবে বিশ্ব বিখ্যাত লেখকদের লেখা গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করলেন, এতেই প্রায় সব সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়। সঙ্গে থাকা লুথারের ইশারায় তাড়াহুড়া করে এর সঙ্গে একটি থলিতে করে কিছু মহামূল্যবান হীরা-মণিমুক্তা ও স্বর্ণ নিয়ে বের হয়ে এলেন। এগুলোর বিনিময়ে অনেক টাকা পেলেন। এই টাকা দিয়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাচীরবেষ্টিত একটি বৃহদাকারের বাড়ি নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে প্রাথমিকভাবে একটি বিরাটাকারের দিঘিসহ মোট ১৪ একর জমি ক্রয় করেন। সেটা অতীব নিম্নাঞ্চল হওয়ার কারণে এই নিচু ভূমিতে অবস্থিত বিরাটাকারের দিঘিটি ফের খনন করেন। এতদ্ব্যতীত আরও দুটি দিঘি খনন করেন। এই দিঘিগুলোর সব মাটি বিশাল এলাকাজুড়ে ভরাট করে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেন। এর বিপরীতে যথেষ্ট টাকা-কড়ি ব্যয় করতে হয়েছিল। এই বাড়িটি 'মৌলভীবাড়ি' নামে খ্যাত হয়। অতঃপর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মির্জা ইমানী বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে এনে এই বাড়িতে ওঠানো হয়। প্রচলিত রয়েছে এই বিবিকে নিয়ে আসার সময় বহনকারী বজরা (বিরাটাকারের নৌকা) সুটকি নদীর উত্তর দিকে বানিয়াচং ঢোকার পূর্বে জাঙ্গাল নামক স্থানে আটকা পড়ে। তখন বিবিকে নৌকায় রেখেই জমি ক্রয় করে অনেক লোকজন লাগিয়ে গড়ের খাল পর্যন্ত খনন করে আনতে হয়েছিল। ওই খাল 'মৌলভী খাল' নামে খ্যাত হয়।
মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের প্রথম পক্ষের পুত্র মৌলভী মফিজুল হাসান বিয়ে করেন হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত চুনারুঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রামশ্রী সাহেব বাড়ির নবীগঞ্জ মুনসেফি কোর্টের মুনসেফ সৈয়দ রেজাউর রহমান সাহেবের কন্যা সৈয়দা নাদেরা বানুকে তার মাতামহ ছিলেন ঐতিহ্যবাহী লস্করপুর সাহেববাড়ী নিবাসী দেওয়ান সৈয়দ দাইমুর রেজা। মৌলভী উবেদুল হাসান সাহেবের প্রথম পক্ষের একমাত্র কন্যা উম্মে সালমা বানুর বিয়ে হয়েছিল বানিয়াচং রাজবাড়ির দেওয়ান কুরবান রাজার পুত্র দেওয়ান জামান রাজার সঙ্গে। দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র নবাব তফিজুল হাসান বিয়ে করেন মীর মহল্লা সাহেববাড়ির তার বাবার মামাতো ভাই ও সম্বন্ধী, লাতুর মুনসেফ মৌলানা সৈয়দ গোলাম ইমাম ও কাজি আয়মনা বেগমের ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা আফিয়া বানুকে। নবাব তফিজুল হাসান এবং সৈয়দা আফিয়া বানুর ঔরসজাত একমাত্র কন্যা করিমুন্নেছার বিয়ে হয় সিলেট ধোপাদিঘীর পূর্ব পাড় নিবাসী সৈয়দ নছরুল্লাহ সাহেবের পুত্র সৈয়দ মহসীন আলীর সঙ্গে। তৎকালীন সময়ে বানিয়াচংয়ের ভূস্বামী হিসেবে খ্যাত মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের প্রথম পুত্র মৌলভী মইদুল হাসান বিয়ে করেন কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার জোয়ানশাহি পরগনার জমিদার মৌলভী মীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন হুসাইন সাহেবের কন্যা সৈয়দা আখতারুন্নেছা খাতুনকে। তার অপর বোন সৈয়দা শামসুন্নেছা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল হবিগঞ্জ জেলা ও উপজোলার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী ফকিরাবাদ সাহেববাড়ির শাহ সৈয়দ এমাদুর রহমান সাহেবের পুত্র শাহ সৈয়দ আলতাফুর রহমান ওরফে তোরন মিয়া সাহেবের কাছে। মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র মৌলভী ফয়জুল হাসান বিয়ে করেন মীর মহল্লা সাহেববাড়ির মৌলভী সৈয়দ আলী ইমাম এবং সৈয়দা আলিফা বানুর ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা সাফিয়া বানুকে। তার মাতামহ ছিলেন হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ উপজেলার জলসুখা-মাধবপাশা সৈয়দবাড়ির পীরে কামেল সৈয়দ মেহদীউজ্জামান। মৌলভী মফিজুল হাসান সাহেবের তৃতীয় পুত্র মৌলভী অইদুল হাসান বিয়ে করেন মীর মহল্লা সাহেববাড়ির মৌলভী সৈয়দ হুসেন ইমাম সাহেবের কন্যা সৈয়দা জহিরুন্নেছাকে।
মৌলভী মইদুল হাসান সাহেবের পুত্র খান বাহাদুর রফিকুল হাসান বিয়ে করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত নাসিরনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোকর্ণ নবাব বাড়ির অ্যাডভোকেট সৈয়দ রিয়াজত উল্লাহ সাহেবের কন্যা সৈয়দা রাবেয়া খাতুনকে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা সাহেবের একমাত্র বোন। মৌলভী মইদুল হাসান সাহেবের অন্যতম পুত্র মৌলভী শফিকুল হাসান ওরফে বাদশাহ মিয়া (পীর সাহেব) বিয়ে করেন বানিয়াচং মীর মহল্লার মৌলভী সৈয়দ গোলাম সামদানী ওরফে নান্না মিয়া এবং দেওয়ান ছালেহা খাতুন চৌধুরীর ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা উম্মে কুলসুমকে। তার মৃত্যুর পর অপর কন্যা সৈয়দা হাসিনা বানুকে। মৌলভী রফিকুল হাসান (সাব-রেজিস্ট্রার) সাহেবের পুত্র মৌলভী সিদ্দিকুল হাসান (ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার) বিয়ে করেন কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার জোয়ানশাহী পরগনার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী অষ্টগ্রাম মিনিস্টারবাড়ির তথাকথিত ব্রিটিশ সরকারের আমলে ১৯৪৩-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কৃষি, পল্লী উন্নয়ন এবং শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ মোয়াজ্জেমউদ্দিন হুসেইন ও শারেকা বানু বিবির ঔরসজাত কন্যা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনকে। খান বাহাদুর সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দিন হুসেইনের পুত্র বিশ্বনন্দিত স্যার ফজলে হাসান আবেদ বিয়ে করেন মামাতো বোন অষ্টগ্রামের জেলা জজ সৈয়দ জালালউদ্দিন হুসেইন এবং আয়েশা হুসেইনের কন্যা লেডি সৈয়দা সারওয়াত হাসান আবেদকে। তার মাতামহ ছিলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার নিবাসী খান বাহাদুর আতাউর রহমান সাহেব। এই কীর্তিমান পুরুষ মৌলভী উবেদুল হাসান তার জীবদ্দশায় অছিয়ত করেন, তার মৃত্যুর পর তার স্থায়ী নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বাহেরনগর গ্রামে তার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে তাকে সমাধিস্থ করার জন্য। তিনি পরলোকগমন করলে তার শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাকে বাহেরনগর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
- বিষয় :
- স্যার ফজলে হাসান আবেদ
